হালয়ার সকালে এ বার দুর্গোৎসবের মহাসূচনার মঞ্চ হতে চলেছে ইডেন গার্ডেন্স। আগামী ১০ অক্টোবর সেখানে রাজ্য সরকারের আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পরে প্রথম দুর্গাপুজোয় এই আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি এখনও সম্ভাবনার পর্যায়েই রয়েছে।

ইডেনে দুর্গাপ্রতিমার চক্ষুদান করতে পারেন মোদী। পরিকল্পনা রয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী প্রবেশের সময় এক হাজার মহিলা উলুধ্বনি দেবেন, বাজবে দশ হাজার ঢাক। শ্রেয়া ঘোষালের কণ্ঠে শোনা যেতে পারে আগমনী গান। সম্ভাব্য শিল্পীতালিকায় রয়েছেন কুমার শানু, অভিজিৎ ভট্টাচার্য, মোনালি ঠাকুর এবং মধুশ্রী ভট্টাচার্যও। ইডেন থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের দশ হাজার পুজোর দূরবর্তী উদ্বোধন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

আয়োজনের আরেক আকর্ষণ ‘মা আসছেন—উমা স্টোরি’ বিষয়ক ত্রিমাত্রিক আলোকপ্রক্ষেপণ। থাকবে ড্রোনের প্রদর্শনী এবং আতসবাজি। পুজোর আগে রেড রোডে আলোকসজ্জার মধ্যে শোভাযাত্রারও পরিকল্পনা হয়েছে। সেখানে ২৩টি জেলার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তুলে ধরা হবে। তালিকায় রয়েছে দার্জিলিঙের তামাং সেলো, কালিম্পঙের লেপচা নৃত্য, মালদহের গম্ভীরা, বীরভূমের বাউল এবং পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ার ছৌ। আয়োজকদের বক্তব্য, মূল পরিকল্পনা তৈরি হলেও কিছু পরিবর্তন হতে পারে।

সিএবি সভাপতি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ও এই আয়োজনের গুরুত্বের কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইডেনে এমন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর আগমন হবে প্রথমবার। শোভাযাত্রার পরিবেশনায় আরও থাকছে রাজবংশী লোকনৃত্য, রায়বেঁশে, সাঁওতালি নাচ, গৌড়ীয় বৈষ্ণব নৃত্য, রামপ্রসাদি গান ও বনবিবির পালা। পাহাড় থেকে সমতলের শিল্পধারাগুলিকে উপস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

এই বিপুল আয়োজনের জন্য ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত, মোট ২১ দিন ইডেন ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। এবিপি আনন্দের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের সচিব সৌমিত্র মোহন যুবকল্যাণ ও ক্রীড়া দফতরকে চিঠি দিয়ে সিএবির সঙ্গে সমন্বয় করতে বলেছেন। মঞ্চ নির্মাণ, সাজসজ্জা এবং নিরাপত্তার প্রস্তুতির জন্য আগাম মাঠ প্রয়োজন। অনুষ্ঠান শেষে অস্থায়ী কাঠামো সরিয়ে মাঠ স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানোর সময়ও এই মেয়াদের মধ্যে ধরা হয়েছে।

পুজোর এই আয়োজনের প্রভাব পড়তে চলেছে ক্রিকেটের সূচিতেও। ১১ অক্টোবর থেকে ইডেনে বাংলা ও দিল্লির রঞ্জি ট্রফির ম্যাচ হওয়ার কথা। আগের দিন এত বড় অনুষ্ঠান হলে পরদিন ম্যাচ আয়োজন কার্যত অসম্ভব। ফলে ম্যাচটি কল্যাণীতে সরানোর প্রস্তুতি চলছে। সিএবি সচিব বাবলু কোলে জানিয়েছেন, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডকে বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং কল্যাণীর মাঠ প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। অর্থাৎ, উৎসবের মঞ্চ তৈরির পাশাপাশি বাংলার ঘরোয়া ক্রিকেটের বিকল্প ব্যবস্থাও করতে হচ্ছে।

সরকারি উৎসবের ধরনেও এ বার বদল আসছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে পুজোর পরে রেড রোডের বিসর্জন শোভাযাত্রা বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল। শুভেন্দু জানিয়েছেন, এ বার সরকার সেই বিসর্জন উৎসব আয়োজন করবে না। পরিবর্তে মহালয়ার অনুষ্ঠান এবং উৎসবের সময় শোভাযাত্রায় জোর দেওয়া হচ্ছে। ইডেনের চার ঘণ্টার অনুষ্ঠান যৌথভাবে আয়োজন করবে পর্যটন এবং তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর। ফলে সরকারি উদ্‌যাপনের প্রধান আকর্ষণ সরে আসছে দেবীর আগমনের মুহূর্তে।

দুর্গাপুজো ঘিরে আরও কয়েকটি সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। অষ্টমীতে মদের দোকান বন্ধ থাকবে, পুজো ও বিসর্জনে নিষিদ্ধ থাকবে ডিজে। পুজো কমিটিগুলির জন্য এক লক্ষ টাকা অনুদান ঘোষণা হলেও বড় বাজেটের উদ্যোক্তাদের তা না নেওয়ার আবেদন করেছেন তিনি। বিষয়ভিত্তিক পুজোয় সনাতনী ঐতিহ্য ও বাংলার সংস্কৃতিকে আঘাত না করার কথাও বলেছেন।

এই প্রেক্ষাপটে ইডেনের আয়োজন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি নতুন সরকারের উৎসবভাবনার প্রকাশ হিসেবেও তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য উপস্থিতি তাকে জাতীয় নজরে আনতে পারে। তবে অনুষ্ঠানের সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষিত পরিকল্পনার বাস্তবায়ন, বিপুল সংখ্যক অংশগ্রহণকারীর ব্যবস্থাপনা এবং উৎসব শেষে ক্রিকেটের মাঠ যথাযথ অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার উপর।