Home খবর বৃষ্টি ছাড়া রজ উৎসব: ‘সুপার’ এল নিনোর আশঙ্কায় দেরিতে বর্ষা, অনিশ্চয়তায় ওডিশার কৃষকরা

বৃষ্টি ছাড়া রজ উৎসব: ‘সুপার’ এল নিনোর আশঙ্কায় দেরিতে বর্ষা, অনিশ্চয়তায় ওডিশার কৃষকরা

Authored By নির্ণয় চট্টোপাধ্যায়
12 views 4 minutes read
A+A-
Reset

ওডিশার কৃষিনির্ভর সমাজে বর্ষার আগমনকে স্বাগত জানাতে প্রতি বছর ধুমধাম করে পালিত হয় রজ উৎসব। নারী, উর্বরতা এবং পৃথিবীর দেবী বসুমতীর আরাধনায় এই তিন দিনের উৎসব সাধারণত ১৪ থেকে ১৬ জুন অনুষ্ঠিত হয়। এই সময়েই শুরু হয় ধান বোনার প্রস্তুতি। কিন্তু এ বছর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আকাশে মেঘ ছিল না, মাঠে ছিল না বৃষ্টির দেখা। ফলে উৎসবের পরেও কৃষকেরা বীজ বুনতে পারেননি।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, পূর্ব ওডিশার গঞ্জাম জেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের কৃষক পরিবারগুলি এবার দেরিতে বর্ষা এবং সম্ভাব্য ‘সুপার’ এল নিনো-র আশঙ্কায় গভীর উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছে। আন্তর্জাতিক আবহাওয়াবিদরা ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, এ বছর শক্তিশালী বা ‘সুপার’ এল নিনো তৈরি হয়েছে এবং জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে তার প্রভাব আরও বাড়তে পারে।

লক্ষ্মীপুরের কৃষাণী কস্তুরি গামাঙ্গ ও প্রমিলা সাবর জানান, রজ উৎসবের সবচেয়ে বড় আনন্দ হলো তিন দিন কোনও কাজ করতে হয় না। এই সময় রান্না-বান্না ও ঘরের কাজ সামলান তাঁদের স্বামীরাই। কিন্তু এ বছরের উৎসবের আনন্দের আড়ালে ছিল গভীর উৎকণ্ঠা। কারণ বর্ষা না আসায় জমি পড়ে ছিল অনাবাদি।

ভারতে এল নিনো সাধারণত দুর্বল মৌসুমি বায়ু, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘ শুষ্ক সময়, অতিরিক্ত গরম এবং কৃষিক্ষেত্রে খরার সঙ্গে জড়িত। এর ফলে জলাধারে জল কমে যায়, সেচের সমস্যা তৈরি হয় এবং কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

চলতি বছরের জুন মাসে ওডিশায় স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। পরে কিছু অতিরিক্ত বৃষ্টি হলেও খরার প্রভাব কাটেনি। গত ৫০ বছরে রাজ্যটি অন্তত ১৯ বার খরার মুখোমুখি হয়েছে।

বৃষ্টির কোনও নিশ্চয়তা না থাকলেও জুনের শেষ দিকে অনেক কৃষক শেষ ভরসা হিসেবে ধানের বীজ বুনেছেন। তাঁদের আশা ছিল, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বৃষ্টি হবে এবং বীজ অঙ্কুরিত হবে।

৪৫ বছর বয়সি কৃষক মঙ্গল সাবর স্মরণ করেন ২০২৩-২৪ সালের এল নিনোর সময়কার দুর্ভোগ। তাঁর কথায়, সেই দুই বছর ধানের চারা রোপণের চেষ্টা দু’বার করেও ব্যর্থ হতে হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত পুরো ফসল নষ্ট হয়ে যায়।

২৪ বছরের সঞ্জিত মণ্ডল জানান, টানা ফসলহানির ফলে তাঁদের পরিবারকে ৩০ হাজার টাকা উচ্চ সুদে মহাজনের কাছ থেকে ধার নিতে হয়েছিল। তাঁর দাবি, গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারই কোনও না কোনও ঋণের বোঝা বহন করছে।

দিল্লিভিত্তিক গবেষণা সংস্থা কাউন্সিল অন এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ওয়াটার (সিইইডব্লিউ)-এর জলসম্পদ বিশেষজ্ঞ নীতিন বসি বলেন, এল নিনোর সময় সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কম বৃষ্টি ও মাটিতে আর্দ্রতার অভাব। বর্ষার আগে দীর্ঘ গরমে মাটি অত্যন্ত শুকিয়ে যায়। পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে জলাধার, পুকুর ও প্রাকৃতিক জলাশয়ে জল জমে না। ফলে শুধু খরিফ নয়, শীতকালীন ফসলও ক্ষতির মুখে পড়ে।

সিইইডব্লিউ-এর ২০২৪ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত এক দশকে ওডিশায় মৌসুমি বায়ুর আগমন প্রায়শই এক সপ্তাহ পর্যন্ত দেরি হয়েছে। একই সঙ্গে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের শীতকালীন বৃষ্টিপাত বেড়েছে। এছাড়া রাজ্যের প্রায় অর্ধেক চাষের জমি এখনও সম্পূর্ণ বৃষ্টিনির্ভর, যেখানে সেচের কোনও নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা নেই।

মঙ্গল সাবর জানান, পরিবারের ভরণপোষণের জন্য তিনি নির্মাণশ্রমিক হিসেবে দিনমজুরির কাজ করেন। নিজের জমিতে ধান ফলাতে পারলে অন্তত সারা বছরের চাল কেনার খরচ বাঁচে। কিন্তু ফসল না হলে সেই ঘাটতি পূরণ করতে তাঁকে আরও বেশি পরিশ্রম করতে হয়। অথচ মাসে গড়ে মাত্র ১৫ দিনের মতো কাজ জোটে, সেটিও অনিশ্চিত।

রুশিকুল্যা নদীর তীরবর্তী মালি জগন্নাথপুর গ্রামের কৃষকেরাও একই সমস্যায় ভুগছেন। তাঁরা অপেক্ষা করছেন কাছের জলাধার থেকে সেচের খালে জল ছাড়া হবে কবে। কারণ পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে জলাধারেও জল জমে না।

২৮ বছরের বিধবা কৃষাণী কে সুকুমারী স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর জমিতে চাষ করতে চাইলেও জলের অভাবে ধান ফলাতে পারছেন না। তাঁর কথায়, পাঁচ বছর আগেও নলকূপে জল ছিল এবং বৃষ্টিও সময়মতো হতো। এখন নলকূপ শুকিয়ে গেছে, বর্ষাও অনিয়মিত। দুই সন্তানকে নিয়ে সংসার চালাতে তাঁকে বছরের একটি বড় অংশ ইটভাটায় কাজ করতে হয় এবং চাষের মরসুমে অন্যের জমিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে হয়।

ওডিশার বহু গ্রামের মতো এখানেও অধিকাংশ পরিবারের আয় আসে দিনমজুরি, ভাগচাষ, বাইরে কাজ করতে যাওয়া সদস্যদের পাঠানো অর্থ এবং সামান্য ধানচাষের উপর নির্ভর করে।

জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ এবং আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেল (আইপিসিসি)-এর অন্যতম প্রধান লেখক চাঁদনি সিং বলেন, খরা ওডিশার কৃষকদের কাছে নতুন কোনও বিপর্যয় নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এর প্রকৃতি ও তীব্রতা বদলে যাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে কৃষকদের জন্য আরও শক্তিশালী অভিযোজন ব্যবস্থা, উন্নত সেচব্যবস্থা এবং জল সংরক্ষণের উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles