তেরো বছর আগে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রী রাম কলেজ অব কমার্সের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি ছিলেন জাতীয় রাজনীতির এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী দাবিদার। তখনও ভারতীয় জনতা পার্টি তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী ঘোষণা করেনি। শনিবার সেই একই প্রতিষ্ঠানের শতবর্ষ উদ্‌যাপনে ফিরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজের ২০১৩ সালের বক্তৃতাকেই বর্তমান ভারতের সঙ্গে তুলনার ভিত্তি করলেন। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—এই তিনটি কালখণ্ডে বক্তৃতাটি সাজানোর পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের ভাষায় পৌঁছনোর সচেতন চেষ্টাও ছিল স্পষ্ট।

২০১৩ সালের বক্তৃতায় মোদী একটি অর্ধেক জলভরা গ্লাস তুলে ধরেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, আশাবাদীরা গ্লাসটিকে অর্ধেক ভর্তি বলেন, নৈরাশ্যবাদীরা বলেন অর্ধেক খালি। কিন্তু তিনি গ্লাসটিকে সম্পূর্ণ ভর্তি দেখেন—অর্ধেক জলে, বাকি অর্ধেক বাতাসে। সেই উপমাই তৎকালীন হতাশার পরিবেশের বিপরীতে তাঁর ইতিবাচক রাজনীতি ও উন্নয়নমুখী ভাবমূর্তির প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

তেরো বছর পরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফিরে মোদী বললেন, সেই বক্তৃতার প্রভাব আজও অনুভূত হয়। তাঁর দাবি, ২০১৩ সালে বিরোধী দলের নেতা হয়েও তিনি এসআরসিসি-র মঞ্চকে কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণের জায়গা করে তোলেননি; বরং দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করেছিলেন। তবে এবারের বক্তৃতায় বিরোধীদের উদ্দেশে তাঁর আক্রমণ ছিল যথেষ্ট তীক্ষ্ণ।

ছাত্রদের মোদী বলেন, ইন্টারনেটে গিয়ে ২০১৩ সালের সংবাদশিরোনামগুলি দেখতে। সেই সময়ে নিয়ন্ত্রণরেখায় ভারতীয় সেনার মৃত্যু, প্রায় ১০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি, হেলিকপ্টার কেলেঙ্কারি, বৃদ্ধির হার কমে যাওয়া এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তহীনতার কথাই সংবাদে প্রাধান্য পেত। আন্তর্জাতিক মহলে ভারতকে তখন ‘ভঙ্গুর পাঁচ’ অর্থনীতির একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তার বিপরীতে বর্তমান ভারত বিশ্বের দ্রুততম বৃদ্ধিশীল বৃহৎ অর্থনীতি বলে দাবি করেন তিনি।

সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিকে ৭.৮ শতাংশ মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির উল্লেখ করে মোদী বলেন, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ এবং বিশ্বজোড়া অনিশ্চয়তার মধ্যেও এই হার ভারতের সামর্থ্যের প্রমাণ। নির্মাণ, উৎপাদন, শিল্প কার্যকলাপ ও গাড়ি বিক্রি বৃদ্ধিকেও তিনি অর্থনীতির গতির নির্দেশক হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর কটাক্ষ, যাঁরা এক সময় ভারতকে ‘ভঙ্গুর পাঁচ’-এর মধ্যে ঠেলে দিয়েছিলেন, তাঁরা এখন এই বৃদ্ধির পরিসংখ্যান “হজম করতে পারছেন না”। যদিও বিরোধী দল এবং কয়েকজন অর্থনীতিবিদ সরকারি বৃদ্ধির হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

বিরোধীদের নাম না করে প্রধানমন্ত্রী তাঁদের একাংশকে পরিবারের সব বিষয়ে অসন্তুষ্ট থাকা ‘নারাজ ফুফাজি’ বা রাগী মামাশ্বশুরের সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁর বক্তব্য, এই সমালোচকেরা প্রতিটি উদ্যোগেই প্রশ্ন তোলেন—“এর প্রয়োজন কী?” তাঁদের কাছে ২০১৩ সালেও গ্লাস অর্ধেক খালি ছিল, এখনও তাই আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।

কিন্তু বক্তৃতার আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল জেন জি-র শব্দভান্ডারের ব্যবহার। এসআরসিসি-র প্রাক্তনীদের তিনি ‘ওজি’ বলেন—যে শব্দটি নতুন প্রজন্মের কাছে খাঁটি, ব্যতিক্রমী কিংবা পথিকৃৎ ব্যক্তিকে বোঝায়। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের এসআরসিসি পরিচয় দেওয়াটাই এক ধরনের ‘ফ্লেক্স’ বা গর্ব প্রদর্শন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। জনপ্রিয় ছবি ‘ধুরন্ধর’-এর উল্লেখ টেনে বলেন, প্রাক্তনীরা “ধুরন্ধর না হলেও ধুম মাচিয়েছেন”।

তরুণদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রশংসা করে মোদী বলেন, উচ্চাকাঙ্ক্ষা পাঠ্যবই থেকে শেখানো যায় না; বড় স্বপ্ন দেখার অনুকূল পরিবেশ থেকেই তা জন্ম নেয়। “তেরো বছর আগে আপনাদের অগ্রজেরা যে স্বপ্ন দেখতেও পারেননি, আজ আপনারা সেই স্বপ্ন দেখছেন”—এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি নিজের শাসনকালকে সুযোগ ও আত্মবিশ্বাস তৈরির যুগ হিসেবে তুলে ধরেন।

কংগ্রেস অবশ্য বক্তৃতাটিকে আত্মপ্রচারের অভিযান বলে আক্রমণ করেছে। কংগ্রেস নেতা কানহাইয়া কুমারের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী ২০১৩ ও ২০৪৭ সালের কথা বললেও বর্তমানের ছাত্রসমাজের পরীক্ষা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সমস্যাগুলি এড়িয়ে গিয়েছেন। ফলে এসআরসিসি-র মঞ্চে মোদীর প্রত্যাবর্তন শুধু পুরনো সাফল্যের স্মৃতিচারণ নয়; সাম্প্রতিক ছাত্র-যুব অসন্তোষের আবহে জেন জি-র সঙ্গে রাজনৈতিক সংযোগ পুনর্গঠনের একটি পরিকল্পিত প্রয়াসও। অতীতের ‘জল ও বাতাসে পূর্ণ গ্লাস’ এবার তাই উন্নয়নের দাবি, বিরোধীদের বিদ্রুপ এবং তরুণ ভোটারদের মন জয়ের ভাষা—তিনটিরই প্রতীক হয়ে উঠল।