Table of Contents
হাইলাইটস:
- সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন।
- মিকেল ওইয়ারসাবালের পেনাল্টি ও পেদ্রো পোরোর গোলে নিশ্চিত জয়।
- রদ্রি-ফাবিয়ান রুইজ-দানি ওলমোর দাপটে মাঝমাঠের লড়াই পুরোপুরি জিতে নেয় স্পেন।
- এমবাপ্পে, দেম্বেলে, বারকোলা ও অলিজের তারকা আক্রমণভাগকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে দেন স্প্যানিশ ফুটবলাররা।
- হারের পর রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশঁ।
- রবিবার নিউ জার্সিতে আর্জেন্টিনা বা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ফাইনাল খেলবে স্পেন।
বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্স ছিল পরিষ্কার ফেভারিট। টুর্নামেন্টজুড়ে গোলের বন্যা বইয়ে তারা শেষ চারে পৌঁছেছিল। অনেকেই মনে করেছিলেন, তৃতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে আরেকটি ধাপ পার করবে লে ব্লু। কিন্তু মাঠে দেখা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি। কৌশল, শৃঙ্খলা, বল দখল এবং মাঝমাঠের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে গেল ইউরোপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন স্পেন।
টেক্সাসের আরলিংটনের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে শুরু থেকেই নিজেদের পরিকল্পনা নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। প্রথমার্ধে মিকেল ওইয়ারসাবালের পেনাল্টি এবং দ্বিতীয়ার্ধে পেদ্রো পোরোর চমৎকার গোল স্পেনের জয় নিশ্চিত করে। ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা এবার ফাইনালে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা অথবা ইংল্যান্ডের।
ম্যাচ শেষে স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে বলেন, “প্রায় চার বছর আগে আমরা একটি ধারণা নিয়ে পথচলা শুরু করেছিলাম। আমরা সেই ধারণার প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছি, আর সেটাই আমাদের এখানে এনে দিয়েছে। এই ফুটবলাররা সবকিছুর যোগ্য। প্রতিদিন ওরা নিজেদের প্রতিশ্রুতি, সংহতি, উদারতা ও প্রতিভার পরিচয় দিয়েছে। ওরা কঠিন কাজকেও সহজ করে তোলে।”
শুরু থেকেই স্পেনের দাপট
ম্যাচের আগে স্পেন ঘোষণা করেছিল, তারা রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলবে না; শুরু থেকেই আক্রমণ করবে। মাঠে সেই প্রতিশ্রুতিরই প্রতিফলন দেখা যায়।
রদ্রির নেতৃত্বে স্পেনের মাঝমাঠে ছিলেন ফাবিয়ান রুইজ ও দানি ওলমো। এই ত্রয়ী এমনভাবে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করেন যে ফ্রান্সের দুই মিডফিল্ডার আদ্রিয়াঁ রাবিও ও অরেলিয়াঁ চুয়ামেনি কার্যত দর্শকের ভূমিকায় চলে যান। ছোট ছোট পাস, দ্রুত পজিশন বদল এবং বলের দখল ধরে রেখে স্পেন ম্যাচের ছন্দ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।
ফ্রান্সের বিরক্তির প্রথম প্রকাশ দেখা যায় নবম মিনিটে। ওলমোর পায়ে স্টাড লাগানোর অপরাধে হলুদ কার্ড দেখেন রাবিও।
তবে বলের দখল স্পেনের হলেও প্রথম বড় সুযোগটি পেয়েছিল ফ্রান্স। ১৬ মিনিটে এমবাপ্পে গোলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু অসাধারণ সময়জ্ঞান দেখিয়ে শেষ মুহূর্তে বল ক্লিয়ার করেন তরুণ ডিফেন্ডার পাও কুবারসি।
পেনাল্টি থেকে এগিয়ে স্পেন
২০ মিনিটে স্পেনের আক্রমণ থেকে আসে ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট। মার্ক কুকুরেয়ার একটি উঁচু ক্রস ক্লিয়ার করতে গিয়ে লুকাস দিনের হেড ঠিকমতো হয়নি। বলটি পেছনে চলে যায়। পরক্ষণেই লামিন ইয়ামালকে ক্লিয়ার করতে গিয়ে পায়ে লাথি মারেন দিনে। ইয়ামাল মাটিতে পড়ে গেলে রেফারি ইভান বার্টন সঙ্গে সঙ্গে পেনাল্টির নির্দেশ দেন।
