Home SportsFIFA World Cup 2026 ট্রফি নাকি জনপ্রিয়তা? ঘরের মাঠে আমেরিকার জন্য সাফল্যের সংজ্ঞা ঠিক কী?

ট্রফি নাকি জনপ্রিয়তা? ঘরের মাঠে আমেরিকার জন্য সাফল্যের সংজ্ঞা ঠিক কী?

0 comments 8 views 4 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস:

  •  আমেরিকা বিশ্বকাপে নামছে বিরাট প্রত্যাশা ও অনিশ্চয়তার মাঝে।
  • কোচ পোচেত্তিনো বিশ্বাস করেন দল বিশ্বকাপ জিততেও পারে; একাংশ আবার গ্রুপ পর্বেই বিদায়ের আশঙ্কা দেখছেন।
  • আমেরিকার সাফল্য বিচার হবে শুধু দলের পারফরম্যান্স নয়, আমেরিকান ফুটবলের সামগ্রিক সম্ভাবনার মাপকাঠিতেও।
  • অভিবাসন, জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক বিভাজনের প্রশ্নও এই বিশ্বকাপকে ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রে।

বাংলাস্ফিয়ার: ক্যালিফোর্নিয়ার আরভাইনের চ্যাম্পিয়নশিপ সকার স্টেডিয়ামে সোমবার বিকেলে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেল। বিশ্বকাপের ঠিক আগে আমেরিকা দলের উন্মুক্ত অনুশীলন দেখতে হাজির হয়েছিলেন সাড়ে পাঁচ হাজারেরও বেশি সমর্থক। কোচ মরিসিও পোচেত্তিনো মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে তাঁদের উদ্দেশে কয়েকটি কথা বলতে উঠলেন। কিন্তু প্রযুক্তি যেন তাঁর সঙ্গে মজা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। মাইক্রোফোন বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, শব্দ কেটে যাচ্ছিল, বাক্য মাঝপথে থেমে যাচ্ছিল।

শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি রসিকতার আশ্রয় নিলেন।

“আমরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দেশে আছি,” বললেন আর্জেন্টাইন কোচ, “কিন্তু প্রযুক্তিটা কাজ করছে না।”

স্টেডিয়ামে হাসির রোল উঠেছিল। কিন্তু ঘটনাটি যেন প্রতীকীও ছিল। কারণ গত প্রায় দুই বছর ধরে আমেরিকান ফুটবলের সঙ্গে পোচেত্তিনোর সম্পর্কও অনেকটা এই মাইক্রোফোনের মতোই—মাঝে মাঝে অসাধারণ, আবার মাঝেমধ্যে বিস্ময়করভাবে বিশৃঙ্খল।

মার্কিন ফুটবল ইতিহাসে সর্বোচ্চ বেতনে নিয়োগ পাওয়া কোচ হিসেবে তিনি এসেছিলেন ইউরোপীয় ফুটবলের আভিজাত্য নিয়ে। বছরে ছয় মিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে তাঁকে আনা হয়েছিল এমন একটি দেশকে বিশ্বমঞ্চে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য, যে দেশ এখনও ফুটবলের তুলনায় বেসবল, বাস্কেটবল বা আমেরিকান ফুটবলকেই বেশি আপন মনে করে।

কিন্তু ২২ মাস পরেও ছবিটা অস্পষ্ট।

পোচেত্তিনোর অধীনে আমেরিকা ১৫টি ম্যাচ জিতেছে, ১০টি হেরেছে, একটি ড্র করেছে। পরিসংখ্যান বলছে দলটি ভালো, কিন্তু ভয়ঙ্কর নয়। কখনও তারা দুর্দান্ত ফুটবল খেলেছে, আবার কখনও এমনভাবে ছন্দ হারিয়েছে যে মনে হয়েছে তারা নিজেদেরই চেনে না। এক ম্যাচে তারা সাহসী, পরের ম্যাচেই অকারণে ভীত।

তবু পোচেত্তিনো বারবার বলে চলেছেন—আমেরিকা বিশ্বকাপ জিততে পারে। তাঁর প্রিয় উত্তর: “কেন নয়?”

এই ‘কেন নয়’ই যেন আজকের আমেরিকান ফুটবলের মূল দর্শন। কারণ এই বিশ্বকাপে কোনও দলই আমেরিকার মতো এমন অদ্ভুত অবস্থানে নেই।

স্পেন, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স বা ব্রাজিলের মতো দেশগুলির সামনে সমীকরণ পরিষ্কার। ট্রফি না জিতলে ব্যর্থতা। অন্যদিকে কুরাসাও, জর্ডান বা কেপ ভার্দের মতো দেশগুলির জন্য শুধু সম্মানের সঙ্গে লড়াই করাটাই বিশাল সাফল্য।

কিন্তু আমেরিকার জন্য সাফল্যের সংজ্ঞা কী? শেষ ষোলো? কোয়ার্টার ফাইনাল? সেমিফাইনাল? ফাইনাল? এর কোনও নির্দিষ্ট উত্তর নেই।

কারণ আমেরিকার পারফরম্যান্সকে শুধুমাত্র ফুটবলীয় সাফল্য হিসেবে বিচার করা হবে না। এটি হবে একটি বৃহত্তর প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা—আমেরিকা কি সত্যিই ফুটবল-দেশ হতে পারে?

দলের সবচেয়ে বড় তারকা ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ সম্প্রতি বলেছিলেন, “আমরা নিজেদের জন্য এবং আমাদের দেশের জন্য খেলছি। আমাদের দলে বিশ্বের বড় বড় ক্লাবে খেলা অনেক ভালো ফুটবলার আছে। আমরা প্রমাণ করতে চাই যে নিজেদের সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস সঠিক।”

এই আত্মবিশ্বাস দলের মধ্যে আছে, কোচের মধ্যেও আছে। কিন্তু পুরো দেশের মধ্যে কি আছে? সেখানেই আসল সংকট।

কারণ আমেরিকায় ফুটবলের সবচেয়ে বড় সমস্যা জনপ্রিয়তা নয়, বরং মালিকানার প্রশ্ন। দেশটিতে কোটি কোটি মানুষ ফুটবল দেখে। কিন্তু তারা যে ফুটবল দেখে, তার বড় অংশই বিদেশি। ইংল্যান্ডের প্রিমিয়ার লিগ, ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কিংবা মেক্সিকোর লিগা এমএক্স এখনও আমেরিকান দর্শকের কাছে স্থানীয় লিগের তুলনায় অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ। অর্থাৎ আমেরিকায় ফুটবল জনপ্রিয়, কিন্তু আমেরিকান ফুটবল এখনও পুরোপুরি নয়।

এই বাস্তবতা পোচেত্তিনো খুব ভালো করেই বোঝেন। তাঁর কথায়, “আর্জেন্টিনায় একটি শিশুর প্রথম উপহার হয় ফুটবল। এখানে হয় বেসবল ব্যাট, বাস্কেটবল বা ডিম্বাকৃতি ফুটবল।”

একটি বাক্যে তিনি আসলে শত বছরের সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করেছেন। আমেরিকায় ফুটবলকে শুধু ম্যাচ জিতে জনপ্রিয় হতে হবে না; তাকে পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশও হতে হবে। তাকে ড্রয়িংরুমে, স্কুলে, পাড়ার মাঠে এবং জাতীয় কল্পনায় জায়গা করে নিতে হবে।

এই কারণেই ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ আমেরিকার জন্য শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়। এটি একটি জাতীয় অডিশন।

২০০২ সালে আমেরিকা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল। সেটাই এখনও আধুনিক যুগে তাদের সেরা বিশ্বকাপ সাফল্য। এবার যদি সেই সীমা অতিক্রম করা যায়, তাহলে হয়তো নতুন প্রজন্মের কাছে ফুটবল অন্য উচ্চতায় পৌঁছাবে।

কিন্তু ফলাফলই সব নয়। আমেরিকান ক্রীড়া সংস্কৃতি শুধু বিজয়ীদের ভালোবাসে না, নায়কদেরও। পুলিসিচ, ওয়েস্টন ম্যাককেনি, টাইলার অ্যাডামস, ক্রিস রিচার্ডস, অ্যান্টনি রবিনসন, ফোলারিন বালোগুন বা রিকার্ডো পেপিরা কি এমন মুখ হয়ে উঠতে পারবেন, যাঁদের নাম ফুটবল না-দেখা মানুষও চিনবে? তাঁরা কি লেব্রন জেমস, প্যাট্রিক মাহোমস বা অ্যারন জাজের মতো সাংস্কৃতিক উপস্থিতি তৈরি করতে পারবেন?

তবে পুরো গল্পটি শুধুই ফুটবলের নয়। এই বিশ্বকাপের ওপর রাজনৈতিক ছায়াও পড়েছে।

অনেক আমেরিকান সমর্থকের মনে অস্বস্তি আছে। কারণ বিশ্বকাপ এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন দেশটি অভিবাসন নীতি, জাতিগত উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক বিভাজন নিয়ে গভীর বিতর্কের মধ্যে রয়েছে। খেলোয়াড়রা কোনও যুদ্ধ শুরু করেননি, কোনও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেননি, আশ্রয়প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নীতি প্রণয়ন করেননি। কিন্তু তাঁরা যে জার্সি পরে মাঠে নামবেন, সেই জার্সির তারকা আর ডোরাগুলি সেই রাষ্ট্রকেই প্রতিনিধিত্ব করে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে—যদি আমেরিকা বিশ্বকাপে বড় সাফল্য পায়, তাহলে সেই সাফল্যকে কে নিজের বলে দাবি করবে? ফুটবলাররা? সমর্থকেরা? নাকি রাজনীতিবিদেরা? আর কোনও অসাধারণ গোল বা রূপকথার অভিযান কি এই বিতর্কগুলিকে অন্তত সাময়িকভাবে সরিয়ে দিতে পারবে?

পোচেত্তিনো অবশ্য এই সব রাজনৈতিক প্রশ্ন থেকে সচেতনভাবেই দূরে থেকেছেন। তিনি প্রকাশ্যে শুধু ফুটবল নিয়েই কথা বলেন। খেলোয়াড়দেরও একই পথ অনুসরণ করতে বলেছেন।

আরভাইনের সেই অনুষ্ঠানের শেষে তিনি সমর্থকদের সঙ্গে একসঙ্গে স্লোগান তুলতে চাইলেন।

“ওয়ান, টু, থ্রি—ইউএসএ!”

কিন্তু ভিড় তাঁর তাল ধরতে পারল না। স্লোগানটা ঠিক জমল না।

তিনি হেসে আবার বললেন, “আমার মনে হয় তোমরা আরও ভালো করতে পারো।”

সম্ভবত এটিই আজকের আমেরিকান ফুটবলের সবচেয়ে নিখুঁত প্রতীক। প্রতিভা আছে, অর্থ আছে, স্বপ্ন আছে, বিশ্বাস আছে। কিন্তু এখনও সেই একসুরে উচ্চারিত কণ্ঠস্বরটি পুরোপুরি তৈরি হয়নি।

বিশ্বকাপ ২০২৬ হয়তো শেষ পর্যন্ত ট্রফি জয়ের গল্প হবে না। হয়তো আমেরিকা সেমিফাইনালেও পৌঁছবে না। কিন্তু এই টুর্নামেন্টের শেষে যদি আমেরিকা ফুটবলকে আর ‘বিদেশি খেলা’ বলে না দেখে, যদি লক্ষ লক্ষ শিশু প্রথমবার ফুটবলকে নিজেদের স্বপ্ন হিসেবে বেছে নেয়, যদি পুলিসিচদের মুখ সত্যিই জাতীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে তাহলে সেটাই হয়তো হবে তাদের সবচেয়ে বড় বিজয়।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles