রাজ্য

নেতাজিকে অপমান করলেই গ্রেফতার, অনন্ত মহারাজের মন্তব্যের পর পুলিশকে নির্দেশ শুভেন্দুর

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • আইন সকলের জন্য সমান, সাংসদ-বিধায়ক কিংবা সরকারি আধিকারিক—কাউকেই রেয়াত করা হবে না, জানালেন মুখ্যমন্ত্রী; প্রতি বিধানসভা কেন্দ্রে নেতাজির নামে সেবাকেন্দ্র চালাতে মাসে ৩০ হাজার…
  • নেতাজি সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্যকারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে গ্রেফতারের জন্য তিনি রাজ্য পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন।
  • একই সঙ্গে তাঁর ঘোষণা, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, সরকারি আধিকারিক কিংবা পুলিশকর্মী—পরিচয় যা-ই হোক, আইনের চোখে সকলেই সমান।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

আইন সকলের জন্য সমান, সাংসদ-বিধায়ক কিংবা সরকারি আধিকারিক—কাউকেই রেয়াত করা হবে না, জানালেন মুখ্যমন্ত্রী; প্রতি বিধানসভা কেন্দ্রে নেতাজির নামে সেবাকেন্দ্র চালাতে মাসে ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার ঘোষণা

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ অনন্ত মহারাজের বিতর্কিত মন্তব্যে যখন গোটা পশ্চিমবঙ্গ উত্তাল, তখন কঠোর অবস্থান নিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নেতাজি সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্যকারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে গ্রেফতারের জন্য তিনি রাজ্য পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁর ঘোষণা, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, সরকারি আধিকারিক কিংবা পুলিশকর্মী—পরিচয় যা-ই হোক, আইনের চোখে সকলেই সমান। নেতাজিকে অপমান করলে কাউকে রেয়াত করা হবে না।

নবান্নে রাজ্য পুলিশের মহানির্দেশককে পাশে নিয়ে সাংবাদিক বৈঠকে শুভেন্দু বলেন, সমাজমাধ্যমে নেতাজি সম্পর্কে কুরুচিকর মন্তব্য, বিকৃত ছবি কিংবা অবমাননাকর বক্তব্য প্রচারের একাধিক অভিযোগ সরকারের কাছে এসেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার প্রযোজ্য ধারায় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ এবং সাইবার অপরাধ দমন শাখাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আপত্তিকর লেখা বা ছবি অবিলম্বে মুছে দিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি। তবে পোস্ট মুছে ফেললেই যে শাস্তি এড়ানো যাবে, তা-ও নয়। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ করে স্বাধীনভাবে পরবর্তী পদক্ষেপ করবে পুলিশ।

সম্প্রতি বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ নগেন্দ্রনাথ রায়, যিনি অনন্ত মহারাজ নামেই বেশি পরিচিত, নেতাজিকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলে বর্ণনা করেন বলে অভিযোগ। ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামে নেতাজির ভূমিকা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। তাঁর দাবি ছিল, আজাদ হিন্দ ফৌজ প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশ বাহিনীর ভারতীয় সৈনিকদের নিয়ে গঠিত একটি দল এবং এমন একটি সেনাবাহিনী গড়ে তোলার ক্ষমতা নেতাজির ছিল না। দেশভাগ রোধ করা সম্ভব হত বলেও তিনি মন্তব্য করেন—যদি স্বাধীনতার সময় দেশের শাসনভার কোচবিহারের মহারাজার হাতে তুলে দেওয়া হত।

এই বক্তব্য সামনে আসতেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। তৃণমূল পথে নেমে প্রতিবাদ জানায়। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে নেতাজির মূর্তিতে মালা দিয়ে মন্তব্যটির বিরুদ্ধে সরব হন। বিজেপির মধ্যেও অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে। দলের একাধিক নেতা অনন্ত মহারাজের বক্তব্য সমর্থন করেননি। এমন আবহেই শুভেন্দুর গ্রেফতারির নির্দেশ রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়েছিল, তাঁর নির্দেশ কি বিজেপি সাংসদ অনন্ত মহারাজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে? শুভেন্দু কোনও ব্যক্তির নাম উচ্চারণ করেননি। তাঁর বক্তব্য, “আমি কারও নাম নিয়ে তাঁকে নায়ক বানাতে চাই না। কিন্তু আইন বিধায়ক, সাংসদ, যে কোনও দলের নেতা, সরকারি আধিকারিক এবং পুলিশকর্মী—সকলের জন্য সমান। পুলিশ ভারতীয় ন্যায় সংহিতা অনুসারেই ব্যবস্থা নেবে।”

উত্তরবঙ্গের কয়েকজন বিধায়ক—দীপক বর্মন, মালতী রাভা রায়-সহ অন্যরা—তাঁর সঙ্গে দেখা করে নেতাজির বিরুদ্ধে সমাজমাধ্যমে চলা অপপ্রচারের অভিযোগ জানিয়েছেন বলেও জানান শুভেন্দু। তাঁর ভাষায়, নেতাজি শুধু বাংলার সন্তান নন, ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নায়ক। তাঁকে নিয়ে অবমাননাকর প্রচার পশ্চিমবঙ্গ সরকার বরদাস্ত করবে না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দিল্লির কর্তব্যপথে নেতাজির মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন—তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাই বিজেপি এবং সরকারের অবস্থান।

বিতর্কের মধ্যেই রাজ্যের প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রে ‘নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সেবাকেন্দ্র’ গড়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রত্যেক বিধায়ককে নিজের নির্বাচনী এলাকায় এমন একটি জনপরিষেবা কেন্দ্র চালু করতে হবে। সেখান থেকে এলাকার বাসিন্দাদের সরকারি প্রকল্প, নথিপত্র, অভিযোগ এবং অন্যান্য নাগরিক পরিষেবা পেতে সহায়তা করা হবে। কে কোন দলকে ভোট দিয়েছেন, তা বিচার না করে সকলকে পরিষেবা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিটি সেবাকেন্দ্র পরিচালনার জন্য রাজ্য সরকার মাসে ৩০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেবে। তবে সেই অর্থ পাওয়ার ক্ষেত্রে দু’টি শর্ত বাধ্যতামূলক। কেন্দ্রটির নাম কেবলমাত্র ‘নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সেবাকেন্দ্র’ রাখতে হবে এবং সেখানে ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত নেতাজির একটি নির্দিষ্ট প্রতিকৃতি prominently রাখতে হবে। প্রতিকৃতিটি সরবরাহ করবে রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর।

শুভেন্দু জানিয়েছেন, রাজ্যে ইতিমধ্যেই একশোর বেশি বিধায়ক সেবাকেন্দ্র চালু করেছেন। নতুন ব্যবস্থায় সেগুলিকেও নির্ধারিত নাম ও কাঠামোর আওতায় আনা হবে। যে কেন্দ্র নিয়মিত কাজ করবে না বা নির্ধারিত শর্ত মানবে না, সেটি সরকারি অর্থ পাবে না। অগস্ট মাস থেকেই অর্থ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা করতে অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত পরবর্তী বিধানসভা অধিবেশনে সংশোধনী বিল আনবেন।

অনন্ত মহারাজ বিজেপির সমর্থনে ২০২৩ সালে রাজ্যসভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। রাজবংশী সমাজে প্রভাবশালী এই নেতা একসময় উত্তরবঙ্গে বিজেপির গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী ছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বেড়েছে। সেই টানাপড়েনের মধ্যেই নেতাজি সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য বিজেপিকে প্রবল অস্বস্তিতে ফেলেছে। শুভেন্দুর কঠোর নির্দেশে এখন মূল প্রশ্ন—আইনের সমান প্রয়োগের ঘোষণা অনুসারে পুলিশ বিজেপি সাংসদের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ করে কি না।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

নির্ণয় চট্টোপাধ্যায়

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles