হাইলাইটস
- প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনার (PMUY) সুবিধাভোগীদের জন্য বছরে ভর্তুকিযুক্ত এলপিজি সিলিন্ডারের সংখ্যা ৯ থেকে কমিয়ে ৪ করা হল।
- কেন্দ্রের দাবি, অধিকাংশ পরিবার বছরে গড়ে চারটির বেশি সিলিন্ডার ব্যবহার করে না।
- ২০১৬ সালে চালু হওয়া উজ্জ্বলা প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ ও দরিদ্র পরিবারকে পরিচ্ছন্ন রান্নার জ্বালানি সরবরাহ করা।
- বিরোধীদের অভিযোগ, এটি ভর্তুকি কমিয়ে সরকারের ব্যয় সংকোচনের পদক্ষেপ।
- বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এর ফলে বহু পরিবার আবার কাঠ, কয়লা বা গোবরের মতো ঐতিহ্যগত জ্বালানির দিকে ফিরে যেতে পারে।
বাংলাস্ফিয়ার: প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনার আওতায় থাকা কোটি কোটি দরিদ্র পরিবারের জন্য বড়সড় নীতিগত পরিবর্তনের ঘোষণা করল কেন্দ্র সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে উজ্জ্বলা প্রকল্পের সুবিধাভোগীরা বছরে সর্বোচ্চ চারটি ভর্তুকিযুক্ত এলপিজি সিলিন্ডার পাবেন। এতদিন সেই সংখ্যা ছিল ৯। তারও আগে প্রকল্পের শুরুতে বছরে ১২টি ভর্তুকিযুক্ত সিলিন্ডার পাওয়ার সুযোগ ছিল।
পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের অতিরিক্ত সচিব প্রবীণ মাল খানুজা এই পরিবর্তনের কথা ঘোষণা করেছেন। সরকারের যুক্তি, প্রকল্পভুক্ত পরিবারের প্রকৃত ব্যবহার ও চাহিদার সঙ্গে ভর্তুকির পরিমাণকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
২০১৬ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্যোগে শুরু হয় প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনা। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীণ এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারগুলিকে কাঠ, কয়লা, কেরোসিন বা গোবরের পরিবর্তে পরিচ্ছন্ন রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজি ব্যবহারে উৎসাহিত করা। বিশেষ করে মহিলাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, ঘরের বায়ুদূষণ কমানো এবং বনজ সম্পদের উপর চাপ হ্রাস ছিল প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য।
শুরু থেকেই উজ্জ্বলা প্রকল্পকে কেন্দ্র সরকারের অন্যতম সফল সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মসূচি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১০ কোটিরও বেশি পরিবার এই প্রকল্পের আওতায় এলপিজি সংযোগ পেয়েছে। কিন্তু সংযোগ পাওয়ার পর নিয়মিত সিলিন্ডার রিফিল করানো অনেক পরিবারের পক্ষেই সম্ভব হয়নি। উচ্চ মূল্য, আয়ের সীমাবদ্ধতা এবং গ্রামীণ অঞ্চলে সরবরাহ সংক্রান্ত সমস্যার কারণে বহু পরিবার প্রথাগত জ্বালানির ব্যবহার চালিয়ে গেছে।
সরকারের দাবি, প্রকৃত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে অধিকাংশ উজ্জ্বলা গ্রাহক বছরে চারটির বেশি সিলিন্ডার ব্যবহার করেন না। সেই কারণেই ভর্তুকিযুক্ত সিলিন্ডারের সংখ্যা কমানো হয়েছে। সরকারের মতে, বাস্তব ব্যবহার যখন সীমিত, তখন অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকি দেওয়ারও যৌক্তিকতা নেই।
তবে এই যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেক অর্থনীতিবিদ ও সমাজকল্যাণ বিশেষজ্ঞ। তাঁদের মতে, কম ব্যবহার মানেই কম প্রয়োজন নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে দারিদ্র্যের কারণে মানুষ গ্যাস ব্যবহার করতে পারছে না। ফলে ব্যবহার কম হওয়াকে ভিত্তি করে ভর্তুকি কমিয়ে দিলে সমস্যাটি আরও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, উজ্জ্বলা প্রকল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল “সংযোগ” নয়, বরং “ধারাবাহিক ব্যবহার” নিশ্চিত করা। অনেক পরিবার প্রথম সংযোগ পাওয়ার পর কয়েক মাস গ্যাস ব্যবহার করলেও পরে খরচ সামলাতে না পেরে আবার কাঠ বা গোবরের চুলায় ফিরে গেছে। নতুন সিদ্ধান্ত সেই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও সিদ্ধান্তটির তাৎপর্য রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং সরকারি ভর্তুকির বোঝা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে কেন্দ্র ব্যয় সংকোচনের পথ বেছে নিচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। গত কয়েক বছরে খাদ্য, সার এবং জ্বালানি ভর্তুকি বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। ফলে রাজকোষীয় ভারসাম্য বজায় রাখতে বিভিন্ন খাতে পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা চলছে।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিরোধী দলগুলি ইতিমধ্যেই অভিযোগ তুলতে পারে যে দরিদ্র মানুষের স্বার্থের বদলে সরকারের নজর এখন ব্যয় কমানোর দিকে। বিশেষত গ্রামীণ এলাকায় যেখানে উজ্জ্বলা প্রকল্প রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, সেখানে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব ভবিষ্যৎ নির্বাচনী সমীকরণেও পড়তে পারে।
অন্যদিকে সরকার বলছে, প্রকল্প বন্ধ করা হচ্ছে না, বরং প্রকৃত ব্যবহার অনুযায়ী তাকে আরও বাস্তবসম্মত করা হচ্ছে। তাদের মতে, ভর্তুকির লক্ষ্য হওয়া উচিৎউজ্জ্বলা প্রকল্পে কোপ! বছরে মিলবে মাত্র ৪টি ভর্তুকিযুক্ত সিলিন্ডার, প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান, অযৌক্তিক ব্যয় বৃদ্ধি নয়।
তবে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি রয়ে যাচ্ছে—এই সিদ্ধান্তের ফলে কি দরিদ্র পরিবারের রান্নাঘরে এলপিজির ব্যবহার কমবে, নাকি সরকার যে ব্যবহার-ভিত্তিক যুক্তি দেখাচ্ছে তা সত্যিই বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিফলন? সেই উত্তর মিলবে আগামী কয়েক বছরের ব্যবহার ও রিফিল সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণেই।
একটি বিষয় অবশ্য স্পষ্ট—উজ্জ্বলা প্রকল্পে ভর্তুকিযুক্ত সিলিন্ডারের সংখ্যা ১২ থেকে ৯ এবং এখন ৪-এ নেমে আসা দেখিয়ে দিচ্ছে যে কেন্দ্র সরকার ধীরে ধীরে এই প্রকল্পকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক এবং ব্যয়-সাশ্রয়ী কাঠামোর দিকে নিয়ে যেতে চাইছে। কিন্তু সেই পথে হাঁটতে গিয়ে দরিদ্র পরিবারের জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা সুরক্ষিত থাকবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।