বাংলাস্ফিয়ার: পুলিশি হেফাজতে তৃণমূল কংগ্রেস কর্মী বীরজু কেওটের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের দায় কার্যত স্বীকার করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার উত্তর ২৪ পরগনার হালিশহরে মৃতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করার পর তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বীরজুর মৃত্যু পুলিশি হেফাজতেই হয়েছে এবং এই ঘটনার দায় পুলিশ এড়াতে পারে না। একই সঙ্গে তদন্তকারী পুলিশ অফিসারকে সাসপেন্ড, সংশ্লিষ্ট থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিককে সরিয়ে দেওয়া এবং জেলাশাসকের নেতৃত্বে ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী। মৃতের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য এবং তাঁর স্ত্রীকে সরকারি চাকরি দেওয়ার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।
ঘটনাটি ঘিরে ইতিমধ্যেই প্রবল রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। কারণ মৃত বীরজু কেওট তৃণমূলের কর্মী এবং তাঁর স্ত্রী জেনি শর্মা কেওট কাঁচরাপাড়া পুরসভার প্রাক্তন কাউন্সিলর। বীরজুর মৃত্যুর পরে তৃণমূল পুলিশের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তুলে সরব হয়। রবিবার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মৃতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে হালিশহরে গেলে তাঁর গাড়িকে ঘিরেও গোলমাল হয়। পরের দিনই সেখানে যান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
কী হয়েছিল বীরজুর
৪৮ বছর বয়সি বীরজু কেওটকে তোলাবাজি-সহ কয়েকটি অভিযোগে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। আদালতে তোলার পরে তাঁকে পাঁচ দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠানো হয়। সেই হেফাজতে থাকাকালীনই শুক্রবার তাঁর মৃত্যু হয়। পরিবারের অভিযোগ, থানায় মারধরের ফলেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। বীরজুর স্ত্রী দাবি করেছেন, মৃত্যুর আগে রাত ১০টা পর্যন্ত তাঁর স্বামী সুস্থ ছিলেন এবং তিনি থানায় গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখাও করেছিলেন। পরিবারের বক্তব্য, তার আগের রাতে বীরজুর স্বাস্থ্যপরীক্ষা হয়েছিল এবং তখনও কোনও গুরুতর অসুস্থতার কথা জানা যায়নি।
এই কারণেই মৃত্যুর পরে প্রশ্ন ওঠে—কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এমন কী ঘটল যে একজন ব্যক্তির পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু হল?
পরিবারের অভিযোগের সত্যতা অবশ্য এখনও বিচারাধীন। ময়নাতদন্ত এবং ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বীরজুর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত ভাবে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী একটি বিষয় নিয়ে কোনও সংশয় রাখেননি—মৃত্যুটি পুলিশি হেফাজতেই হয়েছে এবং হেফাজতে থাকা ব্যক্তির নিরাপত্তার দায়িত্ব পুলিশের।
‘পুলিশ দায় এড়াতে পারে না’
মৃতের পরিবারের সঙ্গে কথা বলার পরে শুভেন্দু জানান, পুলিশের হেফাজতে কোনও ব্যক্তির মৃত্যু হলে পুলিশ প্রশাসন তার দায়িত্ব থেকে সরে যেতে পারে না। তিনি পুলিশের গাফিলতির কথাও স্বীকার করেন। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে আসার আগে নির্যাতনের অভিযোগ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না বলেও প্রশাসনের তরফে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক দিক থেকে মুখ্যমন্ত্রীর এই অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ। বিরোধী দলের কর্মীর মৃত্যু বলে পুলিশকে রক্ষা করার চেষ্টা না করে তিনি প্রশাসনিক দায় স্বীকার করেছেন এবং প্রকাশ্যেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছেন।
তদন্তকারী অফিসারকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিককে পুলিশ লাইনে পাঠানো হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনার জেলাশাসক শিল্পা গৌরিসারিয়াকে ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে মৃতের পরিবার এবং মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়মিত জানানো হবে বলেও প্রশাসন জানিয়েছে।
পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা, স্ত্রীকে চাকরি
