Home খবর বিবিসির দীর্ঘ তরঙ্গের বিদায়: শেষ হতে চলেছে ব্রিটিশ বেতার সম্প্রচারের এক ঐতিহাসিক যুগ

বিবিসির দীর্ঘ তরঙ্গের বিদায়: শেষ হতে চলেছে ব্রিটিশ বেতার সম্প্রচারের এক ঐতিহাসিক যুগ

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
8 views 4 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

  • ২৭ জুন থেকে বন্ধ হচ্ছে বিবিসি রেডিও ৪-এর দীর্ঘ তরঙ্গ (লং ওয়েভ) সম্প্রচার।
  • ১৯৩৪ সালে চালু হওয়া ড্রইটউইচ ট্রান্সমিটার ছিল ব্রিটেনের সবচেয়ে শক্তিশালী বেতার কেন্দ্র।
  • দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফরাসি প্রতিরোধ আন্দোলনের কাছে সাংকেতিক বার্তা পাঠাতে ব্যবহৃত হয়েছিল এই সম্প্রচার।
  • পুরোনো প্রযুক্তি রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সম্প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত।
  • আগামী দিনে ব্রিটেনে ইন্টারনেটভিত্তিক রেডিও ও টেলিভিশনের যুগই হবে প্রধান ভরসা।

বার্লিন, লন্ডন, প্যারিস, ড্রইটউইচ—একসময় ব্রিটিশ রেডিও সেটের ডায়ালে এই শহরগুলির নামই নির্দেশ করত কোন তরঙ্গে কোন সম্প্রচার ধরা যাবে। ইংল্যান্ডের মধ্যভাগের ছোট্ট শহর ড্রইটউইচ, যেখানে তখন জনসংখ্যা ছিল মাত্র পাঁচ হাজারের মতো, তবু বেতার ইতিহাসে তার গুরুত্ব ছিল অসাধারণ। ১৯৩৪ সালে বিবিসি এখানেই চালু করেছিল তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী বেতার সম্প্রচারক। প্রায় ৭০০ ফুট (২১৩ মিটার) উচ্চতার দুটি ইস্পাতের টাওয়ার সে সময় ব্রিটেনের সর্বোচ্চ স্থাপনার মধ্যে ছিল। সেই টাওয়ার থেকেই দীর্ঘ তরঙ্গের সম্প্রচার শুধু সমগ্র ব্রিটেন নয়, ইউরোপের বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছে যেত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই কেন্দ্রের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। এখান থেকে সম্প্রচারিত হতো আপাতদৃষ্টিতে অর্থহীন বাক্য—যেমন, “খরগোশটি তার গর্তে ঢুকছে”। কিন্তু ফরাসি প্রতিরোধ যোদ্ধারা সেই বাক্যগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকা গোপন সংকেত উদ্ধার করতেন। পরবর্তী সময়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে এই তরঙ্গ পরিচিত হয়ে ওঠে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান “টেস্ট ম্যাচ স্পেশাল”-এর সম্প্রচারের জন্য। কিন্তু ২৭ জুন থেকে সেই ইতিহাসের পর্দা নামছে। বিবিসি আনুষ্ঠানিকভাবে রেডিও ৪-এর দীর্ঘ তরঙ্গ সম্প্রচার বন্ধ করছে। কারণ, এত পুরোনো প্রযুক্তি সচল রাখা ক্রমশ ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। ড্রইটউইচ কেন্দ্র এখনও বিশাল আকারের বিশেষ সিরামিক ও ধাতব ভালভ ব্যবহার করে, যেগুলোর উৎপাদন বহু আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।

বাস্তবে এই পরিবর্তন সাধারণ মানুষের জীবনে খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না। অধিকাংশ শ্রোতাই এখন ডিজিটাল রেডিও, মোবাইল বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শোনেন। তবে এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই ব্রিটেনের ঐতিহ্যবাহী বেতার যুগের অবসানের সূচনা হিসেবে দেখছেন। দীর্ঘ তরঙ্গের সমর্থকদের অবশ্য ভিন্ন মত রয়েছে। বহুদিন ধরে প্রচলিত একটি বিশ্বাস হলো, সমুদ্রে টহলরত ব্রিটিশ পারমাণবিক সাবমেরিনগুলো বিবিসির “টুডে” অনুষ্ঠান শুনে নিশ্চিত হয় যে ব্রিটেন এখনও অক্ষত রয়েছে। অবিশ্বাস্য শোনালেও সামরিক ইতিহাসবিদ জেমস জিংক্সের মতে, এটি নিছক গুজব নয়। যদিও বর্তমানে রয়্যাল নেভির হাতে দেশের অবস্থা জানার আরও উন্নত ব্যবস্থা রয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হলো বিখ্যাত শিপিং ফোরকাস্ট বা সমুদ্র আবহাওয়ার বুলেটিন। তবে মৎস্যজীবীদের সংগঠনের প্রতিনিধি মাইক রোচ জানিয়েছেন, আজকের নৌযানগুলো উচ্চ-কম্পাঙ্কের বেতার এবং উপগ্রহ প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও নির্ভুল ও দ্রুত আবহাওয়ার তথ্য পেয়ে থাকে। ফলে দীর্ঘ তরঙ্গের ওপর নির্ভরশীলতা অনেকটাই কমে গেছে। তবুও একটি বাস্তব সমস্যা রয়ে গেছে। দীর্ঘ তরঙ্গ এমন সব প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছায়, যেখানে এখনও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট নেই। কিন্তু ভবিষ্যতে সেসব মানুষকেও সম্ভবত অনলাইন মাধ্যমের ওপরই নির্ভর করতে হবে।

১৯৯৭ সালে ব্রিটেনের অধিকাংশ সম্প্রচার টাওয়ার, ড্রইটউইচসহ, বেসরকারি সংস্থা আর্কিভা-র কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। বর্তমানে বিবিসি ও অন্যান্য সম্প্রচার সংস্থা সেই অবকাঠামো ভাড়া নিয়ে ব্যবহার করে। অথচ ক্রমশ বেশি মানুষ যখন ইন্টারনেটে অনুষ্ঠান দেখছেন ও শুনছেন, তখন সারা দেশে স্থলভিত্তিক সম্প্রচার চালিয়ে যাওয়ার অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। গবেষণা সংস্থা এন্ডার্স অ্যানালিসিস-এর হিসাবে, শুধু স্থলভিত্তিক টেলিভিশন সম্প্রচার বজায় রাখতেই বিবিসির বছরে প্রায় ৩০ কোটি পাউন্ড ব্যয় হয়। অন্যদিকে মোবাইল পরিষেবা সংস্থাগুলি একই বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে পঞ্চম প্রজন্মের যোগাযোগ প্রযুক্তি আরও সম্প্রসারণ করতে আগ্রহী।

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ সরকার রেডিও সম্প্রচারের ভবিষ্যৎ নিয়ে পর্যালোচনা শুরু করে। টেলিভিশনের ক্ষেত্রেও বিবিসি ও অন্যান্য সম্প্রচার সংস্থা ২০৩৪ সালের মধ্যেই পুরোপুরি ইন্টারনেটনির্ভর হতে চায়। তবে সরকার আশঙ্কা করছে, এখনও যেসব প্রবীণ নাগরিকের বাড়িতে ব্রডব্যান্ড নেই, তারা ক্ষুব্ধ হতে পারেন। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০৪০ সালেও ব্রিটেনের প্রায় ১৫ লক্ষ পরিবার, অর্থাৎ মোট পরিবারের পাঁচ শতাংশ, স্থলভিত্তিক টেলিভিশনের ওপর নির্ভরশীল থাকবে।

২৩ জুন প্রকাশিত সরকারি সবুজপত্রে জানানো হয়েছে, স্থলভিত্তিক টেলিভিশন সম্প্রচার বন্ধ করার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি তৈরি করা হবে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, সবচেয়ে আগে ২০৩৪ সালে এবং সর্বোচ্চ ২০৪৪ সালের মধ্যে এই সম্প্রচার পুরোপুরি বন্ধ হতে পারে। অতএব, ড্রইটউইচের দীর্ঘ তরঙ্গের বিদায় কেবল একটি রেডিও পরিষেবা বন্ধ হওয়া নয়; এটি এমন এক যুগের সমাপ্তির প্রতীক, যখন বিশাল অ্যান্টেনা, দূরপাল্লার বেতার তরঙ্গ এবং আকাশপথে ভেসে আসা শব্দই ছিল যোগাযোগের প্রধান ভরসা। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্রিটেন এখন সেই ঐতিহ্য ছেড়ে প্রবেশ করছে সম্পূর্ণ ডিজিটাল সম্প্রচারের নতুন অধ্যায়ে।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles