বাংলাস্ফিয়ার: ইরানের শাসকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরে মতপার্থক্য ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ইঙ্গিত মিলেছে এক বিস্ফোরক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে। আমেরিকার সঙ্গে আগের দফার আলোচনায় যুক্ত থাকা মাহমুদ নাবাভিয়ান, যিনি বর্তমানে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের উপ-চেয়ারম্যান—রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিতে (IRIB) দাবি করেছেন যে তিনি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ খামেনির গোপন চিঠিপত্র দেখেছেন। সেই চিঠিতে নাকি বলা হয়েছিল, আলোচকরা তাদের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছেন এবং আলোচনার বৈধতার শর্ত লঙ্ঘন করেছেন।
নাবাভিয়ানের সাক্ষাৎকার সম্প্রচারের মাঝপথেই হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, এক ঘণ্টার মধ্যেই সম্প্রচারের সংরক্ষিত সংস্করণ মুছে ফেলা হয় এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচার সংস্থার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পদত্যাগ করেন। পরে সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম নাবাভিয়ানের বক্তব্যকে “আইনভঙ্গের প্রমাণ” বলে উল্লেখ করে এবং তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
বর্তমান সুইজারল্যান্ড আলোচনায় ইরানের প্রধান আলোচক ও সংসদ-স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ-এর ঘনিষ্ঠ মহলও তথ্যফাঁসকারীর পরিচয় প্রকাশের দাবি তোলে। অন্যদিকে সংস্কারপন্থী ও মধ্যপন্থীরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে আইআরআইবি কার্যত কট্টরপন্থী ‘পায়দারি’ বা ‘স্থিতিশীলতা ফ্রন্ট’-এর মুখপাত্র হিসেবে কাজ করে, আর নাবাভিয়ান নিজেও সেই শিবিরের সমর্থক।
এই ঘটনায় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি আলোচনাপ্রক্রিয়ায় যতটা সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছেন বলে ধারণা তৈরি হয়েছে। নাবাভিয়ানের দাবি অনুযায়ী, খামেনি আলোচকদের জন্য ১১টি শর্ত নির্ধারণ করেছিলেন। এর মধ্যে ছিল আমেরিকার কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার বজায় রাখা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর পূর্ণ সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী নিয়ে খামেনির অবস্থান ছিল অত্যন্ত কঠোর। নাবাভিয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন যে প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে ফি আদায় করতে হবে, শত্রুপক্ষের জাহাজের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে এবং এই অর্থ জনগণ, শহিদ পরিবার ও যুদ্ধাহতদের কল্যাণে ব্যয় করতে হবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ পুরোপুরি খুলে দেওয়া উচিত নয় বলেও তিনি মত দিয়েছিলেন।
নাবাভিয়ান আরও দাবি করেন, ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আগের দফার আলোচনার পর খামেনি একটি বার্তায় লিখেছিলেন যে আলোচনায় যা সম্মত হয়েছে, তা তাঁর অনুমোদিত কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর ভাষায়, “যা হওয়ার কথা ছিল, বাস্তবে তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু হয়েছে, ফলে আলোচনা বন্ধ করা উচিত।”
তবে ইরানের আলোচক দলের মুখপাত্র এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, নাবাভিয়ান পুরোনো ও বিকৃত তথ্য তুলে ধরছেন এবং বর্তমান বাস্তবতা সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছেন।
সাক্ষাৎকার সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নাবাভিয়ান নিজের টেলিগ্রাম চ্যানেলে অবস্থান আরও স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, কোনো গোপন নথি প্রকাশ করেননি; বরং জনগণকে সত্য জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, আলোচনার আগে চারটি মৌলিক শর্ত পূরণ হওয়ার কথা ছিল—লেবানন থেকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার, আমেরিকার হাতে থাকা ইরানের অর্থ ফেরত দেওয়া, অবরোধ শিথিল করা এবং সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এসব শর্ত পূরণ না হওয়া সত্ত্বেও কেন জেনেভায় আলোচনার জন্য প্রতিনিধিদল পাঠানো হলো।
নাবাভিয়ানের এই বক্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে এখনো গভীর মতবিরোধ বিদ্যমান। একদিকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও কূটনৈতিক শিবির আন্তর্জাতিক সমঝোতার পথে এগোতে চাইছে, অন্যদিকে কট্টরপন্থীরা মনে করছে আলোচকরা সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশ অমান্য করেছেন। ফলে সুইজারল্যান্ডে চলমান আমেরিকা-ইরান আলোচনা যতটা আন্তর্জাতিক কূটনীতির বিষয়, ততটাই হয়ে উঠেছে তেহরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ের প্রতিফলন।