বাংলাস্ফিয়ার: পাঞ্জাবের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিয়ান্ত সিং-কে হত্যার মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জগতার সিংহ হাওয়ারা এক সময় রাজ্যের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলির কাছে ছিলেন প্রায় অস্পৃশ্য। অথচ তিন দশক পরে সেই হাওয়ারাকে সাময়িক মুক্তি দেওয়ার দাবিতে শাসক আম আদমি পার্টি থেকে বিজেপি, কংগ্রেস ও অকালি রাজনীতির বিভিন্ন শিবির—প্রায় সকলেই সুর নরম করেছে। মানবিকতার যুক্তি সামনে রাখা হলেও ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই ঐকমত্য পাঞ্জাবের বদলে যাওয়া রাজনৈতিক মনোভাবেরই ইঙ্গিত।

১৯৯৫ সালের ৩১ অগস্ট চণ্ডীগড়ে পাঞ্জাব সচিবালয়ের সামনে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে মুখ্যমন্ত্রী বিয়ান্ত সিং-সহ ১৭ জন নিহত হন। সেই হত্যার ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার অপরাধে ২০০৭ সালে হাওয়ারাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় বিশেষ আদালত। ২০১০ সালে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট তাঁর সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাবাসে পরিণত করে। বর্তমানে দিল্লির মণ্ডোলি কারাগারে বন্দি হাওয়ারা ২০০৪ সালে চণ্ডীগড়ের বুড়াইল জেল থেকে সুড়ঙ্গ কেটে পালিয়েছিলেন; পরে তাঁকে আবার গ্রেফতার করা হয়। এই ইতিহাসের কারণেই তাঁর সাময়িক মুক্তির আবেদন বরাবর নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়েছে।

পরিবর্তনের সূচনা হাওয়ারার ৮১ বছর বয়সি অসুস্থ মাকে কেন্দ্র করে। মায়ের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে দেখাশোনার জন্য চার সপ্তাহের সাময়িক মুক্তি চেয়েছিলেন হাওয়ারা। জুলাইয়ে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আবেদনটির নিষ্পত্তি করতে বলে। আদালত জানায়, চণ্ডীগড় প্রশাসনের মতামত নেওয়ার পরে মণ্ডোলি কারাগারের অধীক্ষকই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে দিল্লির কারা-নিয়মে সন্ত্রাসবাদ, রাষ্ট্রদ্রোহ বা জেল থেকে পালানোর ঘটনায় যুক্ত বন্দিদের মুক্তির ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে।

তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, মার্চে হাওয়ারার আবেদন খারিজ করার সুপারিশ করেছিল ভগবন্ত মান সরকার। পাঁচ মাসের মধ্যেই অবস্থান সম্পূর্ণ বদলে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যপাল গুলাবচাঁদ কাটারিয়াকে চিঠি দিয়ে দশ দিনের সাময়িক মুক্তির অনুরোধ করেন। পরে রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করে মান জানান, হাওয়ারা বাইরে থাকাকালীন আইনশৃঙ্খলার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেবে তাঁর সরকার। তাঁর যুক্তি, ৩১ বছর পরে এক অসুস্থ মা যাতে ছেলেকে দেখতে পান, সেটি দলীয় রাজনীতির নয়, মানবিকতার প্রশ্ন। রাজ্যপালও আবেদনটি মানবিক কারণে বিবেচনার সুপারিশ করেছেন।

সবচেয়ে বিস্ময়কর সমর্থন এসেছে বিজেপি নেতা রবনীত সিংহ বিট্টুর কাছ থেকে। তিনি নিহত বিয়ান্ত সিং-এর নাতি। অতীতে খালিস্তানপন্থী উগ্রবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত বিট্টু বলেছেন, তাঁর দাদুর হত্যার বিচার এবং হাওয়ারার অসুস্থ মায়ের প্রতি সহানুভূতি—দুটি পৃথক বিষয়। আইন তার পথে চলবে, কিন্তু এক বৃদ্ধাকে মৃত্যুর আগে ছেলের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেওয়া উচিত।

অকালি শিবির দীর্ঘদিন ধরেই হাওয়ারা-সহ সাজা পূর্ণ করা ‘বন্দি সিংহ’দের মুক্তির দাবিতে সরব। কংগ্রেসের একাংশও সাময়িক মুক্তির বিরোধিতা করেনি। ফলে যে ব্যক্তির নাম এক সময় পাঞ্জাবের রক্তাক্ত বিচ্ছিন্নতাবাদী পর্বের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য ভাবে যুক্ত ছিল, তাঁকে ঘিরে এখন রাজনৈতিক দলগুলির ভাষায় ‘জঙ্গি’ বা ‘ঘাতক’-এর পরিবর্তে ‘দীর্ঘদিনের বন্দি’ এবং ‘অসুস্থ মায়ের ছেলে’ পরিচয়টি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

এর পিছনে মানবিকতা থাকলেও নির্বাচনী হিসাব অস্বীকার করা কঠিন। অকালি দল তার হারানো পন্থিক ভোটভিত্তি ফিরে পেতে চাইছে। অমৃতপাল সিংহের উত্থান এবং বিভিন্ন উগ্রপন্থী শিখ গোষ্ঠীর রাজনৈতিক সক্রিয়তা সেই প্রতিযোগিতা আরও বাড়িয়েছে। আম আদমি পার্টি তাই ধর্মীয় আবেগের ক্ষেত্রটি অকালিদের হাতে ছেড়ে দিতে চাইছে না। বিজেপিও শিখ-বিরোধী কঠোরতার ভাবমূর্তি কাটিয়ে পাঞ্জাবে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে আগ্রহী। বিট্টুর সমর্থন সেই কৌশলকে বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়েছে।

তবে হাওয়ারা নিজেই এক বা দু’দিনের সাময়িক মুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর বক্তব্য, নিয়মমাফিক দীর্ঘতর সাময়িক মুক্তি না দিয়ে মাত্র দু’দিন বাইরে যাওয়ার অনুমতি ব্যবস্থার পরিহাস।

হাওয়ারার মুক্তি শেষ পর্যন্ত মঞ্জুর হোক বা না-হোক, বিতর্কটি একটি বড় পরিবর্তন স্পষ্ট করেছে—নব্বইয়ের দশকের সন্ত্রাসের স্মৃতি পাঞ্জাবের রাজনীতিতে এখনও জীবন্ত, কিন্তু তিন দশকের কারাবাস, প্রজন্মবদল এবং নির্বাচনী প্রতিযোগিতা সেই স্মৃতির রাজনৈতিক ভাষা বদলে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন শুধু অপরাধ ও শাস্তির নয়; ন্যায়, করুণা, শিখ পরিচয় এবং ভোটের অঙ্কও একই সঙ্গে তার মধ্যে মিশে গিয়েছে।