Home SportsFIFA 2026 আজটেকার ডাক, গোটা দেশের বিশ্বাস—ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ইতিহাস গড়ার স্বপ্নে ফুটছে মেক্সিকো

আজটেকার ডাক, গোটা দেশের বিশ্বাস—ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ইতিহাস গড়ার স্বপ্নে ফুটছে মেক্সিকো

Authored By নির্ণয় চট্টোপাধ্যায়
13 views 5 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস:

  • ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে শেষ ষোলোর ম্যাচের আগে মেক্সিকো সিটি পরিণত হয়েছে এক বিশাল ফুটবল-উৎসবে।
  • জোকালো থেকে আজটেকা স্টেডিয়াম—সর্বত্র মেক্সিকোর জার্সি, পতাকা আর সমর্থকদের ঢল।
  • ইকুয়েডরকে হারিয়ে ১৯৮৬ সালের পর প্রথম নকআউট জয়ের পর দেশের মানুষের বিশ্বাস, এবার ইংল্যান্ডকেও হারানো সম্ভব।
  • আজটেকা স্টেডিয়ামের আবহকে সমর্থকেরা মনে করছেন মেক্সিকোর সবচেয়ে বড় শক্তি।
  • ব্যক্তিগত শোক, পারিবারিক পুনর্মিলন, জাতীয় আবেগ—সবকিছু মিশে বিশ্বকাপ মেক্সিকোকে এক অভূতপূর্ব ঐক্যের মুহূর্ত উপহার দিয়েছে।

মেক্সিকো সিটির প্রাণকেন্দ্র জোকালো। বিশাল এই ঐতিহাসিক চত্বরে এখন যেন ফুটবলের রাজধানী বসেছে। চারদিকে শুধু সবুজ-সাদা-লাল জার্সি, পতাকা, মুখে রং মেখে ঘুরে বেড়ানো সমর্থক আর রাস্তার ধারে সারি সারি বিক্রেতা। মেক্সিকো জাতীয় দলের জার্সির চাহিদা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এই বিশ্বকাপে অন্য সব দলের জার্সিকে বিক্রিতে অনেক পিছনে ফেলে দিয়েছে ‘এল ত্রি’। উদ্বোধনী ম্যাচের তিন সপ্তাহ পর এখন বিশ্বকাপের স্পন্দিত হৃদয় যেন মেক্সিকো সিটি নিজেই।

শহরের ব্যস্ত অ্যাভেনিদা সিনকো দে মায়ো ধরে হাঁটতে হাঁটতে ফ্রান্সিসকো দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “আমাদের বিশ্বাস, আমরা জিতব। ম্যাচটা কঠিন হবে, কিন্তু সবাই ভীষণ অনুপ্রাণিত। ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে যেমন খেলেছি, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধেও তেমন খেলতে পারলে জয় আমাদেরই হবে।”

ফ্রান্সিসকোর এই আত্মবিশ্বাসের উৎস মঙ্গলবার রাতের সেই ঐতিহাসিক জয়। ইকুয়েডরকে হারিয়ে ১৯৮৬ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয় পেয়েছে মেক্সিকো। কিংবদন্তির আজটেকা স্টেডিয়ামের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন আবেগঘন রাত খুব কমই এসেছে।

স্টেডিয়ামের ভেতরের উন্মাদনার সঙ্গে পাল্লা দিয়েছে শহরের রাস্তাও। প্রবল ঝড়ে ম্যাচ এক ঘণ্টা পিছিয়ে গেলেও প্রায় ১৪ লাখ মানুষ বিভিন্ন বড় পর্দার সামনে দাঁড়িয়ে খেলা দেখেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে যেখানে প্রায় চার লাখ মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন, সেখানে এবার সেই সংখ্যা তিন গুণেরও বেশি। তবে আনন্দের মাঝেও ঘটেছে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। অতিরিক্ত ভিড়ের চাপে চারজনের মৃত্যু হয়েছে, আহত ও আটকে পড়েছেন বহু মানুষ। ফলে ইংল্যান্ড ম্যাচের আগে নিরাপত্তা আরও জোরদার করার দাবি উঠেছে।

কিন্তু সমর্থকদের উন্মাদনায় কোনও ভাটা নেই। ইউকাতান উপদ্বীপের কুইন্তানা রু থেকে আসা প্রিন্সিপিয়া বললেন, “আমি নিজের নাম বাজি রেখে বলতে পারি, রবিবারের পরিবেশ আগের সব রেকর্ড ভেঙে দেবে। নিজের দেশের মাটিতে মেক্সিকোকে জিততে দেখা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। অসংখ্য পরিবার একসঙ্গে আনন্দ করছে, রাস্তায় নেমে উৎসব করছে। এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর কী হতে পারে?”

ইংল্যান্ড শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষ হবে নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই যেন উত্তেজনা আরও বেড়ে গেছে। কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রকে হারিয়ে ইংল্যান্ডের ম্যাচ শেষ হওয়ার সময় মেক্সিকোর টেলিভিশন ধারাভাষ্যকার একে একে হ্যারি কেনদের নাম উচ্চারণ করে যেন তাঁদের স্বাগতই জানিয়েছিলেন—“এসো, আজটেকার আগ্নেয়গিরিতে তোমাদের অপেক্ষা করছে মেক্সিকো।”

ইংল্যান্ডের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু মেক্সিকো দল নয়, আজটেকা স্টেডিয়ামের গর্জনও। বিশ্বের খুব কম স্টেডিয়ামই এমন আবহ তৈরি করতে পারে। সমর্থক চার্লসের কথায়, “আজটেকায় খেলা মানেই অন্যরকম শক্তি। এই স্টেডিয়ামে এক ধরনের জাদু আছে। এখানে নামলেই মনে হয় ভাগ্যও আমাদের পাশে দাঁড়ায়।”

তাঁর সঙ্গী অ্যাঞ্জি যোগ করেন, “খেলা আমরা কোথায় দেখব, এখনও ঠিক করিনি। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত—ম্যাচের দিন সব মেক্সিকান যেন এক পরিবারের সদস্য হয়ে যায়। আমরা একে অপরকে না চিনলেও সবাই আপন হয়ে উঠি।”

শহরের কেন্দ্র থেকে কিছুটা দূরে লা রোমার ক্যাফেগুলোতেও একই আলোচনা। ইকুয়েডরকে হারানোর পর পাসেও দে লা রেফর্মায় রাতভর চলা উদ্‌যাপনের কথা মনে করে পাবলো বললেন, “হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় ছিল। গাড়ির হর্ন, ঢাক-ঢোল, নাচ, গান—পুরো শহর যেন উৎসবে ভেসে যাচ্ছিল।”

তাঁর মতে, এবার মানুষের বিশ্বাসটাই আলাদা। “আগের দলগুলোকে নিয়ে সবসময় কিছুটা সন্দেহ ছিল। কিন্তু এবার যত এগোচ্ছি, ততই সবাই ভাবছে—হয়তো সত্যিই সম্ভব।”

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সমর্থক পাবলোর সবচেয়ে বড় ভরসা ১৭ বছরের বিস্ময়বালক গিলবের্তো মোরা। ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে অসাধারণ পারফরম্যান্স করা এই তরুণকে তিনি ভবিষ্যতের তারকা হিসেবে দেখছেন। “ও অবিশ্বাস্য ফুটবল খেলছে। আশা করি দ্রুত ইউরোপে যাবে। বিদেশে খেললে ওর যেমন উন্নতি হবে, তেমনই লাভ হবে জাতীয় দলেরও।”

এই বিশ্বকাপ অনেকের কাছেই শুধু ফুটবল নয়, জীবনের এক আবেগময় অধ্যায়। প্রিন্সিপিয়া জানালেন, দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচের দিনই তাঁর ঠাকুমার মৃত্যু হয়েছিল। নয় দিনের শোকের পর তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মেক্সিকো সিটিতে আসেন।

“ঠাকুমাই যেন আমাদের আবার এক করে দিলেন,” বললেন তিনি। “দশ বছরের বেশি সময় আমরা একসঙ্গে কোথাও যাইনি। এবার বিশ্বকাপ আমাদের আবার একই ছাতার নিচে এনে দাঁড় করিয়েছে।”

তবে ব্যতিক্রমও আছে। ট্যাক্সিচালক মার্কো স্বীকার করলেন, “আমি খুব একটা ফুটবল দেখি না। মেক্সিকো জিতলে ভালো, ইংল্যান্ড জিতলেও সমস্যা নেই। দুটো দলই ভালো খেলছে।”

কিন্তু তিনিও শেষ পর্যন্ত আজটেকার শক্তিকে অস্বীকার করতে পারলেন না। তাঁর কথায়, “পুরো স্টেডিয়াম মেক্সিকোর সমর্থকে ভর্তি থাকবে। যখন গোটা একটা দেশ একসঙ্গে নিজের দলের জন্য গর্জে ওঠে, তখন সেই দলের বিরুদ্ধে খেলা যে কোনও প্রতিপক্ষের জন্য ভীষণ কঠিন।”

জোকালোয় ফিরে সমর্থক আলেহান্দ্রা বলছিলেন মেক্সিকোর কোটি মানুষের মনের কথা, “ভয় তো আছেই। ইংল্যান্ড শক্তিশালী দল। কিন্তু আমাদের বিশ্বাসও আছে। আমরা বিশ্বাস করি, এই আজটেকা, এই সমর্থক আর এই দল মিলেই ইতিহাস লিখতে পারে।”

রবিবার তাই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়। এটি মেক্সিকোর কাছে একটি জাতীয় আবেগের পরীক্ষা, একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষার লড়াই এবং বিশ্বকাপের মঞ্চে নতুন ইতিহাস লেখার স্বপ্ন। ইংল্যান্ডের সামনে থাকবে শুধু এগারো জন ফুটবলার নয়, বরং এক উন্মত্ত স্টেডিয়াম এবং প্রায় তেরো কোটি মানুষের অটুট বিশ্বাস।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles