দেশের মহাকাশ কর্মসূচিতে বেসরকারি সংস্থার ভূমিকা কত দূর পর্যন্ত বাড়ানো হবে এবং তার ফলে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা বা ইসরোর ভবিষ্যৎ কী দাঁড়াবে—এই প্রশ্ন তুলে সংস্থার চেয়ারম্যান ভি নারায়ণনকে চিঠি দিল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মী সংগঠন। শুক্রবার জিএসএলভি রকেটের সফল উৎক্ষেপণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চিঠিটি পাঠানো হয়। তাতে বেসরকারিকরণ-সংক্রান্ত সরকারি নীতি, তার আইনি ভিত্তি, রূপায়ণের সময়সীমা এবং কর্মীদের উপরে সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

বিতর্কের সূত্রপাত ভারতীয় জাতীয় মহাকাশ উন্নয়ন ও অনুমোদন কেন্দ্র বা ইন-স্পেসের চেয়ারম্যান পবন গোয়েঙ্কার একটি মন্তব্য ঘিরে। গত ২১ আগস্ট একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ভবিষ্যতে ইসরো আর কোনও উৎক্ষেপণযান তৈরি করবে না; সেই দায়িত্ব বেসরকারি সংস্থা অথবা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলি পালন করবে। দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত কৃত্রিম উপগ্রহ নির্মাণ থেকেও ইসরো সরে আসবে। সংস্থাটি তখন বিশেষ উদ্দেশ্যের উপগ্রহ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে মন দেবে। প্রযুক্তি পরিণত হলে তা শিল্পক্ষেত্রে হস্তান্তর করা হবে।

কর্মী সংগঠনগুলির বক্তব্য, গোয়েঙ্কার এই ঘোষণার পরে মহাকাশ দপ্তরের তরফে কোনও আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা বা ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। ফলে এটি কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদিত সিদ্ধান্ত, মহাকাশ কমিশনের গৃহীত নীতি, না কি কেবল ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি সম্ভাব্য রূপরেখা—তা স্পষ্ট নয়। সেই কারণেই ইসরো-প্রধানের কাছে লিখিত অবস্থান জানতে চাওয়া হয়েছে।

চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন ইসরোর বিভিন্ন কেন্দ্রের কর্মী প্রতিনিধিরা। এর মধ্যে আমদাবাদের মহাকাশ প্রয়োগ কেন্দ্র এবং তিরুঅনন্তপুরমের তরল চালন ব্যবস্থা কেন্দ্রের প্রতিনিধিরাও রয়েছেন। তাঁদের প্রশ্ন, উৎক্ষেপণযান ও নিয়মিত কৃত্রিম উপগ্রহ নির্মাণের কাজ ছেড়ে দিলে সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসরোর ভূমিকা কী হবে? বেসরকারি সংস্থার পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলিও কি ভবিষ্যতে উৎপাদন থেকে বাদ পড়বে? বর্তমানে কর্মরত বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও অন্য কর্মীদের সুরক্ষায় কী ব্যবস্থা থাকবে? নতুন নিয়োগের ভবিষ্যৎই বা কী?

সংগঠনগুলি আরও জানতে চেয়েছে, সরকারি অর্থে বিকশিত প্রযুক্তি বেসরকারি হাতে দেওয়ার পদ্ধতি কী এবং জনসম্পদের যথাযথ মূল্য কী ভাবে নির্ধারিত হচ্ছে। ইসরোর কাঠামো, দায়িত্ব বা কর্মীসংখ্যাকে প্রভাবিত করতে পারে এমন কোনও ‘অপরিবর্তনীয় সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার আগে কর্মী সংগঠনগুলির সঙ্গে আলোচনা করা হবে কি না, সেই প্রশ্নও তোলা হয়েছে। , এ বিষয়ে গোয়েঙ্কা বা নারায়ণনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

কর্মীদের আশঙ্কা, যে কাজগুলিকে ইসরোর মূল দক্ষতার ক্ষেত্র বলে ধরা হয়, সেগুলি সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে দিলে সংস্থার দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। বছরের পর বছর উৎক্ষেপণযান নির্মাণ, সংযোজন, পরীক্ষা এবং উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়েই ইসরোর প্রযুক্তিগত জ্ঞানভান্ডার তৈরি হয়েছে। উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যোগ ছিন্ন হলে সেই ব্যবহারিক দক্ষতা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে শূন্যপদ, কর্মীদের অবসর এবং সীমিত নিয়োগের কারণে ইতিমধ্যেই মানবসম্পদের ঘাটতি রয়েছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়লে মেধাবী তরুণ বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের কাছে ইসরোর সরকারি চাকরির আকর্ষণ কমতে পারে বলেও চিঠিতে সতর্ক করা হয়েছে।

২০২০ সালে দেশের মহাকাশ ক্ষেত্র বেসরকারি উদ্যোগের জন্য খুলে দেওয়ার ঘোষণা করে কেন্দ্র। ঘোষিত লক্ষ্য ছিল, নিয়মিত বাণিজ্যিক কাজ ক্রমশ শিল্পক্ষেত্রের হাতে তুলে দিয়ে ইসরোকে উচ্চস্তরের গবেষণা, বৈজ্ঞানিক অভিযান এবং কৌশলগত প্রকল্পে মনোনিবেশের সুযোগ দেওয়া। ইতিমধ্যে প্রায় ১২০টি প্রযুক্তি শিল্পক্ষেত্রে হস্তান্তর করা হয়েছে। ক্ষুদ্র উপগ্রহ উৎক্ষেপণযান এসএসএলভির প্রযুক্তি ও উৎপাদন-অধিকার প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেডকে দেওয়া হয়েছে। পিএসএলভির উৎপাদনেও শিল্পসংস্থার অংশগ্রহণ বেড়েছে।

বেসরকারি অংশগ্রহণের সমর্থকদের যুক্তি, গগনযান, ভারতীয় মহাকাশ কেন্দ্র, পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট এবং মানুষ পাঠানোর চন্দ্রাভিযানের মতো ব্যয়বহুল প্রকল্প সামনে রয়েছে। নিয়মিত উৎপাদনের দায় শিল্পক্ষেত্র নিলে ইসরো নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বেশি অর্থ ও জনবল নিয়োগ করতে পারবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উৎক্ষেপণ-বাজারে ভারতের অংশ বাড়বে।

তবে প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ বিশেষজ্ঞ অজয় লেলে সতর্ক করেছেন, বেসরকারি অংশগ্রহণ প্রয়োজনীয় হলেও উৎক্ষেপণযান নির্মাণ ও উৎক্ষেপণের নিজস্ব ক্ষমতা ইসরোর হাতে থাকা জরুরি। বিশেষত কৌশলগত কৃত্রিম উপগ্রহের ক্ষেত্রে দেশকে বাইরের কোনও সংস্থার উপরে পুরোপুরি নির্ভরশীল করা উচিত নয়। তাঁর মতে, আমেরিকার মহাকাশ সংস্থা নাসা যে ভাবে উৎক্ষেপণের জন্য স্পেসএক্সের উপরে অনেকাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, ভারতের ক্ষেত্রে সেই পরিস্থিতি তৈরি হওয়া কাম্য নয়।

ফলে বিতর্কটি নিছক কর্মসংস্থান রক্ষার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতা, জাতীয় নিরাপত্তা, সরকারি অর্থে গড়ে ওঠা মেধাসম্পদের মালিকানা এবং ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির ভবিষ্যৎ চরিত্র। কর্মীদের চিঠি সেই বৃহত্তর নীতিগত প্রশ্নেরই স্পষ্ট উত্তর দাবি করেছে।