হাইলাইটস:

  • ফ্রান্সে তাপপ্রবাহ-সম্পর্কিত মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে চার শিশুরে দাঁড়িয়েছে।
  • অতিরিক্ত গরমে সাঁতার কাটতে নেমে অন্তত ৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
  • বিজ্ঞানীদের মতে, ইউরোপের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বিস্তৃত ও তীব্র তাপপ্রবাহ।
  • যুক্তরাজ্যে টানা তৃতীয় দিন জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙল।
  • ফ্রান্স ও ব্রিটেনের পর এখন মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে আরও ভয়াবহ গরমের পূর্বাভাস।

বাংলাস্ফিয়ার: ইউরোপজুড়ে চলা নজিরবিহীন তাপপ্রবাহে মৃত্যুমিছিল আরও দীর্ঘ হচ্ছে। ফ্রান্সে এই দাবদাহের সঙ্গে যুক্ত মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে চার শিশুরে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত গরম থেকে বাঁচতে নদী, হ্রদ বা সমুদ্রে নামার পর ডুবে অন্তত ৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের আশঙ্কা, ফ্রান্স ও ব্রিটেনে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও এখন এই তীব্র গরম পূর্ব ইউরোপের দিকে সরে গিয়ে প্রায় ১৫ কোটি মানুষকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার মুখে ফেলবে।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ইউরোপের ৮৫০টি বৃহত্তম শহরের প্রায় অর্ধেকই এখন নজিরবিহীন তাপচাপের মধ্যে রয়েছে। তাঁদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার থেকে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেই এত বড় ও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ সম্ভব হয়েছে।

ফ্রান্সের মার্সেই শহরের একটি হাসপাতাল জানিয়েছে, মাত্র ১৮ মাস বয়সি এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে অতিরিক্ত তাপে। শিশুটিকে একটি গাড়ির ভিতরে অচৈতন্য অবস্থায় পাওয়া যায়। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের ধারণা, বাবা সম্ভবত শিশুটিকে ডে-কেয়ারে নামিয়ে দেওয়ার কথা ভুলে কর্মস্থলে চলে গিয়েছিলেন। এর আগে প্যারিসের উপকণ্ঠে তিন বছরের এক শিশু খেলতে গিয়ে গাড়ির ভিতরে আটকে পড়ে মারা যায়। আবার পৃথক ঘটনায় দুই ও চার বছর বয়সি আরও দুই শিশুর দেহ একটি আবাসিক গাড়ি পার্কে রাখা পারিবারিক গাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

ফ্রান্সের ক্রীড়ামন্ত্রী মারিনা ফেরারি জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত সারা দেশে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৫৫ হয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে, কারণ প্রচণ্ড গরমে মানুষ বিপজ্জনক জলাশয়েও নেমে পড়ছেন।

অন্যদিকে যুক্তরাজ্যেও তাপপ্রবাহ নতুন রেকর্ড গড়ছে। দেশটির আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, শুক্রবার সাফোকের স্যান্টন ডাউনহ্যামে তাপমাত্রা ৩৭.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে, যা জুন মাসের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। লন্ডন ও দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডে টানা তৃতীয় দিনের মতো সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মতে, এই গরমে সুস্থ মানুষের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

অতিরিক্ত গরমে যুক্তরাজ্যের এক হাজারেরও বেশি স্কুল পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকায় বহু বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ অসহনীয় হয়ে উঠেছে। রেলযাত্রীদের অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়াতে বলা হয়েছে, কারণ রেললাইনের ওপর গরমের প্রভাব পড়ছে। ডার্বিশায়ারে প্রায় ২০০ হেক্টর এলাকাজুড়ে দাবানল এখনও নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে।

বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা, পানির সংকট এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপও দ্রুত বাড়ছে। কেন্ট অঞ্চলে পানির অপচয় রোধে পাইপ দিয়ে বাগানে জল দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে। লন্ডনের অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা জানিয়েছে, তারা বুধবার একদিনেই ইতিহাসের সর্বাধিক জীবনসঙ্কটপূর্ণ জরুরি ফোন পেয়েছে।

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসেও হাসপাতালগুলি কার্যত ভেঙে পড়ার অবস্থায়। শহরের পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, চিকিৎসা পরিষেবার ওপর চাপ কমাতে রাস্তায় খোলা অবস্থায় মদ্যপান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জরুরি চিকিৎসকদের সংগঠনের প্রধান প্যাট্রিক পেলু জানান, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় প্যারিসে জরুরি স্বাস্থ্যসেবার অধীনে ৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে, যেখানে সাধারণত এই সংখ্যা তিন বা চারজনের বেশি হয় না।

চরম আবহাওয়ার কারণে একের পর এক বড় অনুষ্ঠানও বাতিল হচ্ছে। প্যারিস প্রাইড মিছিল, লিয়ঁ প্রাইড এবং এইচআইভি-সচেতনতা বিষয়ক জনপ্রিয় সঙ্গীত উৎসব ‘সলিডেজ’ স্থগিত করা হয়েছে। বেলজিয়ামে ঐতিহাসিক ওয়াটারলু যুদ্ধের পুনর্নির্মাণ অনুষ্ঠান এবং নেদারল্যান্ডসের জনপ্রিয় চার দিনের সঙ্গীত উৎসবও বাতিল করা হয়েছে।

এদিকে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে তাপমাত্রা আরও বাড়ার পূর্বাভাস রয়েছে। অস্ট্রিয়া, জার্মানি ও বলকান অঞ্চলের বহু জায়গায় ৩৯ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা পৌঁছতে পারে। জার্মানিতে অতিরিক্ত গরমে একটি মহাসড়কের পিচ ফেটে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তবে গ্রিস ও সাইপ্রাসে উত্তর দিকের মৌসুমি বাতাস কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে এবং সেখানে তাপমাত্রা আপাতত পশ্চিম ইউরোপের তুলনায় কিছুটা সহনীয় রয়েছে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার জলবায়ুবিষয়ক প্রধান জন কেনেডি বলেছেন, ১৯৭৬ সালের ঐতিহাসিক তাপপ্রবাহের পর থেকে ইউরোপের গড় তাপমাত্রা প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। তাঁর কথায়, জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এমন তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন, আরও দীর্ঘ সময় এবং আরও তীব্র আকারে দেখা দেবে।