Home SportsFIFA 2026 শুধু আবেগ নয়, নরওয়ের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের আসল পরীক্ষা এবার কৌশল ও সূক্ষ্মতার

শুধু আবেগ নয়, নরওয়ের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের আসল পরীক্ষা এবার কৌশল ও সূক্ষ্মতার

Authored By নির্ণয় চট্টোপাধ্যায়
30 views 7 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস:

  • আজটেকায় মেক্সিকোকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে ইংল্যান্ড শিবির
  • টমাস টুখেলের নেতৃত্বে দলে তৈরি হয়েছে অসাধারণ ঐক্য ও ইতিবাচক পরিবেশ
  • তবে নরওয়ের বিরুদ্ধে জিততে শুধু উদ্দীপনা নয়, দরকার নিখুঁত রক্ষণ ও কৌশল
  • হলান্ড, ওডেগার্ড ও নুসাদের মোকাবিলায় ইংল্যান্ডকে ভুলের সুযোগ দেওয়া চলবে না
  • ফ্লোরিডার তীব্র গরমও ম্যাচের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে

মেক্সিকোর বিরুদ্ধে আজটেকা স্টেডিয়ামের রোমাঞ্চকর জয়ের পর ইংল্যান্ড শিবিরে এখন আত্মবিশ্বাস আকাশছোঁয়া। ড্রেসিংরুমে ফুটবলারদের উচ্ছ্বাস, টমাস টুখেলের সঙ্গে তাদের সহজ সম্পর্ক এবং পুরো দলের মধ্যে তৈরি হওয়া অসাধারণ বন্ধন—সব মিলিয়ে যেন নতুন এক ইংল্যান্ডকে দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, এই দলটি শুধু ফুটবল খেলছে না, একে অপরের জন্য লড়ছেও।

ড্রেসিংরুমে প্রকাশিত একটি ভিডিও ইতিমধ্যেই কোটি কোটি মানুষের নজর কেড়েছে। সেখানে দেখা যায়, ডেকলান রাইস ও জন স্টোনস মজা করে টুখেলকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছেন। স্টোনস কাঁধে চোট পাওয়ার অভিনয় করছেন, আর রাইস সেটিকে বাস্তব বলে তুলে ধরছেন। কয়েক মুহূর্ত পরে সত্যিটা সামনে আসতেই টুখেল হেসে স্টোনসকে জড়িয়ে ধরেন। ভিডিওটি শুধু একটি কৌতুক নয়, বরং পুরো দলের মধ্যে গড়ে ওঠা বিশ্বাস ও আনন্দের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

এই দৃশ্যের কেন্দ্রে আসলে ছিলেন টুখেল নিজেই। তাঁর অদ্ভুত প্রাণচাঞ্চল্য, খেলোয়াড়দের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত সম্পর্ক এবং প্রতিটি মুহূর্তে উপস্থিত থাকার ক্ষমতা ইংল্যান্ডের সমর্থকদের মুগ্ধ করেছে। সামাজিক মাধ্যমে অসংখ্য সমর্থক লিখেছেন, “তিনি আমাদেরই একজন”, “তিনি ঠিক বুঝতে পারেন এই দলের প্রয়োজন কী”, এমনকি অনেকে সরাসরি লিখেছেন, “আমরা টুখেলকে ভালোবেসে ফেলেছি।”

তবে ফুটবল কেবল আবেগের খেলা নয়। টুর্নামেন্ট যত এগোয়, প্রতিপক্ষও তত শক্তিশালী হয়। আর সেই কারণেই কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচটি সম্পূর্ণ অন্য ধরনের পরীক্ষা হতে চলেছে।

আবেগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শৃঙ্খলা

টমাস টুখেলকে অনেকেই শুধুমাত্র কঠোর কৌশলবিদ হিসেবে চেনেন। কিন্তু এই বিশ্বকাপে তিনি দেখিয়েছেন, ফুটবলে আবেগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দলের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, পারস্পরিক আস্থা এবং ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করাও একজন কোচের বড় দায়িত্ব।

ইংল্যান্ডের এই দলটি কাগজে-কলমে হয়তো সবচেয়ে প্রতিভাবান নয়। মাঝেমধ্যে রক্ষণে ভুল হয়েছে, আক্রমণে ছন্দ হারিয়েছে, আবার ম্যাচের মধ্যে ফিরে এসে জয়ও ছিনিয়ে এনেছে। এই প্রত্যাবর্তনের শক্তি এসেছে মূলত মানসিক দৃঢ়তা থেকে।

টুখেল বুঝেছিলেন, শুধু প্রথম একাদশ নয়, পুরো স্কোয়াডকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সেই কারণেই বদলি খেলোয়াড়দের নির্বাচন নিয়েও তিনি অনেক ভেবেছেন। এখন দেখা যাচ্ছে, বেঞ্চে বসে থাকা ফুটবলাররাও দলের সাফল্যে সমানভাবে নিজেদের জড়িয়ে রেখেছেন। মাঠে নামুক বা না-নামুক, প্রত্যেকেই যেন এই অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

হ্যারি কেন ও জুড বেলিংহ্যামের মতো বড় তারকারাও নিজেদের সেরা ফুটবল খেলতে পারছেন, কারণ দলের ভেতরে কোনও বিভাজন নেই। সবাই জানেন তাঁদের ভূমিকা কী।

টুখেলের ব্যক্তিত্বই বড় অস্ত্র

টুখেলের ব্যক্তিত্ব নিয়েও ইংল্যান্ডে এখন ব্যাপক আলোচনা চলছে। কখনও তাঁর পোশাক, কখনও তাঁর ঘড়ি, কখনও আবার সাইডলাইনে দাঁড়ানোর ভঙ্গি—সবই আলোচনার বিষয়।

চেলসি, বরুসিয়া ডর্টমুন্ড কিংবা প্যারিস সাঁ জারমাঁয় যাঁরা তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন, তাঁরা জানেন, টুখেলের এই উপস্থিতি কোনও অভিনয় নয়। তিনি স্বভাবগতভাবেই অত্যন্ত তীব্র, প্রাণবন্ত এবং আত্মবিশ্বাসী।

তিনি কখনও কখনও কঠোরও হন। প্রকাশ্যে খেলোয়াড়দের ভুল ধরতেও পিছপা হন না। কিন্তু সেই কঠোরতার মধ্যেও স্পষ্টতা থাকে। ফুটবলাররা জানেন, তিনি যা বলছেন, দলের ভালোর জন্যই বলছেন। সেই কারণেই তাঁরা তাঁকে বিশ্বাস করেন।

টুখেল নিজে বড় ফুটবলার ছিলেন না। অল্প বয়সেই খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হয়ে যায়। পরে বারে কাজ করেছেন, মডেলিং করেছেন, তারপর কোচিংয়ে এসেছেন। কিন্তু বড় ফুটবলার না হয়েও তিনি বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের সম্মান অর্জন করেছেন। কারণ তাঁর ফুটবল জ্ঞান, প্রস্তুতি এবং নেতৃত্বের ক্ষমতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই।

এবার সামনে আরও কঠিন প্রতিপক্ষ

তবে এতদিন ইংল্যান্ড যে প্রতিপক্ষগুলোর বিরুদ্ধে খেলেছে, তাদের কেউই নরওয়ের মতো ভারসাম্যপূর্ণ নয়।

নরওয়ের দলে আছেন বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলদাতা আর্লিং হলান্ড। মাঝমাঠে রয়েছেন মার্টিন ওডেগার্ড, যিনি গত কয়েক বছরে বিশ্বের অন্যতম সেরা প্লেমেকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পাশাপাশি আছেন আন্তোনিও নুসার মতো দ্রুতগতির উইঙ্গার, যিনি যেকোনও রক্ষণকে বিপদে ফেলতে পারেন।

এই দলটি ধৈর্য ধরে আক্রমণ গড়ে তোলে, আবার সুযোগ পেলেই উচ্চচাপে প্রতিপক্ষকে ভুল করাতে বাধ্য করে।আর এখানেই ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় সমস্যা।

ইংল্যান্ডের রক্ষণে এখনও অনেক ফাঁক

এই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড যে গোলগুলো খেয়েছে, তার বেশিরভাগই এসেছে নিজেদের ভুল থেকে।বিশেষ করে কর্নার ও ফ্রি-কিকের মতো স্থির পরিস্থিতিতে তাদের রক্ষণ বারবার সমস্যায় পড়েছে। মেক্সিকোর বিরুদ্ধেও দুটি গোলই এসেছে রক্ষণে সমন্বয়ের অভাব থেকে। গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডকে একাধিক অসাধারণ সেভ করতে হয়েছে।

অন্যদিকে নরওয়ে ঠিক এই ধরনের সুযোগগুলোই কাজে লাগাতে ওস্তাদ। উইং থেকে ক্রস, বক্সে শারীরিক লড়াই এবং উচ্চচাপে বল কেড়ে নেওয়া—এসবই তাদের প্রধান অস্ত্র।

ইংল্যান্ড যদি একই ধরনের ভুল আবার করে, তাহলে হলান্ডের মতো স্ট্রাইকার দ্বিতীয় সুযোগ দেবেন না।

রাইট-ব্যাকের ধাঁধা

ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় নির্বাচনী সমস্যা রাইট-ব্যাক পজিশনে।রিস জেমস পুরোপুরি ফিট না হলে সম্ভবত এজরি কনসাকে ওই জায়গায় খেলাতে হবে। তিনি শারীরিকভাবে শক্তিশালী হলেও স্বাভাবিক রাইট-ব্যাক নন। ফলে নুসার গতির বিরুদ্ধে তিনি কতটা সফল হবেন, সেটাই বড় প্রশ্ন।

অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করছেন, হলান্ডকে আটকাতে টুখেল হয়তো ম্যানচেস্টার সিটির তিন ডিফেন্ডারকে একসঙ্গে ব্যবহার করতে পারেন। তাঁরা প্রতিদিন অনুশীলনে হলান্ডের বিরুদ্ধে খেলেন। তবে সেটি সুবিধা হবে, নাকি হলান্ড তাঁদের দুর্বলতা আরও ভালো জানেন—সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে মাঠেই।

শুধু প্রত্যাবর্তনের ওপর ভরসা করা যাবে না

মেক্সিকোর বিরুদ্ধে ইংল্যান্ড পিছিয়ে পড়েও জিতেছিল। কিন্তু প্রতিটি ম্যাচে একইভাবে ফিরে আসা সম্ভব নয়।নরওয়ে এমন দল নয় যারা সুযোগ নষ্ট করবে। তারা এগিয়ে গেলে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতেও জানে।

সুতরাং শুরু থেকেই ইংল্যান্ডকে সংগঠিত থাকতে হবে। বল হারানোর পর দ্রুত রক্ষণে ফিরতে হবে। সেট-পিসে ভুল করা চলবে না। মাঝমাঠে ওডেগার্ডকে সময় দেওয়া যাবে না। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, হলান্ডকে যতটা সম্ভব বলের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখতে হবে।

ফ্লোরিডার গরমও বড় প্রতিপক্ষ

মিয়ামির আবহাওয়াও ম্যাচের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।এবার পর্যন্ত ইংল্যান্ড তুলনামূলক আরামদায়ক পরিবেশে খেলেছে। আটলান্টা ও ডালাসের আবদ্ধ স্টেডিয়াম, নিউইয়র্কের আর্দ্র আবহাওয়া কিংবা মেক্সিকো সিটির ঠান্ডা পরিবেশ—সবই ছিল আলাদা।কিন্তু মিয়ামির বিকেলের তীব্র গরম সম্পূর্ণ ভিন্ন চ্যালেঞ্জ।

নরওয়ে অনেক দিন ধরেই ফ্লোরিডায় রয়েছে। তারা এই আবহাওয়ার সঙ্গে অনেকটাই মানিয়ে নিয়েছে। উপরন্তু, তাদের আগের ম্যাচগুলোও ইংল্যান্ডের তুলনায় কম ক্লান্তিকর ছিল।এই পরিস্থিতিতে ইংল্যান্ডের পক্ষে আবারও শেষ মুহূর্তে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করা সহজ হবে না।

এখনই আসল পরীক্ষা

আজটেকার জয় নিঃসন্দেহে ইংল্যান্ডকে নতুন আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। টমাস টুখেল প্রমাণ করেছেন, তিনি শুধু কৌশলবিদ নন, একজন দক্ষ দলগঠকও।কিন্তু বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল আর আগের ম্যাচগুলোর মতো নয়।

এখানে আবেগ, ঐক্য ও আত্মবিশ্বাস অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেয় সূক্ষ্ম কৌশল, রক্ষণে শৃঙ্খলা এবং ছোট ছোট সিদ্ধান্ত।

ইংল্যান্ড যদি নিজেদের রক্ষণকে আরও সংগঠিত করতে পারে, সেট-পিসে ভুল কমায় এবং হলান্ডকে বিচ্ছিন্ন রাখতে সক্ষম হয়, তাহলে সেমিফাইনালের পথ খুলে যেতে পারে।

কিন্তু যদি তারা শুধু উদ্দীপনা আর প্রত্যাবর্তনের শক্তির ওপর ভরসা করে, তাহলে নরওয়ে সেই ভুলের নির্মম মূল্য আদায় করতে একটুও দেরি করবে না।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles