পশ্চিমবঙ্গে জইশ-ই-মহম্মদ (জেইএম)-ঘনিষ্ঠ সন্দেহভাজন গুপ্তচরচক্রের তদন্তে আরও এক গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পেল রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)। তদন্তকারীরা তৃতীয় সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করার পর গোটা নেটওয়ার্কের বিস্তার, তাদের যোগাযোগব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য নাশকতার পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নিরাপত্তাও পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে।
এসটিএফের দাবি, ধৃত ব্যক্তি জেইএম-ঘনিষ্ঠ একটি গুপ্ত যোগাযোগচক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং তার মাধ্যমে সংবেদনশীল তথ্য আদানপ্রদান করা হতো। তদন্তে উঠে এসেছে, এই নেটওয়ার্কের সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ এবং একাধিক ভুয়ো পরিচয় ব্যবহার করে যোগাযোগ রক্ষা করত। ধৃতের কাছ থেকে মোবাইল ফোন, ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার এবং কিছু নথি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। সেগুলি খতিয়ে দেখছেন সাইবার ও ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা।
এর আগে এই মামলায় দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তদন্তকারীদের দাবি, ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ থেকেই তৃতীয় অভিযুক্তের পরিচয় ও অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র মিলেছিল। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। এখন তিনজনকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করে নেটওয়ার্কের প্রকৃত বিস্তার এবং অন্য কোনও সহযোগী এখনও সক্রিয় রয়েছে কি না, তা জানার চেষ্টা চলছে।
এসটিএফের এক শীর্ষকর্তার বক্তব্য, তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকা, আন্তঃরাজ্য যোগাযোগ এবং বিদেশে বসে পরিচালিত হ্যান্ডলারদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলির সঙ্গেও তথ্য আদানপ্রদান চলছে।
তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে ঘিরে সম্ভাব্য নিরাপত্তা-ঝুঁকির বিষয়টি। গোয়েন্দা সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে, নেটওয়ার্কের কিছু সদস্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং কৌশলগত স্থাপনা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছিল। সেই কারণেই মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। তাঁর সফরসূচি, জনসভা, রোড শো এবং প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে নিরাপত্তার স্তর আরও বাড়ানো হতে পারে।
রাজ্য প্রশাসনের এক কর্তা জানিয়েছেন, এটি কোনও নির্দিষ্ট হামলার আশঙ্কার ভিত্তিতে নয়, বরং তদন্তে উঠে আসা তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে নেওয়া একটি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ। ভিভিআইপি নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্ত প্রোটোকল নতুন করে পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করা হবে।
তদন্তকারীরা আরও খতিয়ে দেখছেন, ধৃতদের উদ্দেশ্য কেবল তথ্য সংগ্রহে সীমাবদ্ধ ছিল, নাকি তারা ভবিষ্যতে নাশকতার কোনও পরিকল্পনাও করছিল। বাজেয়াপ্ত ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করে বিদেশি যোগাযোগ, অর্থ লেনদেন, অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য এবং সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর সন্ধান মিলতে পারে বলে আশা করছেন তদন্তকারীরা।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে জঙ্গি সংগঠনগুলি সরাসরি হামলার পাশাপাশি গুপ্তচরবৃত্তি, ডিজিটাল নজরদারি এবং তথ্য সংগ্রহের উপরও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই এই ধরনের নেটওয়ার্ক দ্রুত চিহ্নিত করে ভেঙে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে স্থানীয় সহযোগী তৈরি করে সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের প্রবণতা সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বেড়েছে।
এসটিএফ সূত্রে খবর, ধৃতদের আর্থিক লেনদেন, কল রেকর্ড, ভ্রমণের ইতিহাস এবং বিদেশি যোগাযোগও বিশদে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)-সহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় সংস্থার সহযোগিতাও নেওয়া হতে পারে। তদন্তের অগ্রগতির উপর নির্ভর করেই পরবর্তী গ্রেফতার বা অভিযানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রাজ্যের নিরাপত্তা মহলের মতে, এই গ্রেফতার শুধু একটি বিচ্ছিন্ন সাফল্য নয়, বরং একটি বৃহত্তর গুপ্তচরচক্রের পর্দাফাঁসের সূচনা হতে পারে। তাই তদন্তকারীরা কোনও সম্ভাবনাকেই উড়িয়ে দিচ্ছেন না। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, সরকারি স্থাপনা এবং সংবেদনশীল অবকাঠামোর নিরাপত্তা আরও জোরদার করার দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।