Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতার সবচেয়ে বড় সম্পদ কী? এই প্রশ্ন করলে অনেকেই বলবেন সংস্কৃতি, ইতিহাস, সাহিত্য বা দুর্গাপুজোর কথা। কিন্তু নগর পরিকল্পনাবিদদের একাংশ ভিন্ন উত্তর দেন। তাঁদের মতে, কলকাতার সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে কম ব্যবহৃত সম্পদ হল হুগলি নদী।
প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ হাওড়া ও কলকাতার মধ্যে যাতায়াত করেন। রাস্তা ভরে যায় বাস, ট্যাক্সি, গাড়ি ও মোটরবাইকে। মেট্রো রেলের উপর চাপ বাড়তে থাকে। নতুন সেতু তৈরি হয়, নতুন রাস্তা হয়, কিন্তু যানজট কমে না। অথচ এই বিশাল জনপদের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে এক প্রশস্ত নদী, যার পরিবহণ সম্ভাবনার সামান্য অংশই আজ ব্যবহৃত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতেই উঠে আসছে ‘ওয়াটার মেট্রো’-র ধারণা।
ওয়াটার মেট্রো আসলে কী
নামে মেট্রো থাকলেও এটি রেলের উপর নয়, চলে জলের উপর। ভাবুন, দক্ষিণেশ্বর থেকে বাবুঘাট যাবেন। ঘাটে এসে একটি আধুনিক টার্মিনালে ঢুকলেন। মেট্রোর মতোই টিকিট কেটে নির্দিষ্ট সময়ে একটি বৈদ্যুতিক জলযানে উঠলেন। মাঝপথে কয়েকটি জেটিতে থামল, তারপর পৌঁছে গেলেন গন্তব্যে। পুরো ব্যবস্থাটি যদি মেট্রো, বাস ও অন্যান্য পরিবহণের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, তাহলেই সেটি হয় ওয়াটার মেট্রো। অর্থাৎ এটি সাধারণ লঞ্চ পরিষেবা নয়, একটি পরিকল্পিত, সময়নিষ্ঠ এবং সমন্বিত গণপরিবহণ ব্যবস্থা।
কলকাতার জন্য কেন জরুরি
কলকাতার সমস্যা জায়গার অভাব, নদীর নয়। নতুন রাস্তায় জমি লাগে, নতুন মেট্রো করিডরে হাজার হাজার কোটি টাকা লাগে, উড়ালপুলে দীর্ঘ সময় লাগে। কিন্তু নদী তো আগে থেকেই আছে। শহরের মাঝখানে একটি বিশাল প্রাকৃতিক পরিবহণ করিডর বহুদিন ধরে অপেক্ষা করছে।
যানজট কমানোর নতুন পথ
প্রতিদিন সকালে হাওড়া ব্রিজ বা বিদ্যাসাগর সেতুর পরিস্থিতিই বলে দেয় সমস্যার গভীরতা। যত নতুন রাস্তা তৈরি হচ্ছে, গাড়ির সংখ্যাও তত বাড়ছে। ফলে রাস্তা সম্প্রসারণ একা কোনো সমাধান নয়। বিশ্বের বহু শহর এই কারণেই জলপথকে গণপরিবহণের অংশ করেছে। লন্ডনে টেমস, ইস্তানবুলে বসফরাস, সিডনিতে হারবার ফেরি কিংবা ব্যাংককের খালপথ — সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে জলপথে যাত্রী পরিবহণে সড়কের চাপ কমেছে। কলকাতায়ও প্রতিদিন কয়েক হাজার বা কয়েক লক্ষ মানুষ নদীপথে যাতায়াত শুরু করলে রাস্তার উপর চাপ অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
হাওড়া-কলকাতার সম্পর্ক বদলে যেতে পারে
কলকাতা আসলে একা একটি শহর নয়। হাওড়া, বালি, উত্তরপাড়া, কোন্নগর, শ্রীরামপুর, চন্দননগর, বজবজ মিলিয়ে এটি একটি বৃহৎ মহানগর অঞ্চল। সমস্যা হল, এই অঞ্চলগুলির মধ্যে যাতায়াতের বেশিরভাগটাই রাস্তা বা রেলনির্ভর। দ্রুতগতির জলযান নিয়মিত চলাচল শুরু করলে নদী আর বাধা থাকবে না, বরং হয়ে উঠবে সংযোগের প্রধান মাধ্যম। আজ যিনি উত্তরপাড়া থেকে কলকাতায় ট্রেন বা রাস্তার উপর নির্ভর করে আসেন, তিনি ভবিষ্যতে নদীপথকেই বেশি সুবিধাজনক মনে করতে পারেন।
