হাইলাইটস
- সিএনএনের হাতে এসেছে আমেরিকা-ইরান খসড়া চুক্তির পূর্ণ পাঠ বলে দাবি
- যুদ্ধবিরতি, তেল পরিবহণ ও পরমাণু আলোচনা পুনরারম্ভই চুক্তির মূল লক্ষ্য
- ইরানের উপর বহু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে
- ইজরায়েল ও মার্কিন কট্টরপন্থীদের আশঙ্কা, তেহরান আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে
- সমর্থকদের দাবি, আরেকটি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ঠেকানোর এটিই একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ
বাংলাস্ফিয়ার: আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সদ্য ঘোষিত খসড়া শান্তি-চুক্তি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন দাবি করেছে, তারা চুক্তির পূর্ণ খসড়া হাতে পেয়েছে। যদিও হোয়াইট হাউস এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নথিটি প্রকাশ করেনি, তবু যে তথ্যগুলি প্রকাশ্যে এসেছে, তা থেকে স্পষ্ট—এটি কেবল যুদ্ধবিরতির নথি নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ শক্তি-সমীকরণ নির্ধারণ করতে পারে এমন একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা।
গত কয়েক মাসে ইরান, ইজরায়েল ও আমেরিকার মধ্যে যে সামরিক সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা অনেকের কাছেই পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধের পূর্বাভাস বলে মনে হয়েছিল। পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালী, লোহিত সাগর—সব জায়গাতেই উত্তেজনা বাড়ছিল। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কেঁপে উঠেছিল বিশ্ববাজার। সেই প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যে সমঝোতার পথে এগিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।
খসড়া চুক্তির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হল তাৎক্ষণিক সংঘর্ষ বন্ধ করা। ইরান ও আমেরিকা উভয় পক্ষই সামরিক উত্তেজনা প্রশমনে সম্মত হবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও তেল পরিবহণ স্বাভাবিক করার বিষয়েও নীতিগত ঐকমত্য হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথ নিরাপদ থাকলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপ, এশিয়া ও আমেরিকার অর্থনীতিও স্বস্তি পাবে।
চুক্তির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নতুন আলোচনা। জানা যাচ্ছে, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি বিস্তৃত আলোচনার কাঠামো তৈরি হবে। সেখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, আন্তর্জাতিক পরিদর্শন, পরমাণু গবেষণার সীমা এবং সম্ভাব্য আস্থা-বৃদ্ধিমূলক ব্যবস্থাগুলি নিয়ে আলোচনা হবে। অর্থাৎ বর্তমান চুক্তি মূলত একটি রাজনৈতিক ছাতা, যার নিচে ভবিষ্যতের পরমাণু সমঝোতা তৈরির চেষ্টা করা হবে।
কিন্তু এখানেই শুরু হয়েছে সবচেয়ে বড় বিতর্ক। সমালোচকদের বক্তব্য, চুক্তিতে ইরানকে যে অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, তার বিনিময়ে তেহরান খুব বেশি কিছু ছাড়ছে না। বিভিন্ন রিপোর্টে বলা হয়েছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বড় অংশ শিথিল করার পথ খুলে দেওয়া হতে পারে। ইরানকে আবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রির সুযোগ দেওয়া হতে পারে। বিদেশে আটকে থাকা কিছু সম্পদ মুক্ত করার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।
ইজরায়েলি রাজনৈতিক মহল এবং মার্কিন রিপাবলিকান পার্টির একাংশ মনে করছে, এই ধরনের ছাড় ইরানের জন্য বিরাট কূটনৈতিক বিজয়। তাদের যুক্তি, অর্থনৈতিক চাপই এতদিন তেহরানকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করেছিল। সেই চাপ যদি আগেভাগেই তুলে নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আমেরিকার হাতে দর-কষাকষির অস্ত্র খুব কমে যাবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল যাচাই প্রক্রিয়া। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই সন্দেহ রয়েছে। সমালোচকদের বক্তব্য, শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কঠোর আন্তর্জাতিক নজরদারি, আকস্মিক পরিদর্শনের অধিকার এবং চুক্তি ভঙ্গ হলে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। খসড়া নথিতে এই বিষয়গুলি কতটা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তা এখনও পরিষ্কার নয়।
ইজরায়েলের উদ্বেগও অমূলক নয়। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বহু বছর ধরে দাবি করে আসছেন যে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি শুধু ইজরায়েলের জন্য নয়, সমগ্র অঞ্চলের জন্য হুমকি। তাঁর আশঙ্কা, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠলে ইরান আবার আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থন বাড়াতে পারে। লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন কিংবা ইরাকে তেহরানের প্রভাব আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
তবে চুক্তির সমর্থকেরাও শক্তিশালী যুক্তি দিচ্ছেন। তাঁদের মতে, বিকল্প কী? গত দুই দশকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে কেবল নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক চাপ দিয়ে ইরান সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হয়নি। বরং উত্তেজনা বেড়েছে, যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতি বারবার ধাক্কা খেয়েছে। এই অবস্থায় কূটনৈতিক পথই একমাত্র বাস্তবসম্মত উপায়।
সমর্থকদের আরও দাবি, একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে কখনও চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি মূলত সময় কেনার একটি প্রক্রিয়া। যুদ্ধ বন্ধ হলে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়। আর আলোচনার মাধ্যমেই পরমাণু, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো জটিল সমস্যাগুলির সমাধান সম্ভব।
সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগকে একদিকে যেমন সাহসী কূটনৈতিক পদক্ষেপ বলা হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি একে বিপজ্জনক ঝুঁকিও মনে করছেন অনেকে। চুক্তির ভাষা যতই আকর্ষণীয় হোক, তার সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের উপর। ইরান সত্যিই কতটা সহযোগিতা করে, আমেরিকা কতটা কঠোর যাচাই ব্যবস্থা বজায় রাখে এবং ইজরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ কতটা গুরুত্ব পায়—সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে এই সমঝোতা ইতিহাসে শান্তির চুক্তি হিসেবে স্মরণীয় হবে, নাকি ভবিষ্যতের আরও বড় সংকটের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত হবে।