হাইলাইটস:
- প্রতিবাদ করার অধিকারকে গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি বলে মন্তব্য বম্বে হাই কোর্টের।
- সরকারবিরোধী স্লোগান দেওয়া বা নীতির বিরোধিতা করা নির্বাসন (Externment) বা দমনমূলক ব্যবস্থার কারণ হতে পারে না বলে পর্যবেক্ষণ।
- পুলিশের উদ্দেশে আদালতের কড়া বার্তা— তারা মুখ্যমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর নয়, জনগণের সেবক।
- এক রাজনৈতিক কর্মীর বিরুদ্ধে জারি হওয়া নির্বাসন আদেশ বাতিল করে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ বিচারপতির।
বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের গণতন্ত্রে ভিন্নমত প্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করল বম্বে হাই কোর্ট। এক রাজনৈতিক কর্মীর বিরুদ্ধে জারি হওয়া নির্বাসন আদেশ (একটি নির্দিষ্ট এলাকা থেকে জোর করে সরিয়ে দেওয়ার প্রশাসনিক নির্দেশ) বাতিল করতে গিয়ে আদালত প্রশ্ন তোলে, “সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নাগরিকরা প্রতিবাদ করতে পারবেন না কেন? মামলা দিয়ে কি তাঁদের সরকারের দাস বানানো হচ্ছে?”
বিচারপতি মাধব জামদার শুনানির সময় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করা এবং সরকারের সমালোচনা করা সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার। শুধুমাত্র সরকারবিরোধী স্লোগান দেওয়া বা কোনও নীতির বিরোধিতা করার জন্য কাউকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করার মতো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
মামলাটি ছিল এক রাজনৈতিক দলের পদাধিকারীকে ঘিরে। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছিল, যার অধিকাংশই বিভিন্ন সরকারি নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও স্লোগান দেওয়াকে কেন্দ্র করে। সেই মামলাগুলির ভিত্তিতে প্রশাসন তাঁকে এক বছরের জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকা থেকে নির্বাসিত করার নির্দেশ দেয়। আদালত সেই সিদ্ধান্তকে আইনের চোখে টেকসই নয় বলে রায় দেয়।
শুনানিতে বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন, “কেউ যদি ‘সরকার মুর্দাবাদ’ বা কোনও নেতার বিরুদ্ধে স্লোগান দেন, তাতে এমন কী অপরাধ হল যে তাঁকে এলাকা ছাড়া করতে হবে? নাগরিকদের কি সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার অধিকার নেই?” তাঁর মতে, গণতন্ত্রে সরকারের সমালোচনা অপরাধ নয়; বরং তা রাজনৈতিক স্বাধীনতারই অংশ।
আদালত পুলিশের ভূমিকাও কঠোর ভাষায় স্মরণ করিয়ে দেয়। বিচারপতি বলেন, পুলিশ কোনও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যক্তিগত বাহিনী নয়। তারা জনগণের করের টাকায় পরিচালিত একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং তাদের প্রথম দায়িত্ব আইন রক্ষা করা, কোনও সরকার বা শাসক দলের সমালোচনাকে দমন করা নয়।
আদালতের মৌখিক পর্যবেক্ষণে আরও উঠে আসে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিবাদ কর্মসূচির বিরুদ্ধে ঘন ঘন ফৌজদারি মামলা দায়েরের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ। বিচারপতি মন্তব্য করেন, বিভিন্ন ঘটনায় মানুষ প্রতিবাদ করলেই যদি মামলা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক অধিকার কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়বে। তাঁর প্রশ্ন ছিল, “মানুষ প্রতিবাদ করলেই মামলা দেবেন? এভাবে কি নাগরিকদের সরকারের দাস বানানো হচ্ছে?”
রায়ে আদালত স্পষ্ট করে দেয়, নির্বাসনের মতো কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা কেবল তখনই গ্রহণ করা যায়, যখন কোনও ব্যক্তির উপস্থিতি জনশৃঙ্খলার জন্য প্রকৃত ও গুরুতর বিপদ সৃষ্টি করে। কেবল রাজনৈতিক মতপ্রকাশ বা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশগ্রহণ সেই মানদণ্ড পূরণ করে না। তাই এই ধরনের ক্ষমতা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রয়োগ করতে হবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতে প্রতিবাদ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমা নিয়ে বিচারব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আদালত আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে, সংবিধান নাগরিককে শুধু ভোট দেওয়ার অধিকার দেয় না; সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা, প্রশ্ন তোলা এবং শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকারও সমানভাবে সুরক্ষিত করে।