মেট্রোর পরিপূরক, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়
ওয়াটার মেট্রোকে অনেকে মেট্রো রেলের বিকল্প ভাবেন, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন ধারণাটি ঠিক নয়। এটি মেট্রোর প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহযোগী। কেউ দক্ষিণেশ্বর থেকে জলপথে বাবুঘাট এলে সেখান থেকে সহজেই মেট্রো ধরে নিউটাউন বা গড়িয়ায় যেতে পারবেন। আধুনিক নগর পরিবহণে একে বলা হয় মাল্টি-মোডাল ইন্টিগ্রেশন, যে পথে এগিয়েছে বিশ্বের প্রায় সব সফল শহর।
পর্যটনেরও নতুন দিগন্ত
কলকাতার ইতিহাসের বড় অংশই নদীকে ঘিরে। বাবুঘাট, প্রিন্সেপ ঘাট, আর্মেনিয়ান ঘাট, আউটরাম ঘাট, দক্ষিণেশ্বর — প্রতিটি জায়গার সঙ্গেই জড়িয়ে ইতিহাস ও স্মৃতি। রাতের আলোয় আলোকিত নদীতীর, ঐতিহাসিক স্থাপত্য আর আধুনিক জলযান মিলিয়ে তৈরি হতে পারে এক নতুন পর্যটন অভিজ্ঞতা। শুধু যাত্রী পরিবহণ নয়, ঘাটের আশেপাশে গড়ে উঠতে পারে নতুন বাণিজ্যিক কেন্দ্র, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে ও পর্যটন পরিষেবা।
চ্যালেঞ্জও কম নয়
তবে বাস্তবায়নের পথে বাধাও রয়েছে একাধিক। হুগলি নদীর সবচেয়ে বড় সমস্যা পলি জমা। নদীর গভীরতা বজায় রাখতে নিয়মিত ড্রেজিং দরকার, যা ব্যয়সাপেক্ষ ও প্রযুক্তিগতভাবে জটিল। তার উপর রয়েছে জোয়ার-ভাটার প্রভাব। অনেক ঘাটের অবকাঠামো পুরনো, সেগুলি আধুনিক করতে হবে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল লাস্ট-মাইল সংযোগ — নদীপথে নেমে যদি মানুষ গন্তব্যে পৌঁছতে না পারেন, তাহলে পুরো ব্যবস্থাই ব্যর্থ হবে। ঘাট থেকে বাস, মেট্রো বা অটোর সংযোগ নিশ্চিত করাটাই হবে সবচেয়ে কঠিন কাজ।
ভবিষ্যতের কলকাতা কি নদীর দিকে ফিরবে
একসময় কলকাতার জীবন নদীকেন্দ্রিক ছিল। বাণিজ্য, যাতায়াত, যোগাযোগ — সবকিছুর কেন্দ্রেই ছিল গঙ্গা। পরে শহর নদী থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, রাস্তা ও রেল হয়ে ওঠে উন্নয়নের প্রতীক। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর নগর পরিকল্পনা আবার নদীর গুরুত্ব নতুন করে বুঝতে শুরু করেছে। কোচি সেই পথ দেখিয়েছে। সঠিক পরিকল্পনায় জলপথ যে শহুরে পরিবহণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে, তা প্রমাণ করেছে কেরলের এই শহর।
ওয়াটার মেট্রো তাই শুধু একটি পরিবহণ প্রকল্প নয়, এটি শহরকে নতুন করে ভাবার একটি প্রচেষ্টা। প্রশ্নটা শুধু এই নয় যে নদীতে আরও কিছু নৌকা চলবে কি না। প্রশ্নটা হল, কলকাতা কি তার সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক সম্পদকে আবার নিজের জীবনের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে পারবে? যদি পারে, তাহলে আগামী দশকে শহরের পরিবহণ মানচিত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়তো রাস্তার উপর নয়, গঙ্গার বুকেই দেখা যাবে।