Home SportsFIFA 2026 ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ এখন ইতিহাস, মেসির হাত ধরেই বদলে গেছে আর্জেন্টিনার ফুটবলের আত্মপরিচয়

ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ এখন ইতিহাস, মেসির হাত ধরেই বদলে গেছে আর্জেন্টিনার ফুটবলের আত্মপরিচয়

Authored By নির্ণয় চট্টোপাধ্যায়
16 views 4 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

  • ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা।
  • অনেকের মতে, মেসি এখন ম্যারাডোনার স্মৃতিকে ছাপিয়ে নতুন আর্জেন্টিনার প্রতীক।
  • ‘হ্যান্ড অব গড’-এর যুগ শেষ, আধুনিক আর্জেন্টিনা এখন সুন্দর ফুটবলের পরিচয়ে বিশ্বাসী।
  • সাবেক সতীর্থ, দার্শনিক ও ম্যারাডোনার ঘনিষ্ঠদের মতে, মেসির অর্জন এখন অনতিক্রম্য।

চার দশক ধরে দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল এবং তার পরের অবিশ্বাস্য ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ আর্জেন্টিনার ফুটবলের আবেগ, অহংকার ও আত্মপরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন অনেকের বিশ্বাস, সেই অধ্যায়কে ইতিহাসের জাদুঘরে তুলে রাখার সময় এসেছে। কারণ, লিওনেল মেসি শুধু একজন কিংবদন্তি ফুটবলার নন, তিনি আর্জেন্টিনার ফুটবল-পরিচয়েরই নতুন সংজ্ঞা লিখেছেন।ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল জেতার পর আর্জেন্টিনা আর কেবল মেসিনির্ভর দল নয়। দলটি এখন আত্মবিশ্বাসী, ছন্দময় এবং নান্দনিক ফুটবল খেলে। রবিবারের ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে নামার আগে সেটাই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।আর্জেন্টিনার বিশিষ্ট দার্শনিক ও লেখক তোমাস আব্রাহামের মতে, এই হার ইংল্যান্ডের কাছে ‘হ্যান্ড অব গড’-এর চেয়েও বেশি বেদনাদায়ক।তিনি বলেন, “ইংরেজদের কাছে ‘হ্যান্ড অব গড’ ছিল প্রতারণার প্রতীক। কিন্তু এবার তারা এমন একটি দলের কাছে হেরেছে, যারা স্পষ্টভাবেই শ্রেষ্ঠ ছিল। তাই এই পরাজয়ের ক্ষত আরও গভীর।”

মেসিকে একসময় মানতে পারেনি আর্জেন্টিনাই

বিশ্বজুড়ে যেখানে মেসি ছিলেন বিস্ময়ের নাম, সেখানে দীর্ঘদিন আর্জেন্টিনার অনেক সমর্থক তাকে বিচার করেছেন শুধুই ম্যারাডোনার মানদণ্ডে। তারা চেয়েছিলেন, মেসিও যেন ম্যারাডোনার মতোই হন।অনেকেই মনে করতেন, ইউরোপে যতই সফল হোন না কেন, দক্ষিণ আমেরিকার কঠিন ফুটবলে তিনি টিকতে পারবেন না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ধারণা ভেঙে যায়।আজ মেসির সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু ট্রফি জেতা নয়; তিনি নিজস্ব পরিচয়ে আর্জেন্টিনার মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেছেন। এখন আর তাকে ম্যারাডোনার ছায়ায় দেখা হয় না।

ম্যারাডোনা ছিলেন এক ধরনের আর্জেন্টিনার প্রতিচ্ছবি

আব্রাহামের মতে, ম্যারাডোনা ছিলেন কেবল ফুটবলার নন; তিনি ছিলেন এক ধরনের ‘আর্জেন্টিনীয় সত্তা’র প্রতীক।দেশটির অতীতের আত্মবিশ্বাস, অহংকার, রাজনৈতিক উচ্চকণ্ঠতা, বৈপরীত্য—সবকিছুরই প্রতিফলন ছিল তার মধ্যে। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট থেকে পোপ, ফিফা থেকে ফিদেল কাস্ত্রো—সবাইকে নিয়ে নির্দ্বিধায় মতামত দিতেন। একই মানুষকে কখনও ভালোবাসতেন, আবার কখনও কঠোর সমালোচনাও করতেন।ম্যারাডোনা ছিলেন মেধাবী বক্তা। সাধারণ পরিবারে বড় হলেও ভাষার শক্তি ও শব্দের গুরুত্ব তিনি গভীরভাবে বুঝতেন।

মেসি অন্যরকম

মেসি ঠিক তার বিপরীত। তিনি কম কথা বলেন, ছোট বাক্যে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন। বক্তৃতা দেওয়ার চেয়ে মাঠে উত্তর দিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।এই স্বভাবই নতুন ধরনের আর্জেন্টিনীয় পরিচয় তৈরি করেছে—যেখানে অহংকারের বদলে আছে নীরব আত্মবিশ্বাস, আর বিতর্কের বদলে ফুটবলই প্রধান ভাষা।

ম্যারাডোনার সতীর্থের চোখে দুই কিংবদন্তি

ম্যারাডোনার সাবেক সতীর্থ ও বর্তমান আর্জেন্টিনা মিডফিল্ডার আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের বাবা কার্লোস ম্যাক অ্যালিস্টারের মতে, দুই কিংবদন্তির সবচেয়ে বড় পার্থক্য তাদের ব্যক্তিগত জীবন।তার ভাষায়, “দিয়েগোর জীবন থেকেই মেসি শিক্ষা নিয়েছে। কী করা উচিত, আর কী করা উচিত নয়—সেটা বুঝে সে ফুটবলকে আরও উঁচু স্তরে নিয়ে গেছে।”

ম্যারাডোনার মৃত্যুর পর বদলে গেছে আবেগ

২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর ম্যারাডোনার মৃত্যুর কারণ নিয়ে তদন্ত হলেও আর্জেন্টিনায় তা দীর্ঘদিন জনআলোচনার বিষয় হয়ে ওঠেনি।অনেকের মতে, দেশের মানুষ হয়তো সেই বেদনাদায়ক স্মৃতি থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে চেয়েছে। আর সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছেন মেসি।সেমিফাইনালের জয়ের পর মেসিও আবেগঘনভাবে ম্যারাডোনাকে স্মরণ করেন।তিনি বলেন, “আমি নিশ্চিত, দিয়েগো ওপর থেকে সবকিছু উপভোগ করছেন। এই আনন্দ তার জন্যও একটি উপহার।”

‘হ্যান্ড অব গড’ এখন ফুটবল ইতিহাসের অংশ

আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় দৈনিক ক্লারিন-এর কলামিস্ট হেক্টর গাম্বিনি লিখেছেন, ১৯৮৬ সালের সেই বিতর্কিত গোল এখন ফুটবল ইতিহাসের অংশমাত্র।তার মতে, বর্তমান প্রজন্মের কোনো খেলোয়াড়ই তখন জন্মায়নি। আর আজকের দিনে ভিএআর থাকলে ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল বাতিল হয়ে যেত।

ম্যারাডোনার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর স্বীকারোক্তি

ম্যারাডোনার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মারিয়ানো ইসরায়েলিতের মতে, এখন সর্বকালের সেরা ফুটবলারের আসনে মেসিই এগিয়ে।তিনি বলেন, “একসময় দিয়েগোই ছিলেন সেরা। কিন্তু এখন মেসি তাকে ছাড়িয়ে গেছে। মেসির অর্জনকে ছাপিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।”তবে ইংল্যান্ডের সমালোচনার জবাবে তিনি ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের বিতর্কিত গোলের কথাও মনে করিয়ে দেন। তার বক্তব্য, ইংল্যান্ডও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়।

স্পেনের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষা

কার্লোস ম্যাক অ্যালিস্টারের বিশ্বাস, ইংল্যান্ড ম্যাচে আর্জেন্টিনা নিজেদের সামর্থ্যের ৯০ শতাংশ দেখিয়েছে।“স্পেনকে হারাতে হলে ১০০ শতাংশ দিতে হবে। আগে হৃদয় আর লড়াই ছিল, কিন্তু সূক্ষ্মতা ছিল না। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আমরা দেখিয়ে দিয়েছি, সেই ঘাটতিও আর নেই।”উরুগুয়ের সাংবাদিক এমিলিয়ানো হার্নান্দেজ পেরেইরার মতে, অনেক উরুগুইয়ান আর্জেন্টিনার সমালোচনা করলেও বাস্তবে তারা এই দলটিকেই হিংসা করেন।তার কথায়, “এটা কোনো ভাগ্যের দল নয়। আর্জেন্টিনার মধ্যে এমন এক বিশেষ গুণ আছে, যা এই বিশ্বকাপে অন্য কোনো দলের মধ্যে দেখা যায়নি।”

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles