হাইলাইটস
- 3I/Atlas নামের আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূমকেতুটি সৌরজগতের চেয়েও অনেক পুরনো হতে পারে।
- বিজ্ঞানীদের ধারণা, এর বয়স প্রায় ১,২০০ কোটি বছর।
- এতে ভারী জল (ডিউটেরিয়াম) অস্বাভাবিক মাত্রায় পাওয়া গেছে।
- ধূমকেতুটি সম্ভবত গঠিত হয়েছিল অত্যন্ত শীতল পরিবেশে, যেখানে তাপমাত্রা ছিল প্রায় মাইনাস ২৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
- গবেষকদের মতে, এটি হয়তো মহাবিশ্বের সেই যুগের স্মারক, যখন বিপুল সংখ্যক নতুন নক্ষত্র জন্ম নিচ্ছিল।
মানবসভ্যতা এখন পর্যন্ত মাত্র তিনটি আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তু পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছে, অর্থাৎ এমন বস্তু যা আমাদের সৌরজগতের বাইরে থেকে এসেছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে নতুন অতিথি 3I/Atlas-কে ঘিরে বিজ্ঞানীদের মধ্যে তীব্র আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নতুন গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, এই ধূমকেতুর বয়স প্রায় ১,২০০ কোটি বছর হতে পারে, যা আমাদের সৌরজগতের বয়সের প্রায় তিনগুণ।সৌরজগতের জন্ম হয়েছে আনুমানিক ৪৫০ কোটি বছর আগে। সেই তুলনায় 3I/Atlas যেন মহাবিশ্বের এক প্রাচীন দূত, যে কোটি কোটি বছর ধরে আকাশগঙ্গা ছায়াপথের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়ে অবশেষে আমাদের কাছে এসেছে।
নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের বিজ্ঞানী মার্টিন কর্ডিনারের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর মতে, “এটি হয়তো আমাদের সৌরজগতে পর্যবেক্ষিত সবচেয়ে প্রাচীন বস্তু।”গবেষণার মূল ভিত্তি হল ধূমকেতুটির রাসায়নিক গঠন। James Webb Space Telescope এবং Atacama Large Millimeter/submillimeter Array (আলমা মানমন্দির) থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন, এতে ডিউটেরিয়াম নামে হাইড্রোজেনের একটি ভারী রূপের উপস্থিতি অত্যন্ত বেশি। সৌরজগতের সাধারণ ধূমকেতুর তুলনায় এর পরিমাণ প্রায় দশগুণ।
ডিউটেরিয়ামের এত বেশি উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে ধূমকেতুটি এমন এক পরিবেশে গঠিত হয়েছিল যেখানে তাপমাত্রা ছিল প্রায় মাইনাস ২৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এত কম তাপমাত্রা মহাবিশ্বের সবচেয়ে শীতল অঞ্চলের মধ্যেই পড়ে। ফলে 3I/Atlas সম্ভবত আমাদের সৌরজগতে দেখা সবচেয়ে ঠান্ডা বস্তুগুলির অন্যতম।ধূমকেতুটির উৎপত্তিস্থল এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে বিজ্ঞানীদের ধারণা, নতুন গ্রহ ও নক্ষত্র গঠনের সময় যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়, সেই সময়ই এটি তার নিজস্ব নক্ষত্রমণ্ডল থেকে ছিটকে বেরিয়ে যায়। এরপর কোটি কোটি বছর ধরে কোনো নক্ষত্রের মহাকর্ষীয় বন্ধনে আবদ্ধ না থেকে এটি আকাশগঙ্গা ছায়াপথের অজানা পথে ভেসে বেড়িয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল, ধূমকেতুটিতে রাসায়নিক সমৃদ্ধির ঘাটতি দেখা গেছে। এর অর্থ, এটি সম্ভবত এমন এক অঞ্চলে তৈরি হয়েছিল যেখানে নতুন নক্ষত্রের জন্ম হচ্ছিল। গবেষকদের ধারণা, এটি হয়তো “কসমিক নুন” নামে পরিচিত মহাজাগতিক যুগের স্মৃতি বহন করছে। প্রায় ১,০০০ কোটি বছর আগে এই সময়টিতে মহাবিশ্বে নক্ষত্র সৃষ্টির হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।এর আগে দুটি আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তু বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছিল— 1I/’Oumuamua এবং 2I/Borisov। তবে সেগুলি এত উজ্জ্বল ছিল না যে তাদের আইসোটোপিক গঠন বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হতো। 3I/Atlas সেই সুযোগ এনে দিয়েছে।
একসময় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী Avi Loeb ‘ওউমুয়ামুয়া’কে ভিনগ্রহের মহাকাশযান বলে বিতর্ক সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি 3I/Atlas সম্পর্কেও অনুরূপ সম্ভাবনার কথা তুলেছিলেন। কিন্তু NASA সেই ধারণা নাকচ করে দিয়েছে। একইভাবে SETI Institute জানিয়েছে, ধূমকেতুটিতে কোনো ভিনগ্রহী প্রযুক্তির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।বর্তমানে 3I/Atlas সৌরজগত ছেড়ে দূরে সরে যাচ্ছে এবং আর কখনও ফিরে আসবে না। ফলে ভবিষ্যতে এটিকে পর্যবেক্ষণ করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠবে। তবুও বিজ্ঞানীরা আশাবাদী। কারণ Vera C. Rubin Observatory-এর মতো নতুন প্রজন্মের মানমন্দির চালু হওয়ায় আগামী বছরগুলিতে আরও বহু আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তুর সন্ধান মিলতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, 3I/Atlas শুধু একটি ধূমকেতু নয়; এটি মহাবিশ্বের বহু প্রাচীন ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী, যা আমাদের ছায়াপথের জন্ম ও বিবর্তন সম্পর্কে নতুন তথ্য জানার দরজা খুলে দিতে পারে।