পশ্চিমবঙ্গের গুন্ডাদমন বিল নিয়ে গত কয়েক দিনের বিতর্কে শুক্রবার রাতে যে নতুন মোড় এল, তা রাজ্য প্রশাসনের যোগাযোগ-ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই প্রকট করে দিল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আচমকা সাংবাদিক বৈঠক ডেকে দাবি করলেন, বিলটি এখনও রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে পৌঁছয়ইনি, ফলে তা ফেরত পাঠানোর প্রশ্নই ওঠে না। অথচ এর ঠিক আগের দিনই একাধিক প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট সরকারি সূত্র উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছিল যে রাষ্ট্রপতি বিলটি পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠিয়েছেন, তার একটি নির্দিষ্ট ধারার সঙ্গে কেন্দ্রীয় মাদক-নিয়ন্ত্রণ আইনের সংঘাত থাকার কারণে।

এই দুই বয়ানের মধ্যে ফারাকটা নিছক তথ্যগত নয়, রাজনৈতিক তাৎপর্যেরও। শুভেন্দুর ব্যাখ্যায় বিলটিকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে—সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত সংক্রান্ত অংশ নাকি ইতিমধ্যেই কার্যকর, আর বাকি অংশ এখনও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পর্যায়ে আটকে, রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর আগেই। এই কৌশল লক্ষ করার মতো। কারণ যদি বিলটি সত্যিই রাষ্ট্রপতির টেবিল পর্যন্ত না পৌঁছে থাকে, তা হলে প্রশ্ন ওঠে, রাজ্য সরকার নিজেই বিধানসভায় পাশ হওয়া একটি বিলের অগ্রগতি নিয়ে কেন এত দিন জনসমক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি, এবং কেন্দ্রীয় স্তরে আটকে থাকা ফাইল নিয়ে কেন খবর সামনে আসার পরই তড়িঘড়ি সাফাই দিতে হল।

আসল সমস্যা অন্যত্র। কলকাতা হাইকোর্টে বিলটির বৈধতা নিয়ে ইতিমধ্যেই মামলা চলছে, এবং আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ছাড়া এটি সম্পূর্ণ আইনে পরিণত হয়নি। এই পরিপ্রেক্ষিতে, বিলটি ঠিক কোন পর্যায়ে আটকে আছে তা নিয়ে সরকারের তরফে অস্পষ্টতা বজায় রাখাটা কাকতালীয় বলে মনে হয় না। বরং এটি একটি সচেতন রাজনৈতিক কৌশলের অংশ বলেই ধরে নেওয়া যুক্তিযুক্ত। বিলটি আটকে গেলে বিরোধী শিবির, বিশেষত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূল কংগ্রেস, একে সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরবে, এই আশঙ্কা থেকেই হয়তো “ফেরত পাঠানো হয়নি” বলে দাবি করে বিষয়টিকে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক বিলম্ব হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে।

তবে বাস্তবতা হল, একই সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর মুখের কথা এবং সরকারি সূত্র-নির্ভর একাধিক প্রতিবেদনের মধ্যে এমন সরাসরি বৈপরীত্য থাকাটাই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তোলে। যদি এই তথ্য সত্যিই ভুয়ো হয়, তা হলে রাষ্ট্রপতি ভবন বা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে আনুষ্ঠানিক খণ্ডন আসা উচিত ছিল, শুধু মুখ্যমন্ত্রীর মৌখিক দাবিতে বিতর্ক মেটে না। আর যদি সেই তথ্য সঠিক হয়, তা হলে শুভেন্দুর এই সাংবাদিক বৈঠক আসলে একটি রাজনৈতিক ড্যামেজ-কন্ট্রোলের প্রয়াস, যার লক্ষ্য নির্বাচনী মরসুমের মুখে “গুন্ডাদমন” প্রকল্পের ব্যর্থতার তকমা এড়ানো। এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন একটাই—রাজভবন বা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ না খোলা পর্যন্ত সরকারি বয়ানের চেয়ে সূত্র-নির্ভর প্রতিবেদনগুলিকেই বেশি বিশ্বাসযোগ্য ধরে নেওয়ার সঙ্গত কারণ থেকে যাচ্ছে।