মুখ্যমন্ত্রী মৃতের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা করেছেন। পাশাপাশি বীরজুর স্ত্রীকে সরকারি চাকরি দেওয়া হবে। শুভেন্দুর সঙ্গে মৃতের বাড়িতে গিয়েছিলেন বিজেপি বিধায়ক অর্জুন সিং, রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধ নাথ গুপ্ত-সহ প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকেরা।
তবে শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা চাকরিতে সন্তুষ্ট নন বীরজুর স্ত্রী। তাঁর দাবি, স্বামীর মৃত্যুর সময় থানায় উপস্থিত যে সমস্ত পুলিশকর্মীর ভূমিকা ছিল, তদন্তে তাঁদের দায় প্রমাণিত হলে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি প্রকাশ্যেই জানিয়েছেন, সরকারি চাকরি দেওয়া হলেও তাঁর প্রধান দাবি স্বামীর মৃত্যুর জন্য দায়ীদের শাস্তি।
ফলে সরকারের সামনে এখন বড় পরীক্ষা তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা। কারণ শাস্তিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং ফৌজদারি দায় এক বিষয় নয়। কোনও পুলিশকর্মীকে সাসপেন্ড বা বদলি করা বিভাগীয় পদক্ষেপ; কিন্তু বীরজুর মৃত্যু নির্যাতনের কারণে হয়ে থাকলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার প্রশ্নও উঠবে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ মুখ্যমন্ত্রীর স্বীকারোক্তি
ভারতের আইনি কাঠামোয় পুলিশি হেফাজতে থাকা ব্যক্তির জীবন রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার যে অধিকার দেওয়া হয়েছে, গ্রেফতার হওয়ার পরে সেই অধিকার শেষ হয়ে যায় না। বরং ব্যক্তি যখন রাষ্ট্রের হেফাজতে, তখন তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়।
সাম্প্রতিক একটি রায়েও দিল্লি হাইকোর্ট বলেছে, হেফাজতে অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটলে রাষ্ট্র কেবল এই যুক্তিতে দায় এড়াতে পারে না যে সরাসরি পুলিশি নির্যাতন প্রমাণিত হয়নি। হেফাজতে থাকা ব্যক্তির জীবন ও মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের কঠোর দায়িত্ব।
সেই প্রেক্ষাপটেই শুভেন্দুর বক্তব্য—পুলিশ দায়িত্ব এড়াতে পারে না—প্রশাসনিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মুখ্যমন্ত্রী একই সঙ্গে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। ফলে এটি কেবল রাজনৈতিক মন্তব্য নয়, তাঁর অধীনস্থ পুলিশ প্রশাসনের দায় সম্পর্কে সরকারের অবস্থানও।
রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে
বীরজুর রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ঘটনাটি দ্রুত শাসক-বিরোধী সংঘাতের কেন্দ্রে চলে এসেছে। তৃণমূলের অভিযোগ, রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পরে বিরোধী দলের কর্মীদের বিরুদ্ধে পুলিশকে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং বীরজুর মৃত্যু তারই ভয়াবহ পরিণতি। অন্য দিকে সরকারের অবস্থান, অভিযোগ যাঁর বিরুদ্ধেই থাকুক, হেফাজতে মৃত্যুর ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত হবে।
এই অবস্থান কতটা কার্যকর ভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই এখন দেখার। কারণ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের উপর—ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, স্বাধীন ম্যাজিস্ট্রেট তদন্তের ফল এবং দায়ী পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা।
শুভেন্দু আপাতত প্রথম রাজনৈতিক পদক্ষেপটি নিয়েছেন—বিরোধী দলের কর্মীর হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাকে অস্বীকার না করে পুলিশের দায় স্বীকার করেছেন। তদন্তকারী অফিসারকে সাসপেন্ড এবং থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিককে সরানোর মাধ্যমে বার্তাও দিয়েছেন যে প্রশাসনিক দায় নির্ধারণ করা হবে। কিন্তু বীরজুর পরিবারের দাবি আরও এক ধাপ এগিয়ে—শুধু গাফিলতি নয়, তাঁর মৃত্যুর জন্য ব্যক্তিগত ভাবে কারা দায়ী, তা চিহ্নিত করে শাস্তি দিতে হবে।
হালিশহরের এই ঘটনা তাই আর শুধু একটি থানায় এক বন্দির মৃত্যুর ঘটনা নয়। নতুন সরকারের অধীনে পুলিশের জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত করা হবে, তারও প্রথম বড় পরীক্ষাগুলির একটি হয়ে উঠেছে বীরজু কেওটের মৃত্যু।