হাইলাইটস

  • ফুটপাথে হাঁটার অধিকারকে সংবিধানসম্মত মৌলিক অধিকার বলে ঘোষণা করল সুপ্রিম কোর্ট।
  • দেশে বছরে ৩৬,৫২৬ জন পথচারীর মৃত্যু—মোট সড়ক দুর্ঘটনায় মৃতদের ২০.৬ শতাংশ।
  • ২০১৪ সালের তুলনায় পথচারী মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বেড়েছে।
  • বিশেষজ্ঞদের মতে, রায়ের সাফল্য নির্ভর করবে কঠোর আইন, জবাবদিহি ও বাস্তবায়নের উপর।
  • পথচারী-বান্ধব নগর পরিকল্পনার জন্য স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠনের দাবি উঠেছে।

বাংলাস্ফিয়ার: দেশের সড়ক ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অবহেলিত নাগরিক পথচারীরা। ফুটপাত দখল, নিরাপদ রাস্তা পারাপারের অভাব, বেপরোয়া যানবাহন এবং পরিকল্পনাহীন নগরায়ণের ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ঝুঁকি নিয়ে হাঁটতে বাধ্য হন। এই প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়—ফুটপাথে নিরাপদে হাঁটার অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি—নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞ ও কর্মীদের কাছে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পরিবহণ মন্ত্রকের (MoRTH) ২০২৪ সালের সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশে ৩৬,৫২৬ জন পথচারীর মৃত্যু হয়েছে। দুই-চাকাযুক্ত যানবাহনের আরোহীদের পর পথচারীরাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারী। মোট সড়ক দুর্ঘটনায় মৃতদের ২০.৬ শতাংশই ছিলেন পথচারী। তুলনায়, দুই-চাকাযুক্ত যানবাহনের আরোহীদের মৃত্যু হয়েছে ৪৬.২ শতাংশ।

পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগজনক একটি প্রবণতা তুলে ধরছে। ২০২৩ সালে পথচারী মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৩৫,২২১। এক বছরের মধ্যে তা বেড়েছে ৩.৭ শতাংশ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি চিত্র আরও ভয়াবহ। ২০১৪ সালে যেখানে পথচারী মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১২,৩৩০, সেখানে এক দশকে তা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সড়ক অবকাঠামো সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে পথচারীদের নিরাপত্তা ক্রমশ সংকটের মুখে পড়েছে।

বিশেষত বড় শহরগুলিতে পরিস্থিতি আরও খারাপ। দেশের ৫০টি দশ লক্ষের বেশি জনসংখ্যার শহরে মোট সড়ক দুর্ঘটনায় মৃতদের ২৫.২ শতাংশই পথচারী। নগরায়ণের চাপ, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ফুটপাথের সংকোচন এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যানও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ৪৫ থেকে ৬০ বছর বয়সিদের মধ্যে পথচারী মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি—৮,৪৩৬। এরপর রয়েছে ৩৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সি গোষ্ঠী (৭,৬৩৬) এবং ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সিরা (৭,২৮১)। অর্থাৎ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে।

সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের সূত্রপাত হয়েছিল একটি মোটর দুর্ঘটনা সংক্রান্ত ক্ষতিপূরণ মামলায়। স্কুলে যাওয়ার পথে ট্যাঙ্কারের ধাক্কায় এক শিশুর মৃত্যু হয়। সেই মামলার শুনানি করতে গিয়ে আদালত বৃহত্তর প্রশ্ন উত্থাপন করে—একজন নাগরিকের নিরাপদে হাঁটার অধিকার কি রাষ্ট্র নিশ্চিত করছে? সেই প্রশ্ন থেকেই আদালত পথচারীদের সাংবিধানিক অধিকারের বিষয়টি বিশদে পর্যালোচনা করে।

