হাইলাইটস:

  • অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিশন।
  • ২০১১ থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখবে।
  • অ্যাম্ফান, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, ১০০ দিনের কাজ, মিড-ডে মিল-সহ বিভিন্ন প্রকল্প তদন্তের আওতায়।
  • শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সরকারি নিয়োগ, বেআইনি নির্মাণ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও মিথ্যা মামলাও তদন্তযোগ্য।
  • দেওয়ানি আদালতের সমপর্যায়ের ক্ষমতা, প্রয়োজনে এফআইআর দায়েরের সুপারিশ করতে পারবে কমিশন।
  • তবে সিবিআই বা অন্য কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তদন্তাধীন মামলা কমিশনের আওতার বাইরে।

বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১৩ জুলাই প্রকাশিত গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ২০১১ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত সংঘটিত অভিযোগিত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির তদন্তের জন্য একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠন করেছে। অবসরপ্রাপ্ত কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর নেতৃত্বে গঠিত এই কমিশনের লক্ষ্য কেবল পৃথক দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখা নয়, বরং গত দেড় দশকে প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে কোথায় কোথায় দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অনিয়ম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছিল, তার সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা।

গেজেট অনুযায়ী, কমিশনের চেয়ারম্যান হবেন বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু। তাঁর সঙ্গে থাকবেন তদন্ত শাখার প্রধান হিসেবে একজন জ্যেষ্ঠ আইপিএস আধিকারিক এবং প্রশাসনিক শাখার প্রধান ও পদাধিকারবলে সদস্য-সচিব হিসেবে একজন আইএএস বা ডব্লিউবিসিএস আধিকারিক। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গ রাজস্ব পরিষেবার (ডব্লিউবিআরএস) একজন আধিকারিক কারিগরি বিশেষজ্ঞ হিসেবে কমিশনকে সহায়তা করবেন। তদন্তের প্রয়োজনে রাজ্য সরকারের অনুমোদন নিয়ে আরও বিশেষজ্ঞ বা সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষমতাও কমিশনকে দেওয়া হয়েছে।

কমিশনের তদন্তের পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। গেজেটে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, অ্যাম্ফান পুনর্বাসন, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা (পিএমএওয়াই), ১০০ দিনের কাজ, মিড-ডে মিল-সহ বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে ঘুষ, তোলাবাজি, তহবিলের অপব্যবহার এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করা হবে। তবে এখানেই তদন্তের সীমা শেষ নয়।

কমিশন প্রশাসনিক রীতি ও আইনসম্মত প্রক্রিয়া লঙ্ঘন, ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম, সরকারি অর্থের তছরুপ, বেআইনি সম্পত্তি অর্জন, মিথ্যা মামলা রুজু, গ্রেফতারের ক্ষমতার অপব্যবহার, বেআইনি নির্মাণে প্রশাসনিক মদত, সরকারি চাকরিতে অনিয়ম ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে দুর্নীতি—এসব বিষয়ও তদন্ত করতে পারবে।

শিক্ষাক্ষেত্রেও কমিশনের ক্ষমতা বিস্তৃত। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের আওতায় থাকবে। একইভাবে রাজ্যের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান এবং চিকিৎসা শিক্ষায় ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতিও কমিশনের অনুসন্ধানের বিষয় হবে। সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি তাঁদের কাজে প্ররোচনা, সহযোগিতা বা মদত দিয়েছেন—এমন ব্যক্তিদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।

তদন্তের স্বার্থে কমিশনকে দেওয়ানি আদালতের সমপর্যায়ের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ কমিশন যে কোনও ব্যক্তিকে সমন জারি করতে, শপথ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে, সরকারি নথি তলব করতে, হলফনামার ভিত্তিতে সাক্ষ্য গ্রহণ করতে এবং প্রয়োজনীয় সাক্ষী বা নথি হাজির করার নির্দেশ দিতে পারবে। সাধারণ মানুষের কাছ থেকেও অভিযোগ গ্রহণ করবে কমিশন এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করবে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা হল, তদন্তে কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ মিললে কমিশন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্তৃপক্ষকে দ্রুত এফআইআর দায়েরের সুপারিশ করতে পারবে। তবে গেজেটে একই সঙ্গে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, কমিশন কোনও আইনসিদ্ধ তদন্তকারী সংস্থার বিকল্প নয়। অর্থাৎ এটি নিজে ফৌজদারি তদন্ত বা গ্রেফতারি অভিযান চালাবে না; প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করবে।

কমিশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাও গেজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যে সব অভিযোগ ইতিমধ্যেই অন্য কোনও আইনসিদ্ধ কমিশনের বিবেচনাধীন অথবা কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তদন্তাধীন, সেগুলি এই কমিশন বিবেচনা করবে না।

এর ফলে বর্তমানে সিবিআইয়ের তদন্তাধীন বেশ কয়েকটি বহুল আলোচিত মামলা কার্যত কমিশনের আওতার বাইরে থাকবে। এর মধ্যে রয়েছে স্কুল সার্ভিস কমিশন (এসএসসি) নিয়োগ দুর্নীতি, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, জিটিএ শিক্ষক নিয়োগ মামলা, গরু পাচার, কয়লা পাচার, শারদা ও রোজ ভ্যালি চিটফান্ডের মতো তদন্ত। ফলে কমিশনের কাজ মূলত এমন অভিযোগগুলির উপরই কেন্দ্রীভূত হবে, যেগুলি এখনও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার হাতে যায়নি।

গেজেট অনুযায়ী, কমিশন নিয়মিত অন্তর্বর্তী রিপোর্ট এবং চূড়ান্ত সুপারিশ রাজ্য সরকারের কাছে জমা দেবে। আর্থিক অনিয়মে আত্মসাৎ হওয়া সরকারি অর্থ উদ্ধারের জন্য প্রয়োজনে সম্পত্তি সংযুক্ত করার সুপারিশও কমিশন করতে পারবে, যদি তাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য থাকে যে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে।

রাজনৈতিক দিক থেকেও এই কমিশন তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তদন্তের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০১১ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত—অর্থাৎ তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের সম্পূর্ণ শাসনকালকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, সরকারি প্রকল্প ও নিয়োগ-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গত দেড় দশকের সিদ্ধান্ত, আর্থিক লেনদেন এবং প্রশাসনিক ভূমিকা নতুন করে পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কমিশনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিস্তৃত অনুসন্ধানী ক্ষমতা। তবে একই সঙ্গে তার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতাও গেজেটেই নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার হাতে থাকা মামলা বা অন্য কোনও আইনসিদ্ধ কমিশনের তদন্তাধীন বিষয়ে কমিশন হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। ফলে বহু আলোচিত দুর্নীতির মামলার পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত কিন্তু প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বহু অভিযোগই কমিশনের তদন্তের মূল ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

এখন নজর থাকবে, কমিশন কীভাবে অভিযোগ গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করে, কত দ্রুত তদন্ত এগোয় এবং তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রশাসনিক বা আইনি স্তরে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়।