ফরাসি ফুটবলাররা আপত্তি জানালেও সিদ্ধান্ত বদলায়নি। মিকেল ওইয়ারসাবাল স্পট-কিক থেকে মাইক মেনিয়াঁকে ভুল পথে পাঠিয়ে বল জালে জড়ান।
৩১ মিনিটে ফ্রান্স আরও বড় ধাক্কা খায়। চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন সেন্টার-ব্যাক উইলিয়াম সালিবা। তাঁর জায়গায় নামেন ম্যাক্সঁস লাখরোয়া।
৩৮ মিনিটে দুর্দান্ত পাসিং মুভ থেকে ব্যবধান প্রায় দ্বিগুণ করে ফেলেছিল স্পেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে দায়ো উপামেকানোর ব্লক ফাবিয়ান রুইজকে গোল করতে দেয়নি।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে কিছুটা চাপ বাড়ায় ফ্রান্স। রাবিওর দারুণ থ্রু-পাস ধরে এমবাপ্পে এগিয়ে গেলেও দ্রুত বেরিয়ে এসে বিপদ সামাল দেন গোলরক্ষক উনাই সিমন।
দ্বিতীয়ার্ধেও একই ছবি
বিরতির পর অনেকেই আশা করেছিলেন, কোচ দিদিয়ের দেশঁ কৌশলে পরিবর্তন আনবেন। কিন্তু স্পেনের মাঝমাঠের দাপট কমেনি।
৫৮ মিনিটে ম্যাচের সবচেয়ে সুন্দর আক্রমণগুলির একটি দেখা যায়। দানি ওলমো ও পেদ্রো পোরো বক্সের সামনে দুর্দান্ত ওয়ান-টু খেলেন। এরপর টটেনহ্যামের ডিফেন্ডার পোরো নিখুঁত শটে মেনিয়াঁকে পরাস্ত করে ব্যবধান ২-০ করেন।
৬১ মিনিটে লামিন ইয়ামাল বল জালে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু ভিএআরে দেখা যায় তিনি অল্পের জন্য অফসাইড ছিলেন। ফলে গোলটি বাতিল হয়।
এরপর দেশঁ একের পর এক বদলি নামান। কিন্তু স্পেনের রক্ষণে কোনো ফাঁক খুঁজে পায়নি ফ্রান্স। এমবাপ্পের একটি জোরালো শট নিকট পোস্টে উনাই সিমন আটকে দেন। শেষদিকে হতাশ এমবাপ্পে সিমনের ওপর ফাউল করে হলুদ কার্ডও দেখেন।
দেশঁর ক্ষোভ
ম্যাচ শেষে ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশঁ বলেন, “অবশ্যই আমরা ভীষণ হতাশ। খেলোয়াড়রা ভেঙে পড়েছে। আমাদের বড় লক্ষ্য ছিল। কিন্তু বাস্তবও মেনে নিতে হবে। আজ প্রযুক্তিগত দিক থেকে আমরা স্পেনের চেয়ে এক ধাপ পিছিয়ে ছিলাম। তারা ম্যাচকে অসাধারণভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রথমেই বলব, দোষ আমাদেরই। আমি কাউকে দায়ী করতে চাই না।”
তবে রেফারির পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন তুলতে দ্বিধা করেননি ফরাসি কোচ।
দেশঁ বলেন, “আমি একটি প্রশ্ন করব, কিন্তু তার উত্তর দেব না। এই রেফারি কি সত্যিই বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল পরিচালনার মতো মানের ছিলেন? শুধু আজকের হার নয়, ম্যাচে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন আছে। অবশ্য কিছু সিদ্ধান্ত আমাদের পক্ষেও গেছে।”
স্বপ্নপূরণের আনন্দ
স্পেনের দ্বিতীয় গোলদাতা পেদ্রো পোরো বলেন, “এটা স্বপ্নপূরণ। আমরা জানতাম ফ্রান্স খুবই কঠিন প্রতিপক্ষ। কিন্তু শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমরা পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলেছি। আজ ফাইনালে ওঠার জন্য যা যা করা দরকার ছিল, সবই করেছি। এই সাফল্য আমার একার নয়, পুরো দলের।”
মাঝমাঠে রদ্রির কর্তৃত্ব, রক্ষণে শৃঙ্খলা, আক্রমণে কার্যকারিতা এবং কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের নিখুঁত কৌশল—সব মিলিয়ে স্পেন শুধু একটি ম্যাচ জেতেনি, টুর্নামেন্টের সবচেয়ে শক্তিশালী দলকে হারিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের দাবিও জোরালো করেছে। এখন তাদের সামনে আর মাত্র একটি বাধা। রবিবার নিউ জার্সির ফাইনালে আর্জেন্টিনা অথবা ইংল্যান্ডকে হারাতে পারলেই ১৬ বছর পর আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট উঠবে স্পেনের মাথায়।