পাকিস্তানে সাংবাদিকদের ওপর নজিরবিহীন নতুন বিধিনিষেধ জারি করল সরকার। মানবাধিকার সংগঠন ও সাংবাদিকদের অভিযোগ, এই পদক্ষেপের ফলে বিশ্বের পঞ্চম সর্বাধিক জনবহুল দেশটি সম্পর্কে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংবাদ সংগ্রহের অন্যতম শেষ পথও কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে।
নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, বিদেশি সংবাদমাধ্যমে কর্মরত কোনও সাংবাদিক ইসলামাবাদ, করাচি ও লাহোরের বাইরে সংবাদ সংগ্রহে যেতে চাইলে আগাম সরকারি অনুমতি নিতে হবে। পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচার এবং জুন মাস থেকে চলা অধিক রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে বিক্ষোভের আবহেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান মানবাধিকার সংগঠন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সংবাদ সংগ্রহকে সরকারি অনুমতির আওতায় আনা স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে সরকার সমালোচনামূলক সাংবাদিকতাকে নিরুৎসাহিত করতে চাইছে।
সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে। কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (CPJ)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ১ আগস্ট ওই অঞ্চলের দুই স্বাধীন সাংবাদিককে আটক করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের অভিযোগে আরও কয়েকজন সাংবাদিককে ‘মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য’ ছড়ানোর অভিযোগে আদালতে তলব করা হয়েছে।
গত রবিবার আল জাজিরার এক পাকিস্তানি সাংবাদিকের নির্বাচনী প্রতিবেদনকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করে ইসলামাবাদ। এরপর পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে বিদেশি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের অবিলম্বে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তার পরেই আসে নতুন ভ্রমণ-অনুমতির নিয়ম।
এর আগেও বিদেশি সাংবাদিকদের এই তিন শহরের বাইরে যেতে অনুমতি লাগত। তবে সেই অনুমতি পেতে প্রায়ই কয়েক মাস লেগে যেত, অনেক ক্ষেত্রে কোনও উত্তরই মিলত না। নতুন নির্দেশিকায় সেই নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর এশিয়া বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্যাট্রিসিয়া গসম্যান বলেন, এই সিদ্ধান্ত পাকিস্তানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের পরিসর আরও সংকুচিত করবে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স-এর সর্বশেষ বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে পাকিস্তানের অবস্থান ১৫৩তম।
পাকিস্তান ফেডারেল ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টসও এই বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির বক্তব্য, সরকার যদি সত্যিই গণতন্ত্র ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে, তবে অবিলম্বে এই নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া উচিত।
যদিও পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, নতুন নিয়মের পরও বিদেশি সংবাদমাধ্যম স্বাভাবিকভাবেই কাজ চালিয়ে যেতে পারবে। ভ্রমণের অনুমতি দ্রুত দেওয়ার জন্য নতুন একটি ব্যবস্থা চালুর কাজ চলছে বলেও জানিয়েছে তারা।
ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্লেষক কামরান বোখারি মনে করেন, সরকারের এই পদক্ষেপের লক্ষ্য মূলত তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এমন কৌশল উল্টো ফলও দিতে পারে।
সরকার কীভাবে এই নিয়ম বাস্তবায়ন করবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। কারণ বিদেশি সংবাদমাধ্যমের হয়ে কাজ করা বহু পাকিস্তানি সাংবাদিক ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থান করছেন।
যদিও বিধিনিষেধটি গোটা পাকিস্তানের জন্য প্রযোজ্য, এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের নির্বাচন কভারেজে। আগামী ১০ আগস্ট সেখানে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার কথা। আন্দোলনকারীরা দীর্ঘদিন ধরে সাংবিধানিক সংস্কার ও অধিক রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানিয়ে আসছেন, কিন্তু ইসলামাবাদ সেই দাবি মানতে রাজি নয়।
সরকারের অভিযোগ, আন্দোলনকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সহিংসতা চালিয়েছে। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদের দাবি, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দমন করতে পুলিশ অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাধীন সূত্রের হিসাবে, জুন ও জুলাই মাসের সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে আন্দোলনকারী, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং সাধারণ মানুষও রয়েছেন।
সাংবাদিক সংগঠন ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর অভিযোগ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে সেন্সরশিপ, আর্থিক চাপ, ব্যাংক হিসাব জব্দ, সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ, জোরপূর্বক অপসারণ, নির্বিচার গ্রেপ্তার ও কারাবন্দির ঘটনা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
এছাড়া গত এক বছরে নিরাপত্তা সংস্থার প্রতিনিধিরা কয়েকজন সাংবাদিককে সরকারপন্থী ইংরেজি সংবাদমাধ্যম গড়ে তুলতে উৎসাহিত করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
পাকিস্তানের সম্পাদকদের শীর্ষ সংগঠনের মতে, দেশের সংবাদমাধ্যমের প্রতি সরকারের বর্তমান নীতি একটাই—“সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।”