Table of Contents
হাইলাইটস
- সই জালিয়াতি সংক্রান্ত অভিযোগ ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক।
- অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক নয়, সরাসরি ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়তে পারে।
- বিরোধীদের দাবি, এতদিন যে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সুরক্ষা ছিল, তা আর নেই।
- তৃণমূলের দাবি, অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
- আদালত, তদন্তকারী সংস্থা ও ফরেনসিক রিপোর্টই শেষ কথা বলবে।
বাংলাস্ফিয়ার: ভারতীয় রাজনীতিতে অনেক নেতা আছেন যাঁরা নিজেদের জননেতা বলে পরিচয় দেন। কেউ উন্নয়নের স্থপতি, কেউ গণতন্ত্রের রক্ষাকর্তা, কেউ আবার যুবসমাজের মুখ। কিন্তু খুব কম নেতাই আছেন যাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করে একটি অদ্ভুত প্রশ্নের উপর—“সইটা আসল, না নকল?”
সাম্প্রতিক সই জালিয়াতি বিতর্কে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম ঘিরে যে অভিযোগ উঠেছে, তার রাজনৈতিক অভিঘাত যতটা, আইনি অভিঘাত তার চেয়ে কম নয়। কারণ রাজনীতিতে বক্তৃতা জাল হতে পারে, প্রতিশ্রুতি জাল হতে পারে, আদর্শও মাঝেমধ্যে জাল হয়ে যায়; কিন্তু সরকারি নথিতে সই জাল প্রমাণিত হলে বিষয়টি আর রাজনৈতিক বিতর্কের পর্যায়ে থাকে না। তখন সেটি সরাসরি ভারতীয় দণ্ডবিধি ও জালিয়াতি সংক্রান্ত অপরাধের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
সমস্যা হল, এতদিন বাংলার রাজনীতিতে বহু নেতা মনে করতেন যে ক্ষমতা একটি অলৌকিক জীবাণুনাশক। ক্ষমতার সংস্পর্শে এলেই অভিযোগ, মামলা, তদন্ত—সব জীবাণু মরে যায়। কিন্তু ক্ষমতা বদলালে দেখা যায় জীবাণুগুলো আসলে মরেনি, কেবল ঘুমোচ্ছিল।
আজ সেই ঘুম ভাঙছে।
সইয়ের রাজনীতি থেকে সইয়ের ফরেনসিক
একসময় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন দলের সবচেয়ে শক্তিশালী মুখগুলির একজন। তাঁর কথাই ছিল নির্দেশ। তাঁর সভা ছিল সংবাদ। তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হত মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা দিয়ে।
কিন্তু রাজনীতির নির্মমতা হল, গতকালের উত্তরসূরি আগামী দিনের অভিযুক্তও হতে পারেন।
বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—যে নথিতে সই রয়েছে, তা কি সত্যিই তাঁর? নাকি অন্য কারও দ্বারা প্রস্তুত?
সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি হয়তো প্রযুক্তিগত মনে হতে পারে। কিন্তু আইনের চোখে এটি অত্যন্ত গুরুতর।
কারণ সই জাল করা মানে শুধু একটি নাম নকল করা নয়। এর অর্থ হল কোনও নথিকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে প্রতারণামূলক উপাদান সংযোজন করা। আর যদি সেই নথি সরকারি, আর্থিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে অপরাধের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
রাজনীতির সবচেয়ে ভয়ঙ্কর শব্দ: ফরেনসিক
ভারতীয় রাজনীতিবিদরা সাধারণত তিনটি জিনিসকে ভয় পান না—বিরোধী দল, সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যম।
কিন্তু তাঁরা একটি জিনিসকে ভয় পান। ফরেনসিক ল্যাব।
কারণ রাজনৈতিক ভাষণে ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। টেলিভিশনের বিতর্কে পাল্টা অভিযোগ আনা যায়। কর্মীদের দিয়ে মিছিল করানো যায়। কিন্তু হস্তাক্ষর বিশেষজ্ঞকে মিছিল দিয়ে প্রভাবিত করা কঠিন।
ফরেনসিক পরীক্ষক সাধারণত ভোট চান না। মন্ত্রী হতে চান না। জেলা সভাপতি হওয়ারও ইচ্ছে থাকে না। তিনি কেবল কলমের আঁচড় দেখেন। সেখানেই রাজনীতির কবিতা শেষ হয়ে বিজ্ঞানের গদ্য শুরু হয়।
‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’—ভারতীয় রাজনীতির সর্বজনীন ওষুধ
যে মুহূর্তে কোনও তদন্ত শুরু হয়, সেই মুহূর্তেই ভারতীয় রাজনীতিতে একটি বহুল ব্যবহৃত বাক্য জন্ম নেয়—“এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা।”
এই বাক্যের বিশেষত্ব হল, এটি বাম, ডান, মধ্য—সব দলের জন্য সমান কার্যকর।
ক্ষমতায় থাকলে অন্যের বিরুদ্ধে তদন্ত ‘ন্যায়বিচার’।
ক্ষমতা হারালে নিজের বিরুদ্ধে তদন্ত ‘প্রতিহিংসা’।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি সামনে আসতে পারে। তাঁর সমর্থকেরা বলবেন, নতুন সরকার রাজনৈতিক প্রতিশোধ নিচ্ছে। সমালোচকেরা বলবেন, এতদিন তদন্ত আটকে রাখা হয়েছিল।
সবচেয়ে বড় সংকট: রাজনৈতিক নয়, নৈতিক
ধরা যাক অভিযোগ শেষ পর্যন্ত আদালতে টিকল না। ধরা যাক তিনি আইনি লড়াইয়ে জিতে গেলেন। তবুও প্রশ্ন থাকবে।
কেন এমন অভিযোগ উঠল?
কেন এমন নথি সামনে এল?
কেন বারবার দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে নথি, সই, আর্থিক লেনদেন এবং প্রশাসনিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে?
রাজনীতিতে অনেক সময় আদালতের রায় অপেক্ষা জনমতের রায় বেশি ক্ষতিকর হয়। একবার যদি মানুষের মনে সন্দেহ জন্মায়, সেটি মুছে ফেলা কঠিন।
হাজতবাস কি নিশ্চিত?
সরাসরি উত্তর—না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনও আদালত দোষী সাব্যস্ত না করা পর্যন্ত হাজতবাস নিশ্চিত বলা যায় না।
কিন্তু এটাও সত্য যে জালিয়াতি, প্রতারণা বা সরকারি নথি সংক্রান্ত গুরুতর অভিযোগে তদন্তকারী সংস্থা যদি পর্যাপ্ত প্রমাণ পায়, তাহলে গ্রেপ্তারি, জিজ্ঞাসাবাদ, এমনকি বিচারাধীন অবস্থায় কারাবাসের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ভারতীয় আইনে অভিযোগ ও দণ্ডের মধ্যে দীর্ঘ পথ রয়েছে। কিন্তু সেই পথের প্রথম ধাপই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ কথা: উত্তরাধিকারীর পথ থেকে অভিযুক্তের কাঠগড়া?
বাংলার রাজনীতিতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান ছিল দ্রুত, নাটকীয় এবং নজিরবিহীন। একসময় তাঁকে ভবিষ্যতের মুখ্যমন্ত্রী বলা হত। আজ তাঁকে ঘিরে আলোচনার বিষয় ফরেনসিক রিপোর্ট। এটাই রাজনীতির নির্মম সৌন্দর্য। ক্ষমতা যখন থাকে, তখন নেতারা ভাবেন ইতিহাস তাঁদের জন্য লেখা হচ্ছে। ক্ষমতা চলে গেলে তাঁরা আবিষ্কার করেন, ইতিহাস নয়, কেস ডায়েরি লেখা হচ্ছিল।আর সেই ডায়েরির পাতায় যদি সত্যিই কোনও জাল সই থেকে থাকে, তাহলে রাজনৈতিক বক্তৃতা, দলীয় আনুগত্য বা সামাজিক মাধ্যমের প্রচার কোনওটাই খুব বেশি সাহায্য করবে না।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবে আদালত। আর আদালতের ভাষা খুবই নিষ্ঠুর। সেখানে করতালির শব্দ শোনা যায় না। শুধু প্রমাণের শব্দ শোনা যায়।