হাইলাইটস:

  • সুইজারল্যান্ডে মার্কিন-ইরান উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বড়সড় উত্তেজনা।
  • ডোনাল্ড ট্রাম্পের বোমা হামলা ও ‘অপহরণ’-সদৃশ হুমকির প্রতিবাদে বৈঠক থেকে বেরিয়ে যায় ইরানের প্রতিনিধি দল।
  • মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতার ও পাকিস্তান আলোচনাকে সচল রাখার চেষ্টা করছে।
  • হরমুজ প্রণালী, লেবানন যুদ্ধবিরতি, তেল নিষেধাজ্ঞা ও পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছে।
  • ট্রাম্পের কড়া অবস্থানের বিপরীতে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তুললেন সম্পর্ক পুনর্গঠনের বার্তা।

বাংলাস্ফিয়ার: সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে অনুষ্ঠিত মার্কিন-ইরান আলোচনার প্রথম দিনই নাটকীয় মোড় নিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে একের পর এক কড়া হুমকি দেওয়ার পর ক্ষুব্ধ হয়ে বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে যায় ইরানের প্রতিনিধি দল। তবে মধ্যস্থতাকারী কাতার ও পাকিস্তানের উদ্যোগে আলোচনা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েনি; বরং রাতভর পরোক্ষ যোগাযোগের মাধ্যমে আলোচনাকে সচল রাখার চেষ্টা চলে।

ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ট্রাম্পের “অপমানজনক বার্তা” প্রকাশের পর আলোচনা “কঠিন পর্যায়ে” প্রবেশ করে। ইরানি প্রতিনিধিরা প্রথমে কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং পরে মূল আলোচনাস্থল ত্যাগ করেন।

অন্যদিকে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষের আগ্রহ রয়েছে। আলোচনার প্রধান বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালী খোলা রাখা, দক্ষিণ লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ খোঁজা।

বৈঠক ভেঙে যাওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কিছু অগ্রগতি হয়। দুই পক্ষ একটি খসড়া সমঝোতায় পৌঁছায়, যার মাধ্যমে আমেরিকা ইরানের তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার জন্য বিশেষ ছাড়পত্র বা ওয়েভার জারি করতে পারে। তেহরানের দাবি, বিদেশি ব্যাংকগুলিতে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করার বিষয়েও ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে।

গত সপ্তাহে স্বাক্ষরিত মার্কিন-ইরান সমঝোতায় হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে উত্তেজনা প্রশমনের কথা বলা হয়েছিল। সেই চুক্তি অনুযায়ী ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হওয়ার কথা। কিন্তু নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে ট্রাম্পের বক্তব্য।

সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প লেখেন, “ইরানকে অবিলম্বে লেবাননে হিজবুল্লাকে থামাতে হবে। তা না হলে আমরা আবার ইরানে হামলা শুরু করব। সেই আঘাত হবে আগের চেয়ে অনেক ভয়াবহ।

ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, “প্রয়োজনে আমরা হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেব। তারা যদি চুক্তি না করে, তাহলে আমরা সেখান দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ থেকে টোল আদায় করব।”

সবচেয়ে বিতর্কিত মন্তব্যটি আসে যখন তিনি ইরানি আলোচকদের উদ্দেশে বলেন, “তোমরা যদি প্রণালী বন্ধ রাখো, তাহলে তোমাদের দেশই থাকবে না। তোমরা নিজেদের দেশেও ফিরতে পারবে না।”

এই মন্তব্যকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রতি সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখেছে ইরান। তারা কাতার ও পাকিস্তানের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়ে ট্রাম্পের “ধমক ও দাদাগিরি” বন্ধ করার দাবি তোলে।

ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, “আমেরিকার হুমকির কোনো মূল্য নেই। যদি এসব হুমকি কার্যকর হতো, তাহলে আজ তারা এই অবস্থায় পৌঁছত না। আমরা এসব কথাকে গুরুত্ব দিই না।”

তবে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির কট্টরপন্থী মহল দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর অবিশ্বাস প্রকাশ করে আসছে। ফলে আলোচকরা বৈঠক থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের কঠোর অবস্থান প্রদর্শন করতে বাধ্য হন।

ট্রাম্পের অবস্থানের সঙ্গে স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যায় ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বক্তব্যে। ভ্যান্স বলেন, “প্রেসিডেন্ট আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু করার চেষ্টা করতে। যদি ইরানের নেতৃত্ব আঞ্চলিক অস্থিরতা সৃষ্টির নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরমাণু অস্ত্রের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে, তাহলে আমরা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আমূল বদলে দিতে প্রস্তুত।”

তিনি আরও বলেন, “এখন প্রশ্ন হলো—আমরা কি সত্যিই একটি নতুন অধ্যায় শুরু করতে পারব?”

হরমুজ প্রণালী নিয়েও দুই পক্ষের অবস্থান ভিন্ন। ইরান অভিযোগ করছে, লেবাননে ইজরায়েলের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকায় তারা আবারও প্রণালীতে অবরোধ জোরদার করেছে। তেহরানের দাবি, গত সপ্তাহের সমঝোতা অনুসারে সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতির কথা বলা হলেও ইজরায়েল তা লঙ্ঘন করছে।

অন্যদিকে মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট দাবি করেছেন, ইরানের অবরোধ কার্যত অকার্যকর। তাঁর মতে, গত দুই দিনে ১২০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে।

মার্কিন রিপাবলিকান সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম আরও একধাপ এগিয়ে সতর্ক করে বলেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে আমেরিকা শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে।

এদিকে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে দক্ষিণ লেবাননের নিরাপত্তা বাফার জোন থেকে ইজরায়েল এখনই সরে যাবে না। তিনি পুনরায় ঘোষণা করেছেন যে ইরানকে কখনও পরমাণু অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না।

সব মিলিয়ে সুইজারল্যান্ডের আলোচনা এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও ইরানের জব্দ সম্পদ মুক্ত করার সম্ভাবনা, অন্যদিকে ট্রাম্পের আগ্রাসী ভাষা ও লেবানন প্রশ্নে তীব্র মতপার্থক্য। ফলে আলোচনার ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত। তবে উভয় পক্ষই আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করতে রাজি নয়, যা সংকটের মধ্যেও কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাকে জীবিত রেখেছে।

ইরানের ক্ষমতার শীর্ষে টানাপোড়েন? ফাঁস হওয়া চিঠি ঘিরে নতুন বিতর্ক