হাইলাইটস:

  • পথচারীর ফুটপাথে হাঁটার অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
  • এই রায় বিজেপি সরকারের হকার উচ্ছেদ অভিযানে নতুন আইনি শক্তি জোগাতে পারে।
  • কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন শহরে ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা।
  • তবে ২০১৪ সালের স্ট্রিট ভেন্ডর আইনের কারণে পুনর্বাসন ছাড়া নির্বিচারে উচ্ছেদ সহজ নয়।
  • শহুরে মধ্যবিত্তের সমর্থন ও হকার ভোটব্যাঙ্কের ক্ষোভ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হবে সরকারকে।

বাংলাস্ফিয়ার: একটা শহরকে বোঝার অনেক উপায় আছে। কেউ তার উঁচু দালান দেখে, কেউ তার রাস্তা দেখে, কেউ তার ইতিহাস। কিন্তু কোনও শহর আসলে কতটা মানুষের, তা বোঝা যায় তার ফুটপাথ দেখে।

কলকাতার ফুটপাথ বহুদিন ধরেই কেবল হাঁটার জায়গা নয়। সেখানে দোকান আছে, চায়ের ঠেক আছে, ফলের ঝুড়ি আছে, জামাকাপড়ের স্টল আছে, কখনও আবার ছোটখাটো বাজারও আছে। বহু মানুষের কাছে ফুটপাথ জীবিকার উৎস। আবার বহু মানুষের কাছে সেটাই দুর্ভোগের কারণ। হাঁটার জন্য তৈরি জায়গায় যখন হাঁটাই যায় না, তখন পথচারীকে নেমে যেতে হয় ব্যস্ত রাস্তায়। দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে, ভোগান্তি বাড়ে, ক্ষোভ জমে।

এই দীর্ঘদিনের বিতর্কে নতুন মোড় এনে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়। দেশের সর্বোচ্চ আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, ফুটপাথে নিরাপদে হাঁটার অধিকার কোনও দয়া বা প্রশাসনিক সুবিধা নয়; এটি সংবিধানপ্রদত্ত একটি মৌলিক অধিকার। আদালত এমনও বলেছে যে পথচারীর অধিকারকে মোটরযানের স্বার্থের আগেও গুরুত্ব দিতে হবে।

রায় ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—বাংলায় বিজেপি সরকার যে হকার উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছে, তা কি এখন আরও তীব্র হবে?

উত্তর খুঁজতে গেলে রাজ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির দিকে তাকাতে হয়।

ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিজেপি সরকার প্রশাসনিক কঠোরতার বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। অবৈধ নির্মাণ, রাস্তা দখল, ফুটপাথ দখল—সব ক্ষেত্রেই অভিযান চালানোর কথা বলা হয়েছে। কলকাতা, হাওড়া, শিলিগুড়ি, দুর্গাপুর কিংবা আসানসোল, প্রায় সব বড় শহরেই ফুটপাথ দখলমুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

কিন্তু এতদিন একটি বড় বাধা ছিল। হকারদের জীবিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠত। বিরোধীরা বলত, লক্ষ লক্ষ পরিবার ফুটপাথ-নির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। উচ্ছেদ মানে শুধু দোকান সরানো নয়, বহু মানুষের রুজিরুটি কেড়ে নেওয়া।

সুপ্রিম কোর্টের রায় সেই বিতর্কের ভারসাম্য কিছুটা বদলে দিয়েছে।

এখন সরকার বলতে পারবে, তারা শুধু শহর সুন্দর করার জন্য অভিযান চালাচ্ছে না। তারা একটি মৌলিক অধিকার রক্ষা করছে। কোনও পথচারী যদি ফুটপাথ ব্যবহার করতে না পারেন, তাহলে সেটি তাঁর সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন। প্রশাসনের হাতে এর চেয়ে শক্তিশালী যুক্তি আর কী হতে পারে?

তবে এখানেই গল্প শেষ নয়।

কারণ ভারতের আইনি কাঠামো একমুখী নয়। যেমন পথচারীর অধিকার আছে, তেমনই জীবিকার অধিকারও আছে। এই কারণেই ২০১৪ সালে স্ট্রিট ভেন্ডর আইন তৈরি হয়েছিল। সেই আইনে বলা হয়েছে, কোনও হকারকে সরানোর আগে সমীক্ষা করতে হবে, ভেন্ডিং জোন চিহ্নিত করতে হবে, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থাৎ আইন স্বীকার করে যে রাস্তার ধারে ব্যবসা করা বহু মানুষের বেঁচে থাকার উপায়।

ফলে সুপ্রিম কোর্টের রায় বিজেপি সরকারকে শক্তি দিলেও তা কোনও ‘বুলডোজার লাইসেন্স’ দেয়নি।

বরং প্রশাসনের সামনে এখন আরও জটিল দায়িত্ব এসেছে। একদিকে ফুটপাথকে পথচারীর জন্য ফিরিয়ে দিতে হবে, অন্যদিকে বৈধ হকারদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে।

এই জায়গাতেই আগামী দিনের রাজনীতি লুকিয়ে আছে।

কলকাতার মধ্যবিত্ত বহুদিন ধরে ফুটপাথ দখল নিয়ে ক্ষুব্ধ। অফিসযাত্রী, বৃদ্ধ, স্কুলপড়ুয়া, প্রতিবন্ধী মানুষ, সবার অভিযোগ এক। শহরে হাঁটার জায়গা নেই। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর এই শ্রেণির মধ্যে উচ্ছেদ অভিযানের প্রতি সমর্থন আরও বাড়তে পারে।

কিন্তু অন্যদিকে রয়েছে বিশাল হকার সমাজ। কলকাতা ও তার আশপাশের অঞ্চলে লক্ষাধিক পরিবার সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রাস্তার ধারের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাদের কাছে ফুটপাত শুধু জমি নয়, সংসারের ভাত-কাপড়-চিকিৎসার নিশ্চয়তা।

এই কারণেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই হকারদের পক্ষে সরব হয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য স্পষ্ট—গরীব মানুষের জীবিকার উপর আঘাত করা হচ্ছে। তৃণমূল এই ইস্যুকে আগামী দিনে বড় রাজনৈতিক আন্দোলনের বিষয় বানানোর চেষ্টা করবে, এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ফলে আগামী কয়েক মাসে বাংলার শহরাঞ্চলে এক নতুন সংঘাতের ছবি দেখা যেতে পারে।

একদিকে থাকবে আদালতের রায়, প্রশাসনের অভিযান এবং শহুরে নাগরিকদের দাবি। অন্যদিকে থাকবে জীবিকার প্রশ্ন, পুনর্বাসনের দাবি এবং রাজনৈতিক প্রতিরোধ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বিজেপি সরকার এই মুহূর্তে শুধু উচ্ছেদ করে থেমে যেতে পারবে না। যদি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান চাই, তাহলে আধুনিক ভেন্ডিং জোন, নির্দিষ্ট বাজার এলাকা, লাইসেন্স ব্যবস্থা এবং পুনর্বাসন প্রকল্প গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় ফুটপাত কিছুদিনের জন্য ফাঁকা হলেও সমস্যা আবার ফিরে আসবে।

ইতিহাস বলে, কলকাতায় হকার উচ্ছেদের চেষ্টা নতুন নয়। বহু সরকার এসেছে, বহু অভিযান হয়েছে। কিন্তু কয়েক মাস পরেই আবার ফুটপাথ ভরে উঠেছে। কারণ সমস্যার শিকড় অর্থনীতির ভিতরে। যেখানে কর্মসংস্থান কম, সেখানে ফুটপাথই হয়ে ওঠে সবচেয়ে সহজ ব্যবসার জায়গা।

তাই সুপ্রিম কোর্টের রায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে বটে, কিন্তু শেষ অধ্যায় নয়।

আগামী দিনের লড়াই আসলে হকার বনাম পথচারীর লড়াই নয়। এটি একটি শহরকে কার জন্য, কীভাবে এবং কোন নিয়মে গড়ে তোলা হবে, সেই প্রশ্নের লড়াই। বিজেপি সরকার যদি এই সুযোগে সত্যিই একটি সুশৃঙ্খল নগরনীতি তৈরি করতে পারে, তাহলে এই রায় বাংলার শহরগুলির চেহারা বদলে দিতে পারে। আর যদি শুধু উচ্ছেদই লক্ষ্য হয়, তবে সংঘাত বাড়বে, সমাধান নয়।

ফুটপাথের এই লড়াই তাই এখন আর কেবল কয়েক ফুট জায়গার লড়াই নয়। এটি অধিকার, জীবিকা, আইন এবং রাজনীতির এক জটিল সমীকরণ যার ফলাফল আগামী কয়েক মাসে বাংলার রাস্তাঘাটেই লেখা হবে।