নিজের তিন শিশুসন্তানকে হত্যা করার কথা লিন্ডসে ক্ল্যান্সি অস্বীকার করেননি। তা সত্ত্বেও তিনি হত্যার দায়ে অপরাধী কি না, সাত দিন ধরে আলোচনা করেও সেই প্রশ্নে একমত হতে পারলেন না আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসের একটি আদালতের ১২ জন জুরি। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, বিচারক উইলিয়াম সুলিভান বিচারটিকে অমীমাংসিত ঘোষণা করেন। এর ফলে বহুল আলোচিত মামলাটির নিষ্পত্তি হল না; নতুন করে বিচার শুরু করার সুযোগ থাকল সরকারি কৌঁসুলিদের সামনে।

লিন্ডসে ক্ল্যান্সি পেশায় প্রসূতি ও প্রসবকালীন পরিচর্যার নার্স ছিলেন। স্বামী প্যাট্রিক এবং তিন সন্তান—পাঁচ বছরের কোরা, তিন বছরের ডসন ও আট মাসের ক্যালানকে নিয়ে ম্যাসাচুসেটসের ডাক্সবেরিতে থাকতেন তিনি। ২০২৩ সালের ২৪ জানুয়ারি সন্ধ্যায় প্যাট্রিক কিছুক্ষণের জন্য বাড়ির বাইরে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে তিনি তিন সন্তানকে অচেতন অবস্থায় পান। পরে তাদের মৃত্যু হয়। লিন্ডসে নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা করে গুরুতর আহত হন। সেই আঘাতের কারণে তাঁর শরীরের নিম্নাংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়।

তদন্তকারীদের কাছে লিন্ডসে স্বীকার করেছিলেন, সন্তানদের মৃত্যুর জন্য তিনিই দায়ী। ফলে বিচারে মূল প্রশ্নটি ‘কে হত্যা করেছে’ ছিল না। প্রশ্ন ছিল, হত্যার সময়ে নিজের কাজের প্রকৃতি ও তার নৈতিক অন্যায় বুঝতে তিনি সক্ষম ছিলেন কি না ।

ম্যাসাচুসেটসের আইনে কোনও ব্যক্তি গুরুতর মানসিক অসুস্থতার কারণে ঘটনার সময়ে নিজের আচরণের অপরাধমূলক চরিত্র বুঝতে না পারলে তাঁকে অপরাধের জন্য আইনত দায়ী না-ও করা যেতে পারে। লিন্ডসের আইনজীবী কেভিন রেডিংটনের দাবি ছিল, সন্তান প্রসবের পরে দেখা দেওয়া বিরল কিন্তু ভয়াবহ মানসিক ব্যাধি—প্রসবোত্তর মনোবিকারে (Postpartum Psychosis) ভুগছিলেন তাঁর মক্কেল। সেই অবস্থায় বাস্তবতা সম্পর্কে তাঁর ধারণা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

প্রতিরক্ষা পক্ষ জানায়, তৃতীয় সন্তানের জন্মের পরে লিন্ডসের উদ্বেগ, অনিদ্রা, মানসিক অবসাদ ও বিভ্রান্তি ক্রমশ বেড়েছিল। সন্তানদের ক্ষতি করার ভয়ও তিনি প্রকাশ করেছিলেন। চিকিৎসকেরা তাঁকে অল্প সময়ের মধ্যে একাধিক মানসিক রোগের ওষুধ দিয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যেরা আদালতে জানান, ঘটনার আগে তাঁরা লিন্ডসের মানসিক অবস্থার অবনতি লক্ষ করেছিলেন এবং সাহায্য চেয়েছিলেন। এক মনোরোগ-বিশেষজ্ঞ সাক্ষ্য দেন, হত্যার সময় লিন্ডসে মনোবিকারে আক্রান্ত ছিলেন এবং একটি কণ্ঠের নির্দেশ শুনেছিলেন বলে পরে জানিয়েছিলেন।

সরকারি কৌঁসুলিদের বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। তাঁদের মতে, লিন্ডসে সন্তানদের হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন এবং স্বামীকে পরিকল্পিতভাবে বাড়ির বাইরে পাঠিয়েছিলেন। ঘটনার আগে ও পরে তাঁর আচরণেও নিজের কাজ সম্পর্কে সচেতনতার পরিচয় পাওয়া যায়। কৌঁসুলিরা তাঁর ব্যক্তিগত লেখা, মুঠোফোন ও কম্পিউটারে করা অনুসন্ধান এবং চিকিৎসকদের সাক্ষ্যের উপর নির্ভর করেন। এক চিকিৎসক জানান, ঘটনার আগের দিনও লিন্ডসের মধ্যে মনোবিকারের স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায়নি। তাঁর রোগটি গুরুতর অবসাদ হতে পারে, কিন্তু তাতে ঠিক-ভুল বিচারের ক্ষমতা সম্পূর্ণ লোপ পেয়েছিল এমন প্রমাণ নেই।

বিচারে ২১ দিন ধরে সাক্ষ্য গ্রহণ চলে; মোট ৮৫ জন সাক্ষ্য দেন। জুরিদের সামনে সম্ভাব্য চারটি পথ ছিল—প্রথম মাত্রার হত্যা, দ্বিতীয় মাত্রার হত্যা, অনিচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড অথবা মানসিক অসুস্থতার কারণে অপরাধমূলক দায় থেকে অব্যাহতি। প্রথম মাত্রার হত্যায় দোষী সাব্যস্ত হলে লিন্ডসের প্যারোলের সুযোগ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারত। অন্য দিকে, মানসিক অসুস্থতার কারণে দায়মুক্তি পেলে তাঁকে সাধারণভাবে মুক্তি না দিয়ে একটি সরকারি মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো হত।

সাত দিনের প্রায় ৪০ ঘণ্টার আলোচনায় জুরিরা তিন বার আদালতকে জানান, তাঁরা ঐকমত্যে পৌঁছতে পারছেন না। জুরিদের দলনেত্রী বিচারককে লিখিতভাবে জানান, এক জন সদস্য ‘যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ’ সম্পর্কিত আদালতের নির্দেশ মানতে চাইছেন না। প্রতিরক্ষা পক্ষ ওই জুরিকে সরিয়ে বিকল্প জুরি নিয়োগের আবেদন করলেও বিচারক তা নাকচ করেন। শেষ পর্যন্ত সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অসম্ভব বুঝে তিনি বিচার অমীমাংসিত ঘোষণা করেন। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুসারে, ১১ জন জুরি লিন্ডসেকে মানসিক অসুস্থতার কারণে অপরাধের দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পক্ষে ছিলেন; বিরোধিতা করেছিলেন এক জন।

অমীমাংসিত বিচার লিন্ডসেকে নির্দোষ ঘোষণা করে না, আবার দোষীও সাব্যস্ত করে না। প্লিমাউথ কাউন্টির সরকারি কৌঁসুলি চাইলে একই অভিযোগে পুনর্বিচারের আবেদন করতে পারেন। প্রতিরক্ষা পক্ষ ইতিমধ্যে বিচারকের কাছে প্রমাণের অভাব দেখিয়ে সরাসরি দায়মুক্তির রায় চেয়েছে। পরবর্তী পদক্ষেপ স্থির করতে ২৯ সেপ্টেম্বর মামলাটির শুনানি হওয়ার কথা।

লিন্ডসে ক্ল্যান্সির ঘটনা আমেরিকায় গভীর বিভাজন তৈরি করেছে। এক পক্ষের মতে, তিন নিরপরাধ শিশুর হত্যাকে মানসিক অসুস্থতার যুক্তিতে লঘু করা যায় না। অন্য পক্ষ বলছে, প্রসবোত্তর মনোবিকার কোনও সাধারণ মনখারাপ নয়; এতে বিভ্রম, অবাস্তব বিশ্বাস, কণ্ঠস্বর শোনা এবং নিজের বা সন্তানের ক্ষতি করার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। মামলাটি তাই কেবল একটি পরিবারের অকল্পনীয় বিপর্যয়ের বিচার নয়—সন্তান জন্মের পরে মায়েদের মানসিক অসুস্থতা শনাক্তকরণ, চিকিৎসাব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং মানসিকভাবে অসুস্থ অভিযুক্তের দায় নির্ধারণে ফৌজদারি আইনের সীমাবদ্ধতারও কঠিন পরীক্ষা।