ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সঙ্গে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলির দাবি, যুদ্ধকালীন নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে সামনে রেখে সরকার রাজনৈতিক বিরোধী, বিক্ষোভকারী, নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য এবং গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর দমননীতি চালাচ্ছে। এর জেরে একের পর এক ফাঁসির ঘটনা নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
এই পরিস্থিতির অন্যতম আলোচিত নাম ৩৪ বছরের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক ও গবেষক ভাহিদ বানিয়ামেরিয়ান। তাঁর পরিবারের দাবি, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনও ধরনের আনুষ্ঠানিক নোটিস দেওয়া হয়নি। এমনকি তাঁর আইনজীবীকেও কিছু জানানো হয়নি। পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট তাঁর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর।
পরিবারের এক ঘনিষ্ঠ সদস্য, যিনি বর্তমানে ইরানের বাইরে থাকেন, সংবাদমাধ্যমকে জানান, “কোনও সতর্কবার্তা ছিল না। আইনজীবীও কিছু জানতেন না। এমনকি ইরানের কঠোর আইন মেনেও এই প্রক্রিয়া বৈধ বলা যায় না।”
বানিয়ামেরিয়ানের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ ঘোষিত পিপলস মুজাহিদিন অর্গানাইজেশন অব ইরান (MEK)-এর সদস্য হওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল। একই মামলায় আরও পাঁচজনের সঙ্গে তাঁকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং পরে তাঁদের সকলকেই ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলির অভিযোগ, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাজনৈতিক বন্দিদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শুধু বিরোধী সংগঠনের সদস্যই নন, সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া বহু প্রতিবাদকারী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য এবং বিদেশি শক্তির হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদেরও দ্রুত বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলির মতে, এই বিচারপ্রক্রিয়ার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। অভিযুক্তদের আইনজীবীর সঙ্গে পর্যাপ্ত যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয় না, পরিবারের সদস্যদের আগাম জানানো হয় না এবং অনেক সময় বিচার গোপনে সম্পন্ন হয়। ফলে বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সরকার অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা দমন এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার নামে কঠোর বার্তা দিতে চাইছে। এর ফলে রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডকে আরও বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে ইজরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের আবহে “জাতীয় নিরাপত্তা” এবং “বিদেশি ষড়যন্ত্র”-এর অভিযোগ আরও ঘন ঘন সামনে আনা হচ্ছে।
ইরান অবশ্য বরাবরই দাবি করে আসছে, মৃত্যুদণ্ড শুধুমাত্র গুরুতর অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ এবং রাষ্ট্রদ্রোহের মতো মামলায় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই কার্যকর করা হয়। সরকারের বক্তব্য, দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং আদালত স্বাধীনভাবেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
তবে আন্তর্জাতিক মহল এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয়। মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক মতপ্রকাশ ও বিরোধিতাকে অপরাধ হিসেবে দেখানো হচ্ছে এবং যুদ্ধের আবহকে কাজে লাগিয়ে ভিন্নমত দমনের অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।
জাতিসংঘ-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইতিমধ্যেই ইরানে মৃত্যুদণ্ডের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক বন্দিদের অধিকার রক্ষা এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই ইরানে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা বাড়ছে। বিরোধী সংগঠন, অধিকারকর্মী এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নিরাপত্তার নামে রাষ্ট্রের কঠোরতা বাড়তে থাকলে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের পরিসর আরও সংকুচিত হতে পারে। ভাহিদ বানিয়ামেরিয়ানের মতো ঘটনাগুলি সেই আশঙ্কাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলছে।