Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: সিবিএসই-র অন-স্ক্রিন মার্কিং (OSM) বিতর্ক যত গভীরে যাচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে এটি নিছক প্রযুক্তিগত গোলযোগের ঘটনা নয়। সম্প্রতি প্রকাশিত নথি ও রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, সতর্কবার্তা ছিল, পরীক্ষামূলক রিপোর্ট ছিল, বিশেষজ্ঞদের আপত্তি ছিল কিন্তু সেগুলি উপেক্ষা করেই একটি অসম্পূর্ণ ব্যবস্থাকে কোটি কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখন প্রশ্ন উঠছে: এটি কি প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা, নাকি প্রশাসনিক ঔদ্ধত্য?
সতর্কবার্তা ছিল স্পষ্ট
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সিবিএসই নিজেই একটি তিন দিনের ‘ড্রাই রান’ বা পরীক্ষামূলক মূল্যায়ন পরিচালনা করে। সেই ড্রাই রানে অংশগ্রহণকারী শিক্ষক, পরীক্ষক, প্রধান পরীক্ষক এবং শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের বড় অংশই স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন — OSM ব্যবস্থা অন্তত আরও এক বছর পরীক্ষামূলকভাবে চালিয়ে ত্রুটিমুক্ত না করা পর্যন্ত পূর্ণমাত্রায় প্রয়োগ করা উচিৎ নয়। তাঁদের নির্দিষ্ট আপত্তিগুলি ছিল:
- OSM সফটওয়্যার বারবার ত্রুটি তৈরি করছে
- পরীক্ষকদের যথেষ্ট প্রশিক্ষণ নেই
- মূল্যায়ন কেন্দ্রগুলির অবকাঠামো প্রস্তুত নয়
- প্রযুক্তিগত ত্রুটি সংশোধনের প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর
এটি কোনও বাইরের সমালোচকের মতামত ছিল না, এটি ছিল সিবিএসই-র নিজের উদ্যোগে করা মূল্যায়নের ফলাফল। তবু বোর্ড সেই পরামর্শ শোনেনি।
নম্বর বাড়াতে গিয়ে কমে গেল
ড্রাই রানে ধরা পড়া কিছু ত্রুটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। একটি ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন অতিরিক্ত প্রধান পরীক্ষক কোনও উত্তরপত্রে ১.৫ নম্বর বাড়িয়েছিলেন। কিন্তু সফটওয়্যার সেটিকে বৃদ্ধি হিসেবে না দেখিয়ে ১.৫ নম্বর হ্রাস হিসেবে গণনা করেছে অর্থাৎ নম্বর বাড়ানোর নির্দেশই নম্বর কেটে দেওয়ার নির্দেশে পরিণত হয়েছে।
এ ছাড়া মূল্যায়ন স্কিম এবং সফটওয়্যারের মধ্যে অসামঞ্জস্যের অভিযোগও উঠেছে। পরীক্ষকদের হাতে থাকা মার্কিং স্কিমে যা ছিল, কম্পিউটার স্ক্রিনে অনেক ক্ষেত্রে তার সঙ্গে মিল পাওয়া যাচ্ছিল না।
তিন দিনেও মেলেনি সমাধান
ড্রাই রানের প্রথম দিন যে সমস্যাগুলি ধরা পড়েছিল, সেগুলির অনেকগুলিই তৃতীয় দিন পর্যন্ত সমাধান করা যায়নি। অর্থাৎ সিস্টেমটি যে অপরিণত অবস্থায় ছিল, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রায় সবাই একমত ছিলেন। তবু ফেব্রুয়ারিতে পরীক্ষার আগে বোর্ড পূর্ণমাত্রায় OSM চালুর সিদ্ধান্ত নেয়। এই তাড়াহুড়োর কারণ কী ছিল, সেটিই এখন তদন্তের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।
‘ব্লাইন্ড চেকিং’-এর আশঙ্কা
