খবর

স্টেইন্স হত্যার ২৭ বছর পর: অনুতাপ, ধর্মান্তর আর দারা সিংহের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন ঘিরে আতঙ্কে ওড়িশার সেই গ্রাম

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বাংলাস্ফিয়ার: ১৯৯৯ সালের জানুয়ারির সেই বিভীষিকাময় রাত এখনও ওড়িশার কেওনঝর জেলার মনোহরপুর গ্রামের মানুষের স্মৃতিতে দগদগে ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে।
  • অস্ট্রেলীয় মিশনারি গ্রাহাম স্টেইন্স এবং তাঁর দুই অল্পবয়সি ছেলে ফিলিপ (১০) ও টিমোথি (৬)-কে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার ঘটনায় গোটা বিশ্ব স্তম্ভিত হয়েছিল।
  • প্রায় তিন দশক পর সেই ঘটনা আবার আলোচনায় এসেছে—একদিকে কারণ, মামলার এক দণ্ডিত, যিনি অপরাধের সময় নাবালক ছিলেন, তিনি জানিয়েছেন যে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের পর…

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বাংলাস্ফিয়ার: ১৯৯৯ সালের জানুয়ারির সেই বিভীষিকাময় রাত এখনও ওড়িশার কেওনঝর জেলার মনোহরপুর গ্রামের মানুষের স্মৃতিতে দগদগে ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে। অস্ট্রেলীয় মিশনারি গ্রাহাম স্টেইন্স এবং তাঁর দুই অল্পবয়সি ছেলে ফিলিপ (১০) ও টিমোথি (৬)-কে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার ঘটনায় গোটা বিশ্ব স্তম্ভিত হয়েছিল। প্রায় তিন দশক পর সেই ঘটনা আবার আলোচনায় এসেছে—একদিকে কারণ, মামলার এক দণ্ডিত, যিনি অপরাধের সময় নাবালক ছিলেন, তিনি জানিয়েছেন যে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের পর তাঁর জীবনে শান্তি এসেছে। অন্যদিকে, মূল অভিযুক্ত দারা সিংহের সম্ভাব্য মুক্তির খবর ঘিরে উদ্বেগে রয়েছে মনোহরপুর।

স্টেইন্স দীর্ঘদিন ধরে কুষ্ঠরোগীদের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৯৯ সালের ২২ জানুয়ারির রাতে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি তাঁর দুই ছেলেকে নিয়ে গাড়ির ভিতরে ঘুমিয়ে ছিলেন। সেই সময় একদল উগ্র জনতা গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। তিনজনই জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক স্তরে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল এবং ভারতে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা নিয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।

ঘটনার তদন্তে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রধান অভিযুক্ত দারা সিংহকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও পরে তা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করা হয়। মামলায় দোষী সাব্যস্ত আরেক ব্যক্তি, যিনি ঘটনার সময় নাবালক ছিলেন, সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, কারাগারে থাকাকালীন তিনি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং বিশ্বাসের মাধ্যমে মানসিক শান্তি খুঁজে পান। তাঁর কথায়, “খ্রিস্টধর্ম আমাকে অন্তরের শান্তি দিয়েছে। আমি অতীতের জন্য অনুতপ্ত এবং নতুন জীবন শুরু করতে চাই।”

এই বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ স্টেইন্স নিজেও ক্ষমা ও মানবিকতার বার্তা প্রচার করতেন। তাঁর স্ত্রী গ্ল্যাডিস স্টেইন্স স্বামীর হত্যাকারীদের প্রকাশ্যে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। সেই সিদ্ধান্ত দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসিত হয় এবং প্রতিহিংসার বদলে পুনর্মিলনের এক বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

তবে মনোহরপুরের বাস্তবতা এখনও জটিল। গ্রামের অনেক বাসিন্দা মনে করেন, দারা সিংহ মুক্তি পেলে পুরনো ক্ষত আবার উসকে উঠতে পারে। তাঁদের আশঙ্কা, বহু কষ্টে যে সামাজিক শান্তি ফিরে এসেছে, তা আবার বিঘ্নিত হতে পারে। যদিও এত বছর পর এলাকায় হিন্দু ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান তৈরি হয়েছে, তবু অতীতের স্মৃতি এখনও মানুষকে তাড়া করে বেড়ায়।

গ্রামের প্রবীণদের মতে, স্টেইন্স হত্যাকাণ্ড শুধু তিনটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, মনোহরপুরের পরিচয়ও বদলে দিয়েছিল। একসময় সাধারণ আদিবাসী অধ্যুষিত এই গ্রাম আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসে। গ্রামের বহু মানুষ আজও সেই পরিচয় থেকে মুক্ত হতে পারেননি। তাঁদের কথায়, “আমরা চাই না ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই ঘটনাকেই আমাদের একমাত্র পরিচয় হিসেবে জানুক।”

স্থানীয় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের অনেকের বক্তব্য, স্টেইন্সের পরিবারের ক্ষমার মনোভাব তাঁদের সমাজকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। কিন্তু তাঁরা এটাও মনে করেন, ন্যায়বিচার ও সামাজিক সম্প্রীতি—দুটির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। অপরাধের স্মৃতি ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়, তবে ঘৃণাকে স্থায়ী হতে দেওয়াও উচিত নয়।

অন্যদিকে, মানবাধিকার কর্মীদের একাংশের মতে, দীর্ঘ কারাবাসের পর কোনও বন্দির মুক্তির প্রশ্ন আইন অনুযায়ী বিবেচিত হতে পারে। তবে তাঁরা জোর দিচ্ছেন, এমন সংবেদনশীল মামলায় প্রশাসনের উচিত স্থানীয় মানুষের উদ্বেগ ও আইনশৃঙ্খলার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া।

স্টেইন্স হত্যাকাণ্ড ভারতের বিচারব্যবস্থা, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং ক্ষমার রাজনীতি—এই তিনটি বিষয়েরই এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একদিকে এক দণ্ডিতের অনুশোচনা ও ধর্মান্তরের কাহিনি, অন্যদিকে গ্রামের মানুষের অমোচনীয় স্মৃতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা—দুটি বাস্তবতাই আজ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।

প্রায় ২৭ বছর পরও মনোহরপুর যেন ইতিহাসের সেই রাতের ছায়া থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি। অনুতাপ, ক্ষমা এবং ন্যায়বিচারের এই জটিল সমীকরণ আজও সেই গ্রামের জীবনকে প্রভাবিত করে চলেছে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles