হাইলাইটস:
- মুম্বই-আহমেদাবাদ বুলেট ট্রেন প্রকল্প নিয়ে প্রাক্তন জাপানি মন্ত্রীর মন্তব্যে বিতর্ক।
- ভারতের বিরুদ্ধে ‘চূড়ান্ত বেপরোয়া’ আচরণের অভিযোগ তোলেন তিনি।
- বিদেশ মন্ত্রক জানাল, এটি ব্যক্তিগত মত; বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে এর মিল নেই।
- ভারত-জাপান যৌথ প্রকল্পের কাজ পরিকল্পনামাফিক এগোচ্ছে বলেও দাবি কেন্দ্রের।
মুম্বই-আহমেদাবাদ বুলেট ট্রেন (MAHSR) প্রকল্পকে ঘিরে ভারত-জাপান সম্পর্কে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। জাপানের এক প্রাক্তন মন্ত্রীর সামাজিক মাধ্যমে করা মন্তব্যে দাবি করা হয়েছে, ভারতের ‘চূড়ান্ত বেপরোয়া’ মনোভাবের কারণেই দেশের প্রথম বুলেট ট্রেন প্রকল্পের অগ্রগতি বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। যদিও সেই অভিযোগ দ্রুত ও স্পষ্ট ভাষায় খারিজ করে দিয়েছে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক (MEA)।
প্রাক্তন জাপানি মন্ত্রী এক্স (সাবেক টুইটার)-এ করা এক পোস্টে দাবি করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভারতীয় পক্ষ পরিকল্পনা, জমি অধিগ্রহণ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রয়োজনীয় সতর্কতা দেখায়নি। তাঁর বক্তব্য, এই ‘sheer recklessness’ বা ‘চূড়ান্ত বেপরোয়া’ মনোভাবই প্রকল্পকে দীর্ঘদিন পিছিয়ে দিয়েছে। যদিও তিনি কোনও সরকারি পদে নেই এবং মন্তব্যটি ব্যক্তিগত হিসেবেই করেছেন, তবু বিষয়টি দুই দেশের কূটনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দেয়।
এর জবাবে শুক্রবার বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র বলেন, এই মন্তব্য সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত এবং বাস্তব তথ্যের সঙ্গে অসঙ্গত। তিনি স্পষ্ট করেন, ভারত ও জাপানের মধ্যে এই প্রকল্প নিয়ে নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চলছে এবং সহযোগিতার পরিবেশ অত্যন্ত ইতিবাচক।
মন্ত্রকের বক্তব্য, দুই দেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থা নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যেই প্রকল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করছে। প্রযুক্তি, অর্থায়ন, নির্মাণ এবং ভবিষ্যৎ পরিচালনা—সব ক্ষেত্রেই সমন্বয় বজায় রয়েছে। ফলে ব্যক্তিগত মন্তব্যকে সরকারি অবস্থান হিসেবে দেখার কোনও কারণ নেই।
মুম্বই-আহমেদাবাদ হাই স্পিড রেল প্রকল্প ভারতের প্রথম বুলেট ট্রেন উদ্যোগ। প্রায় ৫০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুটে ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটার পর্যন্ত হবে। জাপানের শিনকানসেন প্রযুক্তির ভিত্তিতে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পের অধিকাংশ অর্থ জাপান অত্যন্ত কম সুদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ হিসেবে দিচ্ছে।
তবে প্রকল্পের শুরু থেকেই জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত অনুমোদন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে কাজের গতি বারবার ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে মহারাষ্ট্রে সরকার পরিবর্তনের সময় প্রকল্প কিছুটা ধাক্কা খেয়েছিল। পরে কেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির উদ্যোগে জমি অধিগ্রহণের কাজ দ্রুত এগোয়।
বর্তমানে গুজরাত অংশে নির্মাণকাজ অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে। একাধিক ভায়াডাক্ট, স্টেশন এবং সেতুর কাজ শেষ হওয়ার পথে। মহারাষ্ট্রেও কাজের গতি আগের তুলনায় বেড়েছে। জাতীয় হাই স্পিড রেল কর্পোরেশন (NHSRCL) একাধিকবার জানিয়েছে, নির্ধারিত পর্যায়ে নির্মাণ এগোচ্ছে এবং প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো দ্রুত সম্পূর্ণ করার চেষ্টা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় আন্তর্জাতিক অবকাঠামো প্রকল্পে সময়সীমা বাড়া অস্বাভাবিক নয়। জমি অধিগ্রহণ, স্থানীয় প্রশাসনিক অনুমোদন, প্রযুক্তিগত সমন্বয় এবং আর্থিক পরিকল্পনা—সবকিছু মিলিয়ে এমন প্রকল্পে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ থাকেই। তাই কোনও এক পক্ষকে দায়ী করা বাস্তবসম্মত নয়।
কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ভারত-জাপান সম্পর্ক বর্তমানে ‘বিশেষ কৌশলগত ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব’-এর পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং অবকাঠামো—বহু ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা ক্রমশ বাড়ছে। সেই প্রেক্ষাপটে একজন প্রাক্তন মন্ত্রীর ব্যক্তিগত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
ভারতের বিদেশ মন্ত্রকও একই বার্তা দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, দুই দেশের সরকার পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে নিয়মিত পর্যালোচনা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও সেই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।
ফলে বুলেট ট্রেন প্রকল্পকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হলেও নয়াদিল্লির অবস্থান স্পষ্ট—প্রাক্তন জাপানি মন্ত্রীর মন্তব্য সরকারি অবস্থান নয়, বরং ব্যক্তিগত মতামত। প্রকল্পের কাজ নিয়ে ভারত ও জাপানের মধ্যে কোনও মতবিরোধ নেই এবং যৌথ উদ্যোগ নির্ধারিত লক্ষ্যের দিকেই এগিয়ে চলেছে।