Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: ২০২৬ সালের নিট-ইউজি (NEET-UG) প্রশ্নপত্র ফাঁস বিতর্কের জেরে পরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের দাবিতে চলা মামলার শুনানিতে সোমবার সুপ্রিম কোর্টকে কেন্দ্র জানিয়েছে, পরীক্ষা ব্যবস্থার পরবর্তী পর্যায়ের সংস্কারের জন্য ইনফোসিসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা নন্দন নিলেকানির নেতৃত্বে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তবে এটি পরীক্ষা সংস্কারের প্রথম উদ্যোগ নয়। এর আগেও ২০২৪ সালের নিট-ইউজি প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর প্রাক্তন ইসরো প্রধান ড. কে. রাধাকৃষ্ণনের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক। সেই কমিটি ২০২৪ সালের অক্টোবরে ১০১টি সুপারিশ-সহ একটি বিস্তৃত প্রতিবেদন জমা দেয়। লক্ষ্য ছিল ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)-কে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা, যা হবে “দ্রুত, নির্ভুল, অভিযোজনক্ষম এবং সমন্বিত”।
কেন গঠিত হয়েছিল কমিটি?
২০২৪ সালে নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ দেশজুড়ে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি করে। তার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রক রাধাকৃষ্ণন কমিটিকে প্রথমে তিনটি বিষয়ে সুপারিশ করার দায়িত্ব দেয়—
- পরীক্ষা পরিচালনা আরও সুরক্ষিত করা,
- তথ্য সুরক্ষা জোরদার করা,
- এনটিএ-র সাংগঠনিক কাঠামো ও কার্যপদ্ধতির পর্যালোচনা।
পরে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কমিটির কাজের পরিধি আরও বাড়ানো হয়। পরীক্ষার নিরাপত্তা, প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রশাসনিক সংস্কার, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং পরীক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত হয়।
কী খুঁজে পেয়েছিল কমিটি?
কমিটির মতে, প্রশ্নপত্র ফাঁস কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; গোটা পরীক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে দুর্বলতা রয়েছে। প্রশ্নপত্র মুদ্রণ, সংরক্ষণ, পরিবহণ, পরীক্ষার্থীর পরিচয় যাচাই, পরীক্ষাকেন্দ্র পরিচালনা থেকে অভিযোগ নিষ্পত্তি—সমস্ত ধাপেই ঝুঁকি রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এনটিএ ২৪০টিরও বেশি পরীক্ষা পরিচালনা করেছে এবং ৫.৪ কোটির বেশি পরীক্ষার্থী এই পরীক্ষাগুলিতে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু সেই তুলনায় সংস্থার পরিকাঠামো ও দক্ষতা যথেষ্ট নয়।
প্রশ্নপত্র পরিবহণের বদলে ডিজিটাল ব্যবস্থা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ছিল কম্পিউটার-সহায়ক সুরক্ষিত কলম-কাগজ পরীক্ষা (CPPT) চালুর প্রস্তাব।
এই ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় ছাপাখানায় প্রশ্নপত্র ছাপিয়ে বিভিন্ন রাজ্যে পাঠানোর পরিবর্তে এনক্রিপ্ট করা প্রশ্নপত্র পরীক্ষাকেন্দ্রের সুরক্ষিত সার্ভারে পাঠানো হবে। পরীক্ষা শুরুর কিছুক্ষণ আগে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে তা মুদ্রিত হবে। পরীক্ষার্থীরা অবশ্য আগের মতোই কাগজে লিখে পরীক্ষা দেবেন।
কমিটির মতে, এতে পরিবহণের সময় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঝুঁকি প্রায় সম্পূর্ণ দূর করা সম্ভব।
‘ডিজি-এক্সাম’ ব্যবস্থার প্রস্তাব
প্রতিবেদনে ডিজি-এক্সাম নামে একটি ডিজিটাল পরিচয় যাচাই ব্যবস্থা তৈরির সুপারিশ করা হয়, যার ধারণা নেওয়া হয়েছে ‘ডিজি যাত্রা’ প্রকল্প থেকে।
শুধু পরীক্ষার দিন নয়, আবেদন, পরীক্ষা এবং ভর্তি—এই তিনটি ধাপেই আধার, বায়োমেট্রিক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে পরীক্ষার্থীর পরিচয় একাধিকবার যাচাই করার কথা বলা হয়েছে। উদ্দেশ্য, যাতে প্রকৃত পরীক্ষার্থীই পরীক্ষা দিয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাক্রমে ভর্তি হতে পারেন।
এনটিএ-র আমূল পুনর্গঠনের প্রস্তাব
রাধাকৃষ্ণন কমিটির মতে, শুধু প্রযুক্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এনটিএ-কে সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রে বাইরের সংস্থার উপর নির্ভরতা কমাতে হবে।
সেই কারণে সংস্থার শীর্ষ পরিচালন পর্ষদকে আরও ক্ষমতাসম্পন্ন ও জবাবদিহিমূলক করার সুপারিশ করা হয়। অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার একজন মহাপরিচালকের নেতৃত্বে নতুন কাঠামো গড়ার পাশাপাশি তথ্য নিরাপত্তা, সতর্কতা ও ফরেনসিক, গবেষণা, পরীক্ষাকেন্দ্র উন্নয়ন-সহ মোট ১০টি পৃথক বিভাগ তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়।
১,০০০টি সুরক্ষিত পরীক্ষাকেন্দ্র
কমিটি ধাপে ধাপে সরকারি প্রতিষ্ঠানে অন্তত ১,০০০টি স্থায়ী সুরক্ষিত পরীক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলার সুপারিশ করে।
এই কেন্দ্রগুলিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, মোবাইল রাখার লকার, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল, সাহায্যকেন্দ্র এবং পরীক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য অপেক্ষাকক্ষ রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
দুর্গম এলাকার জন্য চলমান বা মোবাইল পরীক্ষাকেন্দ্রের বাস চালুরও সুপারিশ করা হয়েছে, যেখানে প্রায় ১৫০ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে পারবেন।
বহু-পর্বে পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তাব
যেসব পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীর সংখ্যা অত্যন্ত বেশি, সেখানে একদিনের বদলে একাধিক দিনে বা একাধিক পর্বে পরীক্ষা নেওয়ার পরামর্শ দেয় কমিটি।
নিট-ইউজি পরীক্ষাও ভবিষ্যতে বহু-পর্বে নেওয়া যেতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে একাধিক সেশনে পরীক্ষা হলে নম্বরের স্বাভাবিকীকরণ (নরমালাইজেশন) প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও বৈজ্ঞানিক হওয়া জরুরি বলেও জোর দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে কম্পিউটার অভিযোজিত পরীক্ষা (Computer Adaptive Testing) চালুর সুপারিশও করা হয়, যেখানে পরীক্ষার্থীর উত্তর অনুযায়ী প্রশ্নের কঠিনতার মাত্রা পরিবর্তিত হবে।
মানসিক স্বাস্থ্যের উপর জোর
প্রতিবেদনে পরীক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এনটিএ-র মধ্যে পৃথক মানসিক স্বাস্থ্য শাখা, টেলি-হেল্পলাইন, কাউন্সেলিং পরিষেবা এবং শিক্ষকদের সংবেদনশীলতা বৃদ্ধির কর্মসূচি চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
কোচিং প্রতিষ্ঠানের উপর নজরদারির ব্যবস্থাও গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে, কারণ অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা ও আর্থিক চাপ বহু পরিবার ও শিক্ষার্থীর উপর মানসিক বোঝা তৈরি করছে।
এছাড়া অভিযোগ ও সমস্যার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট ব্যবহারেরও প্রস্তাব দেওয়া হয়, যাতে পরীক্ষার্থীরা নিজেদের ভাষায় দ্রুত উত্তর পেতে পারেন।
বাস্তবায়নের জন্য আলাদা নজরদারি কমিটি
শুধু সুপারিশ তৈরি করেই যাতে কাজ শেষ না হয়ে যায়, সে জন্য শিক্ষা মন্ত্রকের অধীনে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্টিয়ারিং কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিল রাধাকৃষ্ণন কমিটি।
এই কমিটির দায়িত্ব হবে এনটিএ-কে সংস্কার বাস্তবায়নে সহায়তা করা, সমস্যার সমাধান করা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংস্কারের অগ্রগতি সম্পর্কে শিক্ষা মন্ত্রককে নিয়মিত রিপোর্ট দেওয়া।