হাইলাইটস:

  • পশ্চিমবঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু করল রাজ্য সরকার।
  • অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি রঞ্জনা প্রকাশ দেশাইয়ের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন।
  • চার সপ্তাহের মধ্যে খসড়া সুপারিশ জমা দিতে বলা হয়েছে কমিটিকে।
  • মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বার্তা, “আমরা তাড়াহুড়ো করছি না, আইনগতভাবে নির্ভুল ও গ্রহণযোগ্য খসড়াই চাই।”
  • কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে আগস্টে বিধানসভায় বিল আনার সম্ভাবনা।

বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউসিসি কার্যকর করার লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম পদক্ষেপ নিল রাজ্য সরকার। তবে রাজনৈতিক বার্তার পাশাপাশি সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে, এই বিষয়ে কোনও তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। বরং বিস্তৃত আইনি পর্যালোচনা, সাংবিধানিক পরীক্ষা এবং বিভিন্ন দিক বিবেচনা করেই চূড়ান্ত খসড়া তৈরি করা হবে।

সোমবার বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেন, অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি রঞ্জনা প্রকাশ দেশাই-এর নেতৃত্বে একটি পাঁচ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি পশ্চিমবঙ্গের জন্য ইউসিসি-র খসড়া তৈরির ভিত্তি প্রস্তুত করবে।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার এই বিষয়ে রাজনৈতিক তাড়াহুড়ো করতে চায় না। তাঁর কথায়, “এটি এমন একটি বিষয়, যার দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও আইনি প্রভাব রয়েছে। তাই আমরা ধাপে ধাপে এগোতে চাই।” এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি একদিকে ইউসিসি কার্যকর করার রাজনৈতিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন, অন্যদিকে বিরোধীদের আশঙ্কারও জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, কমিটিকে চার সপ্তাহের মধ্যে তাদের সুপারিশ জমা দিতে হবে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে আইন দফতর খসড়া বিল প্রস্তুত করবে। এরপর তা মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী আগস্ট মাসে বিধানসভায় বিলটি উত্থাপন করা হতে পারে।

অভিন্ন দেওয়ানি বিধির মূল উদ্দেশ্য হল বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, দত্তক গ্রহণ, ভরণপোষণ-সহ পারিবারিক আইনগুলিকে ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইন থেকে সরিয়ে একটি অভিন্ন আইনি কাঠামোর আওতায় আনা। সংবিধানের নীতিনির্দেশক তত্ত্বের ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে এই ধরনের একটি অভিন্ন দেওয়ানি বিধির দিকে এগোনোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যদিও এটি বাধ্যতামূলক নয়।

রাজ্য সরকারের দাবি, সমতার নীতি এবং নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। সরকারের মতে, ধর্মভেদে পৃথক ব্যক্তিগত আইনের ফলে যে বৈষম্য তৈরি হয়, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি তা দূর করতে সহায়ক হতে পারে।

তবে বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিরোধী দলগুলির একাংশ ইতিমধ্যেই অভিযোগ করেছে, ইউসিসি সামাজিক ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁদের মতে, ব্যক্তিগত আইন বহু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িত। ফলে আইন তৈরির আগে সব পক্ষের মতামত নেওয়া জরুরি।

এই প্রেক্ষাপটে অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে কমিটি গঠনকে সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে তুলে ধরছে। সরকারের বক্তব্য, আইনি নিরপেক্ষতা ও সাংবিধানিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতেই একজন অভিজ্ঞ বিচারপতিকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে ইউসিসি কার্যকর করার উদ্যোগ শুধু একটি আইন প্রণয়নের বিষয় নয়; এটি আগামী দিনের রাজনৈতিক বিতর্কেরও অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে রাজ্যের সামাজিক বৈচিত্র্য, সংখ্যালঘু জনসংখ্যা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত আইনকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বাস্তবতা বিবেচনায় এই উদ্যোগের রাজনৈতিক গুরুত্ব যথেষ্ট।

সরকার অবশ্য শুরু থেকেই জানিয়ে দিয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় আইনের শাসন এবং সাংবিধানিক বিধানই হবে প্রধান ভিত্তি। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে “তাড়াহুড়ো নয়” এবং “সঠিক আইনি প্রক্রিয়া” অনুসরণের কথা। এর মাধ্যমে সরকার বোঝাতে চাইছে যে, শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য নয়, দীর্ঘস্থায়ী ও আদালতে টিকে থাকতে সক্ষম একটি আইন তৈরিই তাদের লক্ষ্য।

আগামী চার সপ্তাহ তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিচারপতি রঞ্জনা প্রকাশ দেশাইয়ের নেতৃত্বাধীন কমিটি কী ধরনের সুপারিশ করে, ব্যক্তিগত আইনগুলির কোন কোন ক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রস্তাব দেয় এবং সেই সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার কী ধরনের খসড়া বিল আনে—সেদিকেই এখন নজর থাকবে রাজনৈতিক মহল, আইন বিশেষজ্ঞ এবং সাধারণ মানুষের।

পশ্চিমবঙ্গে ইউসিসি নিয়ে এই ঘোষণার মাধ্যমে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল। কিন্তু সরকার নিজেই স্পষ্ট করেছে, এটি কোনও দ্রুতগতির রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি আইনি ও নীতিগত প্রক্রিয়া। সেই কারণেই প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া হলেও শেষ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে এখনও বেশ কিছু পথ বাকি।