হাইলাইটস:

  • লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা শিবসেনা (ইউবিটি)-র ছয় বিদ্রোহী সাংসদের একনাথ শিন্ডে নেতৃত্বাধীন শিবসেনায় যোগদান অনুমোদন করেছেন।
  • এর ফলে লোকসভায় শিন্ডে শিবসেনার সাংসদ সংখ্যা বেড়ে ১৩-তে পৌঁছেছে, যা এনডিএ-র দ্বিতীয় বৃহত্তম শরিকের মর্যাদা দিয়েছে।
  • এবার স্পিকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে তৃণমূলের ২০ বিদ্রোহী সাংসদের এনসিপিআই-এ (NCPI) একীভূত হওয়ার আবেদন।
  • বিরোধীদের অভিযোগ, সাংবিধানিক সংশোধনী বিল পাসের জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন জোগাড় করতেই বিজেপির এই কৌশল।

বাংলাস্ফিয়ার: লোকসভার বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হওয়ার মাত্র দু’দিন আগে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিলেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। শনিবার তিনি শিবসেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে)-র ছয় বিদ্রোহী সাংসদের একনাথ শিন্ডে নেতৃত্বাধীন শিবসেনায় একীভূত হওয়ার আবেদন অনুমোদন করেন। এর ফলে লোকসভায় শিন্ডে শিবসেনার সাংসদ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ১৩।

লোকসভা সচিবালয় শনিবার ১৮তম লোকসভার সংশোধিত দলীয় অবস্থানের তালিকা প্রকাশ করে। সেখানে জানানো হয়েছে, শিবসেনা (ইউবিটি)-র ছয় সদস্যের দলীয় পরিচয় পরিবর্তনের পর এই নতুন অবস্থান কার্যকর হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, কেন্দ্রের বিজেপি সরকার সংবিধানের ১৩১তম সংশোধনী বিল—যার মাধ্যমে নারী সংরক্ষণ আইন কার্যকর করার পাশাপাশি লোকসভা আসন পুনর্বিন্যাস (ডিলিমিটেশন) বিল আনার পরিকল্পনা রয়েছে—পাস করাতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

স্পিকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে শিন্ডে শিবসেনা এখন এনডিএ-র দ্বিতীয় বৃহত্তম শরিক। তাদের ১৩ জন সাংসদ রয়েছে, যা জনতা দল (ইউনাইটেড)-এর ১২ জনের চেয়ে বেশি এবং তেলুগু দেশম পার্টির (টিডিপি) ১৬ জনের থেকে মাত্র তিন কম। লোকসভায় দলগত শক্তির বিচারে শিন্ডে শিবসেনা এখন সপ্তম বৃহত্তম দল।

অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের ২০ বিদ্রোহী সাংসদের ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়া (এনসিপিআই)-তে একীভূত হওয়ার আবেদন এখনও স্পিকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। শনিবার প্রকাশিত দলীয় তালিকায় তৃণমূলের সাংসদ সংখ্যা এখনও ২৮ দেখানো হয়েছে এবং লোকসভায় দলের নেতা হিসেবে রয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও বিদ্রোহী সাংসদদের মূল দলের থেকে আলাদা আসনে বসার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সূত্রের খবর, এ বিষয়ে স্পিকার রবিবার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু রবিবারের সর্বদলীয় বৈঠকে তৃণমূলের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এই পদক্ষেপ ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।

তৃণমূলের রাজ্যসভা সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন সমাজমাধ্যমে অভিযোগ করেন, স্পিকার এখনও ওই ২০ জনকে তৃণমূল সাংসদ হিসেবেই দেখাচ্ছেন, অথচ কিছুক্ষণের মধ্যেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তাঁদের এনসিপিআই প্রতিনিধি হিসেবে সর্বদলীয় বৈঠকে ডাকছেন। তাঁর কথায়, এটি গণতন্ত্রকে উপহাস করার সামিল।

