বাংলাদেশে বন্দি হিন্দু সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে, অথচ অসুস্থতার যুক্তিতেও মিলছে না জামিন। তাঁর আইনজীবী অপূর্বকুমার ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, আগামী ১৭ সেপ্টেম্বরের শুনানিতে ফের মুক্তির আবেদন জানাবেন তাঁরা। তাঁর অভিযোগ, আইনি জটিলতার পাশাপাশি রাজনৈতিক বাধাও চিন্ময়ের মুক্তির পথে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং প্রাক্তন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অপূর্বের বক্তব্য, চিন্ময় গুরুতর যকৃতের অসুখে ভুগছেন; কারাগারে যথাযথ চিকিৎসা পাচ্ছেন না। মায়ের মৃত্যুর পর মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছেন। প্রতি শনিবারের মতো ১২ সেপ্টেম্বরও জেল থেকে আইনজীবীকে ফোন করেছিলেন। কান্নায় ভেঙে পড়ে জানতে চেয়েছেন, এখন তাঁর দেখাশোনা কে করবেন। অপূর্ব তাঁকে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন।

চিন্ময়ের মা সন্ধ্যা রানি ধরের মৃত্যু হয় ১০ সেপ্টেম্বর। বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। পরিবারের আবেদনে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মহম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার জন্য পাঁচ ঘণ্টার সাময়িক মুক্তি অনুমোদন করেন। হাটহাজারীর পুণ্ডরীক ধামে শেষকৃত্যের আয়োজন করা হয়। স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছিল, অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা হয়েছে। দীর্ঘ বন্দিজীবনের মধ্যে এই কয়েক ঘণ্টাই হয়ে ওঠে মাকে বিদায় জানানোর অবকাশ।

অথচ জীবিত মায়ের সঙ্গে শেষ সাক্ষাতের অনুমতি পাননি চিন্ময়। পরিবারের অভিযোগ, অসুস্থ মাকে দেখতে সাময়িক মুক্তির আবেদন করা হলেও তা মঞ্জুর হয়নি। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের খবর উদ্ধৃত করে এনডিটিভি জানিয়েছে, প্রশাসন পরিবারকে বলেছিল, অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে বন্দিকে এভাবে ছাড়ার বিধান নেই। পরে ছড়িয়ে পড়া দৃশ্যে দেখা যায়, কারাগারে ফেরার আগে পুণ্ডরীক ধামের রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহের পা ছুঁয়ে কাঁদছেন চিন্ময়। এই দৃশ্য তাঁর মুক্তির দাবিতে নতুন করে আবেগ ও উদ্বেগ তৈরি করেছে।

চিন্ময় চট্টগ্রামের পুণ্ডরীক ধামের প্রধান এবং বাংলাদেশের সম্মিলিত সনাতন জাগরণ জোটের পরিচিত মুখ। হিন্দু ও অন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং নিরাপত্তার দাবিতে তাঁর সংগঠন সভা করত। গ্রেফতারের পরপরই, ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর, ভারতের বিদেশ মন্ত্রক উদ্বেগ জানিয়েছিল। নয়াদিল্লির বক্তব্য ছিল, সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঘটনায় অপরাধীরা অধরা থাকলেও শান্তিপূর্ণ সমাবেশে দাবি জানানো একজন ধর্মীয় নেতার বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। বাংলাদেশকে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বানও জানিয়েছিল ভারত।

মামলার সূত্রপাত ২০২৪ সালের অক্টোবরে চট্টগ্রামের একটি সমাবেশ ঘিরে। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার অবমাননার অভিযোগে কোতোয়ালি থানায় রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয়। ২৫ নভেম্বর ঢাকায় চিন্ময়কে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন আদালতে জামিন নাকচের পরে আদালত চত্বরে তাঁর সমর্থক, পুলিশ ও আইনজীবীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। সেই অশান্তির মধ্যে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ নিহত হন। পরে ওই হত্যার মামলাতেও চিন্ময়কে গ্রেফতার দেখানো হয়। অর্থাৎ, একটি মামলা থেকে শুরু হওয়া বন্দিত্বের সঙ্গে যুক্ত হয় একাধিক পৃথক অভিযোগ।

রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল হাইকোর্ট চিন্ময়ের জামিন মঞ্জুর করেছিল। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ সেই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মহম্মদ রেজাউল হক জামিন স্থগিত করেন। ফলে উচ্চ আদালত থেকে অনুকূল আদেশ পেয়েও কারাগার থেকে বেরোতে পারেননি চিন্ময়। একই সময় আদালত প্রাঙ্গণে সংঘর্ষ, ভাঙচুর এবং পুলিশের উপর হামলাসংক্রান্ত আরও মামলায় তাঁকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

আইনি লড়াইয়ের পরের ধাপেও বাধা কাটেনি। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিম্ন আদালতে পাঁচটি মামলায় জামিন না পাওয়ার পরে পৃথক আবেদন নিয়ে হাইকোর্টে গিয়েছিলেন চিন্ময়। চলতি বছরের মে মাসে বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার ও বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের বেঞ্চ আইনজীবী হত্যা মামলায় তাঁর জামিনের আবেদন খারিজ করে। পুলিশের উপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর ও সংশ্লিষ্ট অন্য চারটি মামলার আবেদনের সিদ্ধান্ত তখন পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

আলিফ হত্যা মামলায় চিন্ময়-সহ ৩৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হয়। মামলাটি এখনও বিচারাধীন; অভিযোগ গঠনকে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সমার্থক হিসেবে দেখা যায় না।

বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে ছয়টি ফৌজদারি মামলা রয়েছে। চারটিতে জামিন পেয়েছেন, কিন্তু রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় স্থগিতাদেশ এবং হত্যা মামলায় জামিন না মেলায় মুক্তি আটকে আছে। হত্যা মামলার বিচার চলছে চট্টগ্রামের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে। এই পরিস্থিতি বোঝাচ্ছে, চারটি মামলায় জামিন পাওয়াও তাঁর কারাবাসের অবসানের জন্য যথেষ্ট হয়নি; বাকি দুই মামলার বাধা কাটানোই এখন আইনজীবীদের সামনে প্রধান কাজ।

অপূর্বের দাবি, ছয়টির মধ্যে শুধু হত্যা মামলাতেই অভিযোগপত্র জমা পড়েছে। ওই মামলা খারিজের জন্য ফেব্রুয়ারিতে হাইকোর্টে আবেদন করা হলেও এখনও শুনানি হয়নি; বিষয়টি শুনানির তালিকায় রয়েছে। তাঁর মতে, মুক্তির লড়াইয়ে রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা প্রবল। তবে বিচারব্যবস্থার উপর আস্থা রেখেই তাঁরা চেষ্টা চালাচ্ছেন। এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে এই অভিযোগগুলির বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ বা কারা কর্তৃপক্ষের জবাব নেই।

এদিকে পশ্চিমবঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী চিন্ময়ের কান্নার দৃশ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তৃণমূলের কুণাল ঘোষের প্রশ্ন, বিরোধী দলে থাকতে মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করা বিজেপি এখন কেন্দ্র ও রাজ্যে ক্ষমতায় থেকে কী করছে?

এই মামলার বৃহত্তর পটভূমিতে রয়েছে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার প্রশ্ন। চিন্ময়ের সংগঠনের আট দফা দাবির মধ্যে ছিল নির্যাতনের দ্রুত বিচারে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন, সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন এবং পৃথক মন্ত্রক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংখ্যালঘুদের উপাসনার ব্যবস্থা ও দেবোত্তর সম্পত্তির সুরক্ষাও চাওয়া হয়েছিল। সেই আন্দোলনের একজন প্রধান মুখের দীর্ঘ কারাবাসের কারণে তাঁর জামিনের লড়াই ঘিরে আগ্রহ আদালতের বাইরেও ছড়িয়েছে।

গ্রেফতারের তারিখ ধরে চিন্ময়ের বন্দিত্ব এখন প্রায় ২২ মাস। সামনে প্রশ্ন দুটি: বিচার কত দ্রুত এগোবে, এবং বিচারাধীন অবস্থায় অসুস্থ এই বন্দির চিকিৎসা ও মুক্তির আবেদন কীভাবে বিবেচিত হবে।