ষোলো বছর পরে অলিম্পিক পদক: ‘রাগ নয়, কৃতজ্ঞতাকেই বেছে নিয়েছি’: শ্যানন রোবেরি

যা জানা জরুরি
- ২০১২ সালের ১০ আগস্ট লন্ডন অলিম্পিকের মহিলাদের ১,৫০০ মিটার দৌড় শেষ করে ষষ্ঠ স্থানে ছিলেন আমেরিকার শ্যানন রোবেরি।
- অলিম্পিক পদক জয়ের স্বপ্ন সেদিনই শেষ হয়ে গিয়েছে বলে ধরে নিয়েছিলেন তিনি।
- অথচ প্রায় দেড় দশক পরে জানা গেল, রোবেরি আসলে ওই প্রতিযোগিতার ব্রোঞ্জপদকজয়ী।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
২০১২ সালের ১০ আগস্ট লন্ডন অলিম্পিকের মহিলাদের ১,৫০০ মিটার দৌড় শেষ করে ষষ্ঠ স্থানে ছিলেন আমেরিকার শ্যানন রোবেরি। অলিম্পিক পদক জয়ের স্বপ্ন সেদিনই শেষ হয়ে গিয়েছে বলে ধরে নিয়েছিলেন তিনি। অথচ প্রায় দেড় দশক পরে জানা গেল, রোবেরি আসলে ওই প্রতিযোগিতার ব্রোঞ্জপদকজয়ী। ২০২৮ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকের মঞ্চে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর হাতে পদক তুলে দেওয়া হবে, তখন মূল দৌড়টির পর কেটে যাবে ষোলো বছর।
এই দীর্ঘ বিলম্ব রোবেরির মনে ক্ষোভ তৈরি করতেই পারত। কারণ, পদকের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শুধু ব্যক্তিগত সম্মান নয়—পুরস্কারের অর্থ, পৃষ্ঠপোষকের চুক্তি, প্রচার, ভবিষ্যৎ জীবনের সুযোগ এবং অলিম্পিকের মঞ্চে দেশের পতাকা হাতে দাঁড়ানোর অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। এর কোনওটিই তিনি ঠিক সময়ে পাননি। তবু রোবেরির বক্তব্য, “আমার সামনে কৃতজ্ঞতা অথবা রাগ নিয়ে বেঁচে থাকার বিকল্প রয়েছে। আমি কৃতজ্ঞতাকেই বেছে নিয়েছি।”
লন্ডনের সেই ১,৫০০ মিটার ফাইনাল এখন অলিম্পিক ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কিত দৌড় হিসেবে পরিচিত। প্রথমে সোনা ও রুপো জেতা তুরস্কের আসলি চাকির আলপতেকিন এবং গামজে বুলুত পরে মাদক গ্রহণের দায়ে অযোগ্য ঘোষিত হন। রাশিয়ার তাতিয়ানা তোমাশোভা প্রথমে চতুর্থ হয়েছিলেন; অন্যদের শাস্তির পরে তাঁকে রুপো দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সংরক্ষিত নমুনার পুনঃপরীক্ষায় নিষিদ্ধ ওষুধ ব্যবহারের প্রমাণ মেলায় ২০২৪ সালে তাঁর ফলও বাতিল হয়। ওই ফাইনালের ১৩ প্রতিযোগীর মধ্যে পাঁচজন শেষ পর্যন্ত মাদকবিরোধী বিধি লঙ্ঘনের দায়ে শাস্তি পেয়েছেন। সংশোধিত ফলাফলে বাহরাইনের মরিয়ম ইউসুফ জামাল সোনা, আবেবা আরেগাওয়ি রুপো এবং রোবেরি ব্রোঞ্জ পাচ্ছেন।
সিদ্ধান্তটি প্রথম জানার মুহূর্তে রোবেরির অনুভূতি ছিল মিশ্র। আনন্দের সঙ্গে ছিল অবিশ্বাস, স্বস্তির সঙ্গে অপূরণীয় ক্ষতির বেদনাও। একজন ক্রীড়াবিদের জীবনে অলিম্পিক পদকের মুহূর্তটি আসে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য। পদক মঞ্চে ওঠা, জাতীয় পতাকা দেখা, পরিবারের উপস্থিতিতে সাফল্য উদ্যাপন—ষোলো বছর পরে তার স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব হলেও সেই মুহূর্ত পুনর্নির্মাণ করা যায় না।
রোবেরির কাছে সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক প্রশ্নটি তাই পদকের ধাতু নয়, সমান সুযোগের। তিনি জানতেন না যে стартরেখায় দাঁড়ানো সকল প্রতিযোগী একই নিয়ম মেনে লড়ছেন কি না। একসময় তাঁর মনে হতো, হয়তো নিজের অনুশীলনেই ঘাটতি রয়েছে। আরও কঠোর পরিশ্রম, আরও নিখুঁত পরিকল্পনা কিংবা আরও বেশি আত্মত্যাগ করলে তিনি পদক পেতে পারতেন। পরবর্তী ঘটনাগুলি দেখিয়ে দেয়, সমস্যা তাঁর প্রস্তুতিতে ছিল না; প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রটিই সমতল ছিল না।
তবু অতীতে আটকে থাকতে চান না তিন বারের অলিম্পিয়ান রোবেরি। অবসর নেওয়ার পরে তিনি পরিচ্ছন্ন ক্রীড়ার পক্ষে সক্রিয় প্রচারক হয়েছেন। তাঁর মতে, মাদক গ্রহণকারী ধরা পড়লেই সমস্যার সমাধান হয় না। প্রতারণার কারণে পিছিয়ে পড়া নির্দোষ ক্রীড়াবিদদের আর্থিক ক্ষতি, মানসিক আঘাত এবং হারানো পেশাগত সুযোগেরও স্বীকৃতি প্রয়োজন। তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত করা, সংরক্ষিত নমুনার নিয়মিত পুনঃপরীক্ষা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ক্রীড়াবিদদের সহায়তার জন্য পৃথক তহবিল তৈরির দাবি তুলেছেন তিনি। আরও কয়েকজন বঞ্চিত ক্রীড়াবিদের সঙ্গে ব্যবস্থাগত সংস্কারের দাবিতে আইনি উদ্যোগেও যুক্ত হয়েছেন রোবেরি।
তাঁর নিজের ক্ষতিও পরিমাপযোগ্য। যথাসময়ে ব্রোঞ্জ পেলে পৃষ্ঠপোষক সংস্থার কাছ থেকে প্রায় ৫০ হাজার ডলারের পুরস্কার পাওয়ার কথা ছিল। তার চেয়েও বড় ক্ষতি ছিল অলিম্পিক পদকজয়ী হিসেবে পরবর্তী চার বছর কাটাতে না পারা। পদকের স্বীকৃতি ক্রীড়াবিদের বাজারমূল্য, আমন্ত্রণ এবং অবসরের পরের কর্মজীবন বদলে দিতে পারে।
দৌড়ের পথ ছাড়ার পরে রোবেরি এখন ধারাভাষ্যকার ও ক্রীড়া-বিশ্লেষক। প্রতিযোগিতার সময় একজন দৌড়বিদের কৌশল, চাপ ও মানসিক লড়াই তিনি দর্শকের কাছে সহজ করে তুলে ধরেন। সম্প্রচারক হিসেবে এমি পুরস্কারও পেয়েছেন। পাশাপাশি তরুণদের কাছে শিল্প ও খেলাধুলার সুযোগ পৌঁছে দিতে একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন।
লস অ্যাঞ্জেলেসে পদক নেওয়ার সময় রোবেরির বয়স হবে ৪৩ বছর। পাশে থাকবে তাঁর পরিবার—যে জীবনটি ২০১২ সালে ছিল না। সেই কারণেই বিলম্বিত অনুষ্ঠানকে তিনি নিছক পুরনো ক্ষতের স্মরণ হিসেবে দেখছেন না। তাঁর কাছে এটি প্রমাণ যে বিচার দেরিতে এলেও সত্যকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা যায় না। তবে রোবেরির কাহিনি একই সঙ্গে সতর্কবার্তা—ষোলো বছর পরে দেওয়া পদক সম্মান ফিরিয়ে দিতে পারে, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া অলিম্পিক মুহূর্ত ফিরিয়ে দিতে পারে না।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



