হাইলাইটস
- বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা-স্পেন ম্যাচ পরিচালনা করবেন স্লোভেনিয়ার স্লাভকো ভিনচিচ।
- এটিই হবে ৪৬ বছর বয়সি এই রেফারির ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ।
- ২০২০ সালে বসনিয়ায় একটি পুলিশি অভিযানে আটক হলেও তাঁর বিরুদ্ধে কখনও কোনও অভিযোগ গঠন হয়নি।
- ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হারের ম্যাচেও রেফারি ছিলেন ভিনচিচ।
- ইউরো ২০২৪ সেমিফাইনালে স্পেনের জয়ের ম্যাচও পরিচালনা করেছিলেন তিনি।
- বিশ্বকাপ ফাইনালের দায়িত্ব পাওয়ার খবর শুনে আবেগে কেঁদে ফেলেছিলেন ভিনচিচ।
বিশ্বকাপের ফাইনাল শুধু ফুটবলারদের কাছেই নয়, রেফারিদের কাছেও ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ সম্মান। রবিবার আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যকার বিশ্বকাপ ফাইনালে সেই বিরল সম্মান পাচ্ছেন স্লোভেনিয়ার স্লাভকো ভিনচিচ। তবে এই ম্যাচের বিশেষত্ব আরও একটি কারণে। এটিই হবে তাঁর দীর্ঘ রেফারিং জীবনের শেষ ম্যাচ। শেষ বাঁশি বাজানোর পরই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানাবেন তিনি।
আজ তিনি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা রেফারি। কিন্তু ছয় বছর আগে তাঁর ক্যারিয়ার এক মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে যেতে পারত। ২০২০ সালের ৩০ মে বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিজেলিনার কাছে একটি খামারবাড়িতে পুলিশ অভিযান চালায়। অভিযোগ ছিল, সেখানে আন্তর্জাতিক যৌনপাচার ও মাদকচক্রের আসর বসেছিল। অভিযানে ৩৫ জনকে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ভিনচিচও।ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। কিন্তু তদন্তে উঠে আসে, তিনি অভিযুক্ত চক্রের সদস্য নন। ভিনচিচের দাবি ছিল, ব্যবসায়িক কাজে সেখানে গিয়েছিলেন এবং একটি মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন। সেটিই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্তে পরিণত হয়।পরে তিনি স্লোভেনিয়ার টেলিভিশনকে বলেন, ঘটনাস্থলে তিনি সম্পূর্ণ কাকতালীয়ভাবে উপস্থিত ছিলেন। তদন্তে তাঁকে সাক্ষী হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং কোনও অভিযোগ ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হয়। তাঁর বিরুদ্ধে কখনও মামলা দায়েরও হয়নি। স্লোভেনিয়ান ফুটবল রেফারিজ অ্যাসোসিয়েশনও জানিয়ে দেয়, সরকারি ও বেসরকারি সূত্রে তারা নিশ্চিত হয়েছে যে ভিনচিচ কোনও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।তাঁর পরিবারও একসময় সেই অঞ্চল ছেড়ে স্লোভেনিয়ায় চলে এসেছিল। সত্তরের দশকের শুরুতে তাঁর বাবা-মা বসনিয়া ছেড়ে মারিবরে বসতি গড়েন। সেখানেই বড় হয়ে ওঠেন ভিনচিচ। তাঁর বাবা ছিলেন বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী।শৈশবে ফুটবল নয়, বাস্কেটবলই ছিল তাঁর প্রথম ভালোবাসা। পরে টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা করেন। কিছুদিন খেলাধুলা থেকে দূরে থাকলেও একসময় মনে হয় জীবনে যেন কিছু একটা অনুপস্থিত। সেই সময় তাঁর এক কাকা, যিনি সহকারী রেফারি ছিলেন, তাঁকে রেফারিংয়ে আসার পরামর্শ দেন। ২০ বছর বয়সে হাতে বাঁশি তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তই বদলে দেয় তাঁর জীবন।
ধাপে ধাপে ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবল, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ইউরো এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ—সব বড় মঞ্চেই নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল শান্ত স্বভাব, নিয়ন্ত্রণক্ষমতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণে আত্মবিশ্বাস।তবে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কাছে তাঁর নাম সুখস্মৃতি নয়। কাতার বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচে রেফারি ছিলেন ভিনচিচ। সেই ম্যাচে তিনটি আর্জেন্টাইন গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হয়। লিওনেল মেসির একটি এবং লাউতারো মার্তিনেজের দুটি গোল বাতিল হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অঘটনের সঙ্গে তাই তাঁর নাম জড়িয়ে রয়েছে।অন্যদিকে স্পেনের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি ইতিবাচক। তাঁদের চারটি ম্যাচ পরিচালনা করেছেন ভিনচিচ এবং কোনওটিতেই স্পেন হারেনি। এর মধ্যে রয়েছে ইউরো ২০২৪-এর সেমিফাইনাল, যেখানে লামিন ইয়ামাল ও দানি ওলমোর গোলে ফ্রান্সকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে স্পেন। পরে সেই প্রতিযোগিতার শিরোপাও জেতে তারা।
তবে অতীতের পরিসংখ্যান বা স্মৃতি কোনও রেফারির সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে না। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ভিনচিচের ভাবমূর্তি বরাবরই নিরপেক্ষ ও পেশাদার। কোনও নির্দিষ্ট দলকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ কখনও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠেনি।বিশ্বকাপ ফাইনালের দায়িত্ব পাওয়ার মুহূর্তটিও তাঁর কাছে ছিল অবিস্মরণীয়। ফিফার রেফারিং প্রধান যখন ফোন করে এই খবর দেন, তখন নিজের মুখ দু’হাতে ঢেকে ফেলেন ভিনচিচ। স্লোভেনিয়ার সংবাদমাধ্যম জানায়, আবেগে তাঁর চোখে জল এসে গিয়েছিল।ফিফাকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, প্রথমে তিনি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তারপর আনন্দে কেঁপে উঠেছিলেন। বিশ্বকাপ ফাইনাল পরিচালনা করা প্রতিটি রেফারির স্বপ্ন, আর সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।তবে সাফল্যের মধ্যেও তিনি সবসময় সংযত থেকেছেন। তাঁর বিশ্বাস, অতিরিক্ত প্রত্যাশা শেষ পর্যন্ত বড় হতাশার কারণ হতে পারে। তাই তিনি বরাবরই এক ম্যাচ করে এগোনোর নীতি মেনেছেন।
রবিবারের ফাইনালে কোটি কোটি মানুষের চোখ থাকবে মেসি, ইয়ামাল বা দুই দলের তারকাদের দিকে। কিন্তু মাঠের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হবেন স্লাভকো ভিনচিচ। বিতর্ক, সন্দেহ এবং দীর্ঘ পরিশ্রমের পথ অতিক্রম করে তিনি পৌঁছেছেন ফুটবল বিশ্বের সর্বোচ্চ মঞ্চে। আর শেষ বাঁশির সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হবে এমন এক রেফারির অধ্যায়, যিনি প্রমাণ করেছেন—একটি ভুল সময়ে ভুল জায়গায় উপস্থিত থাকা জীবনের পরিচয় নয়; প্রকৃত পরিচয় গড়ে ওঠে সততা, ধৈর্য এবং কাজের উৎকর্ষে