হাইলাইটস:
- ফুটপাথে হাঁটার অধিকারকে সংবিধানের ১৯(১)(ডি) ও ২১ অনুচ্ছেদের অধীনে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিল সুপ্রিম কোর্ট।
- আদালত জানিয়েছে, পথচারীর অধিকার মোটরযানের অধিকারের চেয়ে অগ্রাধিকার পাবে।
- ফুটপাথে হাঁটার অধিকার সুরক্ষায় পৃথক আইন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে শীর্ষ আদালত।
- পাঁচ বছরের এক শিশুর মৃত্যুর মামলায় ক্ষতিপূরণ বাড়িয়ে ১১.৪৪ লক্ষ টাকা করার নির্দেশ।
- কেন্দ্রের তিনটি মন্ত্রক ও আইন কমিশনকে রায়ের অনুলিপি পাঠানোর নির্দেশ।
বাংলাস্ফিয়ার: ফুটপাথে নিরাপদে হাঁটার অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এক ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ করল সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি পি এস নরসিমহা এবং বিচারপতি অতুল এস চন্দুরকরের বেঞ্চ জানিয়েছে, সংবিধানের ১৯(১)(ডি) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত অবাধ চলাফেরার অধিকার এবং ২১ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হল ফুটপাথে হাঁটার অধিকার। সেই কারণে পথচারীর অধিকার মোটরচালিত যানবাহনের অধিকারের আগে স্থান পাবে।
একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনার মামলার শুনানিতে এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করে আদালত। ঘটনায় স্কুলে যাওয়ার পথে বাবার সঙ্গে থাকা পাঁচ বছরের এক শিশু একটি ট্যাঙ্কারের ধাক্কায় প্রাণ হারায়। শিশুটির বাবা ২৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিলেন। কিন্তু ক্ষতিপূরণের অঙ্ক কমিয়ে ৪.৭০ লক্ষ টাকা করা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট সেই অঙ্ক বাড়িয়ে ১১,৪৪,৬২৮ টাকা নির্ধারণ করেছে এবং নির্দেশ দিয়েছে যে দুই মাসের মধ্যে ওই অর্থ প্রদান করতে হবে।
রায়ে আদালত স্পষ্টভাবে বলেছে, ফুটপাথে হাঁটার অধিকার যদিও ইতিমধ্যেই মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত, তবু এই অধিকার রক্ষা ও কার্যকর করার জন্য দেশে কোনও নির্দিষ্ট আইন নেই। তাই একটি পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামো প্রয়োজন।
আদালতের মতে, নতুন আইনে শুধু এই অধিকার ঘোষণা করলেই চলবে না, কারা এই অধিকারের রক্ষক বা ‘ডিউটি বেয়ারার’ তা-ও নির্দিষ্ট করতে হবে। পাশাপাশি অধিকার লঙ্ঘিত হলে দ্রুত প্রতিকার এবং ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
বেঞ্চ বলেছে, “ফুটপাথে হাঁটার অধিকার সংবিধানের ২১ এবং ১৯(১)(ডি) অনুচ্ছেদের অন্তর্গত। কিন্তু এ বিষয়ে কোনও আইন নেই। তাই একটি আইনগত কাঠামো তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি, যা এই অধিকারকে স্বীকৃতি দেবে, রক্ষা করবে, শক্তিশালী করবে এবং লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করবে।”
এই প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, রায়ের অনুলিপি কেন্দ্রীয় আবাসন ও নগর বিষয়ক মন্ত্রক, গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রক এবং সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রকের কাছে পাঠাতে। আদালত এই তিনটি মন্ত্রককেও মামলায় পক্ষভুক্ত করেছে, যাতে তারা প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো তৈরির বিষয়ে চিন্তাভাবনা করতে পারে।
আইন কমিশনের কাছেও রায়ের অনুলিপি পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত চায়, আইন কমিশন এই বিষয়ে একটি উপযুক্ত আইনি কাঠামো পরীক্ষা করে দেখুক, যেখানে পথচারীর অধিকার সুরক্ষা, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলির ভূমিকা এবং প্রতিকার ব্যবস্থার বিষয়গুলি স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকবে।
রায়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালত বলেছে, মোটরযান আইন, ১৯৮৮ মূলত যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও সড়ক পরিবহণ সংক্রান্ত আইন। এটি পথচারীর অধিকার সুরক্ষার জন্য প্রণীত নয়। বরং বহু ক্ষেত্রে এই আইন পথচারীদের স্বার্থকে উপেক্ষা করেছে বা দুর্বল করেছে বলেও পর্যবেক্ষণ করেছে বেঞ্চ।
শুধু আইন করাই যথেষ্ট নয় বলেও মনে করছে আদালত। ফুটপাথে হাঁটার মৌলিক অধিকার বাস্তবে কার্যকর করতে একটি স্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা রেগুলেটরি বডি গঠনের সুপারিশ করেছে বেঞ্চ। এই সংস্থা পথচারী অবকাঠামো পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, নজরদারি এবং আইন প্রয়োগের কাজ করবে।
সবশেষে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে যে মামলাটির শিরোনাম পরিবর্তন করে “Re: Fundamental Right to Walk and Footpath” করা হোক, যাতে বৃহত্তর জনস্বার্থের এই প্রশ্নে ভবিষ্যতেও শুনানি ও পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়া যায়।
এই রায় দেশের নগর ও গ্রামীণ পরিকাঠামো পরিকল্পনায় এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা করতে পারে। এতদিন রাস্তা ও যানবাহনকেন্দ্রিক উন্নয়নই অগ্রাধিকার পেয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ সেই ধারণাকে বদলে দিয়ে জানিয়ে দিল—রাস্তা প্রথমত মানুষের জন্য, গাড়ির জন্য নয়। পথচারীর নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং চলাচলের স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
ফুটপাথের লড়াই: সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর বাংলায় কতদূর যাবে হকার উচ্ছেদ অভিযান?