যদি স্পিকার তৃণমূলের বিদ্রোহী ২০ সাংসদের একীভূত হওয়ার আবেদন অনুমোদন করেন, তবে লোকসভায় তৃণমূলের সাংসদ সংখ্যা কমে ৮-এ নেমে আসবে। সে ক্ষেত্রে দলটি চতুর্থ বৃহত্তম দলের মর্যাদা হারিয়ে নবম স্থানে চলে যাবে এবং শরদ পাওয়ার নেতৃত্বাধীন এনসিপি (এসপি)-র সমান আসনে নেমে আসবে।

এপ্রিল মাসে বিভিন্ন দলে ভাঙনের আগে লোকসভায় বিজেপির সাংসদ ছিল ২৪০। টিডিপির ১৬, জেডিইউ-এর ১২, শিন্ডে শিবসেনার ৭ এবং এলজেপির ৫ জন সাংসদ ছিল। ছোট শরিকদের নিয়ে এনডিএ-র মোট শক্তি ছিল ২৯৯।

তৃণমূলের বিদ্রোহী ২০ সাংসদ যদি আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপিআই-এ যোগ দিয়ে এনডিএ-কে সমর্থন করেন, তবে জোটের শক্তি বেড়ে হবে ৩১৯। এরপর যদি শরদ পাওয়ারের এনসিপি (এসপি)-ও সরকারকে সমর্থন করে, তাহলে এনডিএ-র সংখ্যা দাঁড়াবে ৩২৭। যদিও সাংবিধানিক সংশোধনী বিল পাস করাতে প্রয়োজনীয় ৩৬০ আসনের তুলনায় তা এখনও ৩৩ কম।

অন্যদিকে, এপ্রিল মাসে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-র শক্তি ছিল ২২৫। তৃণমূল এবং শিবসেনা (ইউবিটি)-তে ভাঙনের পরে সেই সংখ্যা অন্তত ২৬ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি ডিএমকের অবস্থান নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

এপ্রিল মাসের বিশেষ অধিবেশনে কেন্দ্র সরকার নারী সংরক্ষণ ও ডিলিমিটেশন সংক্রান্ত সংবিধান (১৩১তম সংশোধনী) বিল পাস করানোর চেষ্টা করেছিল। তখন ৫৪০ সদস্যের মধ্যে ৫২৮ জন ভোটে অংশ নেন। পক্ষে ভোট পড়েছিল ২৯৮, বিপক্ষে ২৩০। ১১ জন অনুপস্থিত ছিলেন। ফলে সরকার প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন (তৎকালীন হিসাবে ৩৫২ ভোট) অর্জন করতে পারেনি।

স্পিকারের সিদ্ধান্তের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে বলেন, উদ্ধব ঠাকরের দলের ছয় সাংসদ ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, নিজেদের নির্বাচনী এলাকার উন্নয়নের স্বার্থেই তাঁর দলে যোগ দিয়েছেন।

তাঁর দাবি, অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে তাঁদের দলে আনা হয়েছে—এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বরং উদ্ধব ঠাকরের উচিত আত্মসমালোচনা করা যে কেন একের পর এক নেতা তাঁর দল ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।

শিন্ডে বলেন, “এই সাংসদরা তাঁদের এলাকার মানুষের উন্নয়নের জন্য আমাদের সঙ্গে এসেছেন। তাঁদের এলাকায় উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল ও সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করা হবে। ইতিমধ্যেই তাঁদের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে বৈঠকের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

তিনি উদ্ধব ঠাকরের সাম্প্রতিক হিন্দুত্ব প্রচার নিয়েও কটাক্ষ করেন। শিন্ডের বক্তব্য, “হিন্দুত্ব কোনও টি-শার্ট নয়, যা ইচ্ছেমতো পরা বা খোলা যায়। ২০১৯ সালে ক্ষমতার লোভে কংগ্রেস ও এনসিপির সঙ্গে জোট করে তাঁরাই বালাসাহেব ঠাকরের আদর্শ ছেড়ে দিয়েছিলেন। এখন নিজেদের দল বিপাকে পড়ায় হঠাৎ রামের কথা মনে পড়েছে।”