ড্রাই রানের দ্বিতীয় রিপোর্টে আরও গুরুতর পর্যবেক্ষণ উঠে আসে। সেখানে অন্তত ৩৬টি প্রযুক্তিগত, কার্যগত এবং মূল্যায়ন-সংক্রান্ত সমস্যা চিহ্নিত করা হয়। রিপোর্টে সতর্ক করা হয় যে এই ব্যবস্থায় উত্তরপত্র সম্পূর্ণ না পড়েই নম্বর দিয়ে দেওয়ার অর্থাৎ ‘blind or superficial checking’-এর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
রিপোর্টে আরও বলা হয়, পরীক্ষকদের মধ্যে আলোচনা, মতবিনিময় এবং মান নির্ধারণের যে প্রথাগত প্রক্রিয়া রয়েছে, OSM সেই সুযোগ প্রায় বন্ধ করে দিচ্ছে ফলে মূল্যায়নের মান ও সামঞ্জস্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শিক্ষা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ।
গভর্নিং বডির পরামর্শও অগ্রাহ্য
২০২৫ সালের জুনে সিবিএসই-র গভর্নিং বডির বৈঠকেও সদস্যরা পরামর্শ দিয়েছিলেন যে OSM চালুর আগে বিভিন্ন আঞ্চলিক দফতরে পাইলট প্রকল্প চালানো উচিৎ — কয়েকটি বিষয় বেছে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষা করে তারপর পূর্ণ বাস্তবায়নের দিকে যাওয়া উচিৎ। সিবিএসই-র ২২টি আঞ্চলিক দফতর থাকা সত্ত্বেও তা করা হয়নি। বরং মাত্র পাঁচটি দিল্লির স্কুলে সীমিত ড্রাই রান চালিয়ে বোর্ড গোটা দেশের জন্য ব্যবস্থা চালু করে দেয়।
ফল যা হওয়ার, তাই হয়েছে
ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই অভিযোগের পাহাড় জমতে শুরু করে। ঝাপসা স্ক্যান করা উত্তরপত্র, ভুল নম্বর, মূল্যায়ন নিয়ে বিভ্রান্তি, রিভ্যালুয়েশন পোর্টালের সমস্যা — সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরে জানা যায়, প্রায় ৬৮ হাজার উত্তরপত্র পুনরায় স্ক্যান করতে হয়েছে এবং ১৩ হাজারের বেশি উত্তরপত্র শেষ পর্যন্ত হাতে মূল্যায়ন করতে হয়েছে। এমনকি উত্তরপত্র অদলবদলের ঘটনাও ধরা পড়ে। অর্থাৎ যে প্রযুক্তির মানবিক ভুল কমানোর কথা ছিল, সেটিই নতুন ধরনের ভুলের উৎস হয়ে দাঁড়ায়।
আজ হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী নম্বর নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, আদালতে জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে এবং সিবিএসই-র শীর্ষ কর্তাদের পদচ্যুত করা হয়েছে।
প্রশ্ন এখন জবাবদিহির
ডিজিটালাইজেশন কোনও জাদুর কাঠি নয়। প্রযুক্তি তখনই কার্যকর হয়, যখন সেটি যথেষ্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং বাস্তব প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে যায়। সিবিএসই-র নিজের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছিলেন। গভর্নিং বডি সতর্ক করেছিল। ড্রাই রান সতর্ক করেছিল। প্রযুক্তিগত ত্রুটি সতর্ক করেছিল। কিন্তু সিদ্ধান্তগ্রহণকারীরা সেই সতর্কবার্তাগুলিকে গুরুত্ব দেননি।
অনেকেই এখন প্রশ্ন তুলছেন — এটি কি অবিবেচক তাড়াহুড়ো ছিল, নাকি আগে থেকেই নির্ধারিত একটি প্রকল্পকে যেকোনও মূল্যে বাস্তবায়নের চেষ্টা?
হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী যখন তাদের প্রাপ্ত নম্বর নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দাঁড়িয়ে, তখন প্রশ্নটি আর প্রযুক্তির নয়, প্রশ্নটি জবাবদিহির। কারণ ব্যর্থ সফটওয়্যার মেরামত করা যায়, কিন্তু একটি প্রজন্মের আস্থা ভেঙে গেলে সেটি পুনর্গঠন করা অনেক কঠিন।