রায়ে আদালত শুধু অধিকার স্বীকার করেই থেমে থাকেনি। পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক নির্দেশও দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারতীয় সড়ক কংগ্রেসের (IRC) মানদণ্ড বাধ্যতামূলকভাবে মেনে চলা, যে শহরগুলিতে পথচারী মৃত্যুর হার বেশি সেখানে দ্রুত নিরাপদ পারাপার ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং পথচারী-বান্ধব রাস্তা নির্মাণের জন্য নির্দিষ্ট বিধি প্রণয়ন।

আইআইটি দিল্লির পরিবহণ গবেষণা ও আঘাত প্রতিরোধ কেন্দ্রের অধ্যাপক গীতম তিওয়ারির মতে, এই রায়ের প্রকৃত গুরুত্ব নির্ভর করবে বাস্তবায়নের উপর। তাঁর বক্তব্য, স্থানীয়, রাজ্য এবং জাতীয় স্তরে উপযুক্ত আইনগত কাঠামো তৈরি না হলে এই রায়ও কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে। একই সঙ্গে তিনি ভারতীয় সড়ক কংগ্রেসের পথচারী-সংক্রান্ত মানদণ্ড বাধ্যতামূলক করার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও মনে করেন।

তবে তিনি সতর্কও করেছেন। গত বছরের অক্টোবর মাসে সুপ্রিম কোর্ট পথচারী নিরাপত্তা নিয়ে যে নির্দেশ দিয়েছিল, তার বাস্তব প্রয়োগ প্রায় দেখা যায়নি। কারণ নির্দিষ্ট সময়সীমা মেনে কাজ হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের জন্য কোনও কর্তৃপক্ষ বা জবাবদিহির ব্যবস্থা নেই। ফলে প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা ছাড়া নতুন রায়ের ফলও সীমিত হতে পারে।

নগর গতিশীলতা ও সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ চেতন সোডায়ের মতে, বেঙ্গালুরুর ‘নম্মা রাসতে’ প্রকল্প কিংবা কেন্দ্রের ‘স্ট্রিটস ফর পিপল’ ও ‘সাইকেলস ফর চেঞ্জ’-এর মতো কর্মসূচি দেখিয়েছে যে মানুষকেন্দ্রিক রাস্তা নির্মাণ সম্ভব এবং কার্যকর। কিন্তু বাস্তবে বারবার গাড়িকেন্দ্রিক নীতির কাছে এই উদ্যোগগুলি পিছিয়ে পড়েছে। মানুষের নিরাপত্তাকে প্রায়শই গৌণ বিষয় হিসেবে দেখা হয়েছে।

তাঁর মতে, এখন প্রয়োজন জাতীয় ও আঞ্চলিক স্তরে পথচারী অধিকারের জন্য স্বাধীন ও আইনসম্মত নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন। তবেই আদালতের পর্যবেক্ষণ বাস্তব রূপ পাবে এবং নাগরিকদের দৈনন্দিন চলাচল আরও নিরাপদ হবে।

ভারতের শহরগুলিতে ফুটপাথ দখল, অবৈধ পার্কিং, রাস্তার উপর ব্যবসা, পর্যাপ্ত জেব্রা ক্রসিংয়ের অভাব এবং যানবাহনের গতিনিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা বহুদিনের সমস্যা। এই পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের রায় শুধু একটি আইনি সিদ্ধান্ত নয়; এটি উন্নয়ন ও নগর পরিকল্পনার দর্শনকে নতুনভাবে ভাবার আহ্বান। আদালত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—রাস্তা শুধু গাড়ির জন্য নয়, মানুষের জন্যও।

এখন দেখার বিষয়, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলি এই রায়কে কত দ্রুত এবং কতটা গুরুত্ব দিয়ে বাস্তব নীতিতে রূপান্তরিত করে। কারণ প্রতি বছর যদি ৩৬ হাজারেরও বেশি পথচারী প্রাণ হারান, তবে তা কেবল সড়ক নিরাপত্তার ব্যর্থতা নয়, নাগরিক অধিকারেরও গভীর সংকট। সুপ্রিম কোর্ট সেই সংকটকেই সামনে এনে রাষ্ট্রকে তার দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিল।