মৃত্যুপুরী নেপাল: স্বজন হারানোর কান্না উপত্যকায়

যা জানা জরুরি
- "ওরা সবাই মারা গেল, আর আমি বেঁচে গেলাম"—কথাগুলি বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন দাওয়া লামা।
- বুধবার সকাল ৯টার কিছু আগে তিনি পাহাড় ভাঙার মতো প্রচণ্ড শব্দ শুনেছিলেন।
- মুহূর্তের মধ্যে জল, বরফ, পাথর ও কাদার এক দানবীয় স্রোত নেমে আসে নেপাল–তিব্বত সীমান্তবর্তী উপত্যকায়।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
“ওরা সবাই মারা গেল, আর আমি বেঁচে গেলাম”—কথাগুলি বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন দাওয়া লামা। বুধবার সকাল ৯টার কিছু আগে তিনি পাহাড় ভাঙার মতো প্রচণ্ড শব্দ শুনেছিলেন। মুহূর্তের মধ্যে জল, বরফ, পাথর ও কাদার এক দানবীয় স্রোত নেমে আসে নেপাল–তিব্বত সীমান্তবর্তী উপত্যকায়। চোখের সামনে ভেসে যায় বাড়িঘর, হোটেল, গাড়ি এবং পরিচিত মানুষজন। কীভাবে তিনি প্রাণে রক্ষা পেলেন, এখনও বুঝে উঠতে পারছেন না দাওয়া।
নেপালের রসুয়া ও নুয়াকোট জেলায় বিপর্যয়ের ব্যাপ্তি এতটাই যে বেঁচে যাওয়া মানুষেরা শোক প্রকাশের ভাষাও হারিয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁদের অনেকেরই একমাত্র প্রশ্ন—পরিবারের অন্য সদস্যরা কোথায়? কেউ হাসপাতালে আত্মীয়ের ছবি নিয়ে ঘুরছেন, কেউ নদীর তীরে অপেক্ষা করছেন কোনও দেহ উদ্ধারের আশায়। আবার বহু পরিবার জানেই না, নিখোঁজ স্বজন বেঁচে আছেন, না কাদা-পাথরের নিচে চাপা পড়েছেন।
বন্যায় বেত্রাবতী থেকে রসুয়াগড়ি পর্যন্ত প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক নিশ্চিহ্ন অথবা গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেসে গিয়েছে অন্তত ১৯টি যান চলাচলযোগ্য সেতু। বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, দূরভাষ ও মুঠোফোন সংযোগ বিপর্যস্ত। বহু এলাকায় যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় প্রায় আড়াই লক্ষ মানুষ কার্যত আটকে পড়েছেন। দুর্গত গ্রামগুলিতে খাদ্য, পানীয় জল ও ওষুধ পৌঁছে দেওয়াও কঠিন হয়ে উঠেছে।
বন্যার পর নদীখাত ও আশপাশের পাহাড়ে কাদার দাগ দেখে স্রোতের ভয়াবহতা অনুমান করছেন বিশেষজ্ঞরা। কোনও কোনও জায়গায় নদীর স্বাভাবিক স্তর থেকে ৬৫০ ফুটেরও বেশি উঁচু পর্যন্ত কাদা ও ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন মিলেছে। তার অর্থ, সরু উপত্যকার মধ্যে দিয়ে নামার সময় জল-পাথর-বরফের স্তম্ভ অকল্পনীয় উচ্চতায় উঠে গিয়েছিল। স্রোতের সামনে পড়া বহুতল ভবনও কয়েক সেকেন্ডে গুঁড়িয়ে যায়।
রসুয়া শুল্ক দপ্তরের কর্মী রাজু বুধাথোকি জানান, বুধবার সকাল পৌনে ৯টা নাগাদ তিনি নিজের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। আচমকা গোটা পাহাড় কেঁপে ওঠে। প্রথমে তাঁর মনে হয়েছিল ভূমিকম্প হচ্ছে। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখেন, কাছের পুলিশ ফাঁড়ির কর্মীরাও প্রাণ বাঁচাতে ছুটছেন। পোশাক বদলানো বা প্রয়োজনীয় জিনিস নেওয়ার সময় ছিল না। কাঁটাতারের বেড়া টপকাতে গিয়ে হাতে আঘাত পেলেও কোনও রকমে উঁচু জায়গায় পৌঁছে তিনি বেঁচে যান।
ভারতীয় তীর্থযাত্রী মল্লিনাথের অভিজ্ঞতাও একই রকম। কৈলাস–মানসসরোবর যাওয়ার পথে তাঁদের বাসটি বিপর্যয়স্থল থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে ছিল। সামনে ধেয়ে আসা কাদা ও জলের প্রাচীর দেখে চালক দ্রুত বাস ঘুরিয়ে উঁচু জায়গার দিকে নিয়ে যান। তাঁদের সামনের দু’টি বাস সম্পূর্ণ ভেসে যায়। মল্লিনাথের কথায়, “কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সব মুছে গেল। যেখানে আগের রাতে ছিলাম, সেই হোটেল নেই; যে অভিবাসন দপ্তরে যাওয়ার কথা ছিল, তারও কোনও চিহ্ন নেই।”
প্রাথমিক অনুসন্ধানে বিজ্ঞানীদের ধারণা, হিমালয়ের অত্যন্ত উঁচু অংশে বিপুল পরিমাণ পাথর ও বরফ ধসে পড়াই এই বিপর্যয়ের সূচনা করে। হিমবাহের একটি বড় অংশ ভেঙে কয়েক হাজার ফুট নিচে নেমে আসার সময় প্রচণ্ড তাপে বরফ গলে বিপুল জলরাশি তৈরি হয়। তার সঙ্গে পাথর ও মাটি মিশে সরু নদীখাত দিয়ে ঘণ্টায় প্রায় ৭০ কিলোমিটার বেগে নিচের জনপদের দিকে ছুটে আসে। ভূকম্পনমাপক যন্ত্রে ধসটির শক্তি ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য বলে ধরা পড়েছে।
উদ্ধারকাজে নেপালের সেনা, পুলিশ ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী নামলেও রাস্তা ও সেতু ধ্বংস হওয়ায় বহু জায়গায় কেবল হেলিকপ্টারেই পৌঁছনো সম্ভব হচ্ছে। দূরভাষ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় নিখোঁজের হিসাবেও বারবার পরিবর্তন হচ্ছে। বিদেশি পর্যটক ও কৈলাসযাত্রীদের একটি বড় অংশের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা যায়নি।
নতুন বিপদের আশঙ্কাও কাটেনি। ধসের পাথর ও কাদা নদীর প্রবাহ আটকে একাধিক অস্থায়ী হ্রদ তৈরি করেছে। সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে ফের আকস্মিক বন্যা নামতে পারে। তাই নদীতীরবর্তী অঞ্চল থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু যাঁরা বেঁচে ফিরেছেন, তাঁদের কাছে ভবিষ্যতের বিপদের চেয়েও এই মুহূর্তে বড় হয়ে উঠেছে অপরাধবোধ ও শোক—পাশের সবাই হারিয়ে গেলেন, অথচ তাঁরা রয়ে গেলেন কেন? দাওয়া লামার অসহায় কান্না এখন সেই সমগ্র বিপর্যস্ত উপত্যকারই কণ্ঠস্বর।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



