হাইলাইটস:

  • টুর্নামেন্টজুড়ে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দল হিসেবে ফাইনালে উঠেছে স্পেন, অন্যদিকে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখছে আর্জেন্টিনা।
  • বলের দখল, কাউন্টার-প্রেসিং ও ফুল-ব্যাকদের আক্রমণাত্মক ভূমিকা স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
  • আর্জেন্টিনার আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু এখনও মেসি; ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট নিয়ে তিনিই দলের প্রাণভোমরা।
  • তথ্যভিত্তিক পূর্বাভাসে স্পেনকে এগিয়ে রাখা হলেও, আর্জেন্টিনার শেষ মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতাই ফাইনালকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।

বাংলাস্ফিয়ার: পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল মঞ্চে এর চেয়ে আকর্ষণীয় ফাইনাল চাওয়া কঠিন।

একদিকে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন স্পেন—যাদের খেলা যেন নিখুঁত যন্ত্রের মতো। অন্যদিকে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা—যাদের নেতৃত্বে রয়েছেন ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা, ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি। বয়স বেড়েছে, কিন্তু বড় ম্যাচের ভাগ্য এখনও তাঁর বাঁ পায়েই লেখা থাকতে পারে।

পাঁচ সপ্তাহ, ৪৮ দলের বিস্তৃত আসর এবং ১০৩টি ম্যাচ শেষে এখন বাকি মাত্র দুই দল। বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণ করবে স্পেন ও আর্জেন্টিনা।

স্পেন: আধিপত্যের নতুন সংজ্ঞা

বিশ্বকাপের শুরুটা অবশ্য স্পেনের জন্য খুব সুখকর ছিল না। প্রথম ম্যাচে নবাগত কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে গোলশূন্য ড্র অনেক প্রশ্ন তুলেছিল। ৭৪ শতাংশ বলের দখল, ২৭টি শট—সবই ছিল, কিন্তু গোল ছিল না।

পরে দেখা গেল, সেটিই ছিল পুরো টুর্নামেন্টে তাদের একমাত্র হোঁচট।

সাত ম্যাচে তারা মাত্র একটি গোল হজম করেছে। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে সেই একমাত্র গোল। পুরো টুর্নামেন্টে একবারও পিছিয়ে পড়তে হয়নি লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলকে।

রদ্রির নিয়ন্ত্রণেই স্পেনের ছন্দ

স্পেনের ফুটবলের প্রাণ হলো বলের নিয়ন্ত্রণ।

অধিনায়ক রদ্রি ইতিমধ্যেই এই বিশ্বকাপে ৬৫৫টি সফল পাস সম্পন্ন করেছেন—১৯৬৬ সালের পর কোনো বিশ্বকাপে এক খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ।

তাঁর ঠিক পিছনেই রয়েছেন ১৯ বছর বয়সী সেন্টার-ব্যাক পাও কুবারসি। ৫৫০টি সফল পাসের পাশাপাশি প্রতি ম্যাচে গড়ে ২২টিরও বেশি লাইন-ভাঙা পাস খেলেছেন তিনি। এর সফলতার হার ৯৪ শতাংশ—পুরো টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ।

শুধু বল দখল নয়, বল হারিয়েও বিপজ্জনক

স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু দীর্ঘ সময় বল ধরে রাখা নয়।

বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সেটি পুনরুদ্ধার করার যে কৌশল—কাউন্টার-প্রেসিং—সেটিতে তারা বিশ্বসেরা।

ফিফার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বল ছাড়া থাকা সময়ের ১২.২ শতাংশ স্পেন কাটিয়েছে কাউন্টার-প্রেসিংয়ে, যা শেষ আটে ওঠা সব দলের মধ্যে সর্বোচ্চ।

এই বিভাগেও সবার ওপরে রদ্রি।

ফুল-ব্যাকরাই বাড়তি অস্ত্র

স্পেনের আক্রমণে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে দুই ফুল-ব্যাক মার্ক কুকুরেয়া ও পেদ্রো পোরোর ভূমিকায়।

দু’জনই শুধু প্রান্ত রক্ষা করেন না; মাঝেমধ্যে ভিতরের দিকে ঢুকে কিংবা ওভারল্যাপ করে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে দেন।

বিশেষ করে ইয়ামালের সঙ্গে পোরোর সমন্বয় অসাধারণ। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে তাঁর গোলটি এসেছে ঠিক এমনই এক মুভ থেকে।

পুরো বিশ্বকাপে পোরো ইতিমধ্যেই দুটি গোল করেছেন, যা একজন ফুল-ব্যাক হিসেবে বিরল অর্জন।

ইয়ামাল আলোচনার কেন্দ্রে, কিন্তু স্পেন কেবল একজনের দল নয়

১৯ বছরের লামিন ইয়ামাল অবশ্যই স্পেনের সবচেয়ে বড় তারকা।

হ্যামস্ট্রিং চোট থেকে ফিরে আসায় এবার তাঁর গোলসংখ্যা প্রত্যাশার তুলনায় কম। কিন্তু ড্রিবলিং, সৃজনশীলতা ও প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করার ক্ষমতা তাঁকে এখনও ম্যাচের সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র করে রেখেছে।

তবে স্পেনের আসল শক্তি দলগত বোঝাপড়া।

ইউরো ২০২৪ ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারানো দলের প্রথম একাদশের সাতজনই এবারও মূল দলে। দীর্ঘদিন ধরে একই কোচের অধীনে খেলার ফলে ক্লাব দলের মতো সমন্বয় গড়ে উঠেছে।

আর্জেন্টিনার দুর্বলতা কোথায়?

বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বড় দুর্বলতা দেখা গেছে দুই প্রান্তে রক্ষণ সামলাতে।

সাতটি গোলের মধ্যে পাঁচটিই এসেছে উইং থেকে ওঠা আক্রমণ কিংবা ক্রস সামলাতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে।

জর্ডান, মিশর ও ইংল্যান্ড—তিন দলের বিরুদ্ধেই বাম দিক দিয়ে একই ধরনের আক্রমণে গোল হজম করেছে আর্জেন্টিনা।

স্পেনের দুই প্রান্তের গতিময় ফুটবল তাই লিওনেল স্কালোনির সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।

তবু আর্জেন্টিনার সব রাস্তা গিয়ে মিশেছে মেসির কাছে

আর্জেন্টিনার আক্রমণ অনেকটাই কেন্দ্রীয় এলাকাভিত্তিক।

এনজো ফার্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, হুলিয়ান আলভারেজ—সবাই মিলে ছোট ছোট পাসে প্রতিপক্ষের রক্ষণ কেটে এগোন।

কিন্তু এই আক্রমণের হৃদস্পন্দন একজনই—লিওনেল মেসি।

পুরো বিশ্বকাপে তাঁর ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট। মোট ১২টি গোল-অবদান, যা টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ।

দলের তৈরি করা সুযোগের ৩৩ শতাংশই এসেছে তাঁর মাধ্যমে।

প্রতিপক্ষের বক্সে নেওয়া শটের ২৯ শতাংশও তাঁর।

আক্রমণাত্মক তৃতীয়াংশে দলের ১৯ শতাংশ স্পর্শও মেসির।

অর্থাৎ আর্জেন্টিনার প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আক্রমণের শেষ কিংবা শুরু—দুটোই তাঁর পায়ে।

কেন আর্জেন্টিনাকে কখনও শেষ বলে ভাবা যায় না?

স্পেনের মতো পুরো ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখার অভ্যাস নেই আর্জেন্টিনার।

বরং পিছিয়ে পড়েও ঘুরে দাঁড়ানোই তাদের বড় পরিচয়।

এই বিশ্বকাপে ১৯টি গোলের মধ্যে ১২টিই এসেছে ৭৫ মিনিটের পরে বা অতিরিক্ত সময়ে।

এর মধ্যে ৯টি গোল ম্যাচের ফল বদলে দিয়েছে—সমতা ফিরিয়েছে বা এগিয়ে দিয়েছে দলকে।

অর্থাৎ শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দেওয়া যায় না।

তথ্য কী বলছে?

ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের এক ও দুই নম্বর দল মুখোমুখি হচ্ছে এই ফাইনালে।

একদিকে বর্তমান ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন, অন্যদিকে কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা।

পরিসংখ্যানভিত্তিক পূর্বাভাসে স্পেনের জয়ের সম্ভাবনা ধরা হয়েছে ৫৯ শতাংশ। আর্জেন্টিনার ৪১ শতাংশ।

কিন্তু বিশ্বকাপ ফাইনাল কখনও কেবল সংখ্যার খেলা নয়।

একদিকে নিখুঁত দলগত ফুটবল, অন্যদিকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলারের শেষ বিশ্বমঞ্চ।

এই দ্বৈরথেই নির্ধারিত হবে ২০২৬ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।