কলকাতা, ৪ জুলাই: মাত্র ৩১ দিনের মাথায় ইস্তফা দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনোনীত রাজ্য সভানেত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। ৩রা জুন দায়িত্ব পাওয়া চন্দ্রিমা শুক্রবার পদত্যাগ করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সমাজমাধ্যমে ২৬ মিনিটের লাইভ ভিডিও বার্তা নিয়ে হাজির হন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে।
লাইভে দলীয় প্রতীক হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সরাসরি মুখ খোলেন তিনি। তাঁকে বলতে শোনা যায়, প্রতীক হাতছাড়া হয়ে গেলেও তাতে বিশেষ কিছু যায় আসে না। প্রসঙ্গত তিনি মনে করিয়ে দেন, আটাশ বছর আগে দলের জন্মলগ্নে মানুষকে প্রতীক চেনানোর জন্য হাতে সময় ছিল মোটে বাহান্ন দিন। জন্ম থেকেই তৃণমূলের সাংগঠনিক কাজকর্ম ৩০বি হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের ঠিকানা থেকে পরিচালিত হয়ে আসছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সুব্রত বক্সী অসুস্থ থাকায় রাজ্য সভাপতির দায়িত্বও আপাতত নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন মমতা। পাশাপাশি রাজ্য কমিটিতে রদবদল করে মদন মিত্র ও কুণাল ঘোষকে নতুন রাজ্য সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে।
কে আসল তৃণমূল, সেই প্রশ্নের নিষ্পত্তি করতে আগামী সোমবারের মধ্যে দুই শিবিরকেই নিজেদের বক্তব্য জানাতে বলেছে নির্বাচন কমিশন। বিধায়ক ঋতব্রত ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী গোষ্ঠী ৬৫ জন বিধায়কের সমর্থনের দাবি নিয়ে দিল্লিতে কমিশনের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের সামনে হাজির হয়ে দলের নাম ও জোড়াফুল প্রতীকের অধিকার দাবি করেছে। কমিশনের এই প্রক্রিয়া অনেকাংশে সেই পথ অনুসরণ করছে, যে পথে মহারাষ্ট্রে শিবসেনা ভেঙে একনাথ শিন্ডে দল ও প্রতীক দুটোই নিজের করে নিয়েছিলেন। দলের তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, যেখানে প্রায় সাড়ে চারশো কোটি টাকা জমা আছে, আদালতের নির্দেশে সেগুলিও আপাতত ফ্রিজ করা আছে।
লাইভে দলের অভ্যন্তরীণ ‘বিদ্রোহী’দের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানান মমতা। তৃণমূলের প্রতীকে জিতে এখন দল ছাড়ার কথা বলা বিধায়ক-সাংসদদের তিনি সরাসরি ‘বেইমান’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ক্ষমতা থাকলে সরাসরি বিজেপিতে চলে যাওয়া উচিত, দল ভাঙার চেষ্টা বরদাস্ত করা হবে না।
রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধেও একাধিক অভিযোগ তোলেন তিনি। কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করে ভোট, বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া এবং গণনাকেন্দ্র প্রভাবিত করেই বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে বলে দাবি করেন তিনি। সরকার গঠনের দুই মাসের মধ্যেই রাজ্যে ‘মহাসন্ত্রাস’ শুরু হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ওয়ারেন্ট ছাড়াই তৃণমূল কর্মীদের নামে চুরি-ডাকাতির মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার করা হচ্ছে।
দলীয় কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে তালা লাগানোর অভিযোগ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন মমতা। ভাড়ার নথি দেখিয়ে তাঁর দাবি, অফিসটি ২০২৭ সাল পর্যন্ত তাঁদের নামেই ভাড়া নেওয়া ছিল। ২১শে জুলাইয়ের শহীদ দিবস সমাবেশের ওপর প্রশাসনের সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞারও সমালোচনা করে তিনি জানিয়ে দেন, প্রয়োজনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে হলেও অনুষ্ঠান হবেই।
সামাজিক প্রকল্প নিয়েও একাধিক অভিযোগ তোলেন দলনেত্রী। লক্ষ্মীর ভান্ডারের প্রায় দেড় কোটি সুবিধাভোগীর নাম বাদ পড়েছে বলে দাবি করেন তিনি, পাশাপাশি মিড-ডে মিলে ডিম সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার অভিযোগও তোলেন। হকার উচ্ছেদ, চাকরি ছাঁটাই ও বাজারদর নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
তবে গোটা বার্তার কেন্দ্রীয় সুরটা ছিল একটাই দিকে নির্দেশিত — দল ভাঙার চেষ্টা যতই হোক, প্রতীক নিয়ে আইনি লড়াই যেদিকেই গড়াক, দলের আসল শক্তি নিহিত মানুষের সমর্থনে, কাগুজে স্বীকৃতিতে নয়। অন্যদিকে বিদ্রোহী শিবির পাল্টা দাবি করছে, সাংগঠনিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাদের দিকেই রয়েছে। কে আসল তৃণমূল, তার নিষ্পত্তি এখন নির্ভর করছে সোমবারের মধ্যে জমা পড়া দুই শিবিরের বক্তব্য এবং তার ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।