Home পরিবেশ ও জলবায়ূ জি-৭ বৈঠকে জলবায়ু কার্যত নির্বাসিত

জি-৭ বৈঠকে জলবায়ু কার্যত নির্বাসিত

ট্রাম্পকে খুশি রাখতে প্যারিসের পরিবেশ সম্মেলনে ‘জলবায়ু’ শব্দটিই উচ্চারিত হল না

by বাংলাস্ফিয়ার
0 comments 2 views 4 minutes read
A+A-
Reset

প্যারিস | বিশেষ প্রতিবেদন

“স্পষ্ট করে বলি, আমরা জলবায়ু নিয়ে আলোচনা করব না।”

কূটনৈতিক ভাষার আড়াল না রেখে সরাসরি এই কথাই বলে দিয়েছিলেন ফ্রান্সের পরিবেশমন্ত্রী মোনিক বারবু। প্যারিসে অনুষ্ঠিত জি-৭ পরিবেশমন্ত্রীদের বৈঠকের আগে সংবাদমাধ্যম এবং পরিবেশবাদী সংগঠনগুলির সঙ্গে আলোচনায় তিনি এই অবস্থান জানিয়ে দেন।

শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও বাস্তব এটাই—বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশ-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তন ছিল কার্যত নিষিদ্ধ বিষয়।

কারণ একটাই: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরেই সংশয়বাদী অবস্থান নিয়ে আসা ট্রাম্প প্রশাসন এই ইস্যুকে তাদের অন্যতম ‘লাল দাগ’ বা অগ্রহণযোগ্য বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ফলে কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে গঠিত জি-৭ গোষ্ঠীর ঐক্য অটুট রাখতে ফ্রান্সকে বড় ধরনের ছাড় দিতে হয়েছে।

একসময় যারা জলবায়ু নেতৃত্ব দিত

পরিস্থিতির বিদ্রূপ এখানেই।

এই জি-৭ দেশগুলিই বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রায় এক-চতুর্থাংশের জন্য দায়ী। অতীতে তারাই বহু গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু প্রতিশ্রুতির পথপ্রদর্শক ছিল।

২০২২ সালে এই দেশগুলিই ঘোষণা করেছিল যে ২০৩৫ সালের মধ্যে তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার অধিকাংশ অংশকে কার্বনমুক্ত করা হবে।

কিন্তু ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তনের পর সেই ঐকমত্য ভেঙে পড়েছে। এখন জলবায়ু প্রশ্নে সাত দেশের যৌথ অবস্থান গড়ে তোলা কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

ফরাসি পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা অকপটে বলেন,

“আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার ছিল জি-৭-এর ঐক্য বজায় রাখা। যদি আমরা জলবায়ু নিয়ে আলোচনা শুরু করি, তাহলে আর জি-৭ বলে কিছু থাকবে না।”

অর্থাৎ, জলবায়ু নিয়ে কথা বলার চেয়ে জি-৭-এর রাজনৈতিক অস্তিত্ব বজায় রাখাই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সমালোচকদের চোখে ‘হারানো সুযোগ’

অনেক পর্যবেক্ষকের কাছে এই সিদ্ধান্ত এক ঐতিহাসিক ব্যর্থতা।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ থেকে সৃষ্ট নতুন জ্বালানি সংকট আবারও প্রমাণ করেছে যে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমানো কতটা জরুরি। অথচ ঠিক সেই সময়েই বিশ্বের ধনী গণতান্ত্রিক দেশগুলি জলবায়ু নিয়ে মুখ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

পরিবেশবাদী সংগঠন 350.org-এর ফ্যানি পেতিবোঁর ভাষায়,

“এটা শুধু হাস্যকর নয়, ভণ্ডামিও বটে।”

গত বছর অনুষ্ঠিত কপ-৩০ জলবায়ু সম্মেলনের ফলাফল নিয়ে ফ্রান্স নিজেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল। কারণ সেই সম্মেলনে কয়লা, তেল ও গ্যাস ধাপে ধাপে বন্ধ করার কোনও রোডম্যাপ গৃহীত হয়নি।

সমালোচকদের মতে, প্যারিসের এই বৈঠক সেই শূন্যতা পূরণের সুযোগ দিতে পারত। কিন্তু ফ্রান্স ইচ্ছাকৃতভাবে সেই সুযোগ নষ্ট করেছে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল, এই বৈঠকের পরপরই কলম্বিয়ায় জীবাশ্ম জ্বালানি পরিত্যাগ নিয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। জি-৭ চাইলে তার আগে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা দিতে পারত।

সেটাও হল না।

তাহলে আলোচনা হল কী নিয়ে?

জলবায়ু বাদ গেলেও বৈঠক পুরোপুরি নিষ্ফল নয়—এমনটাই দাবি ফরাসি সরকারের।

তাদের যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন না করে অন্যান্য পরিবেশগত বিষয়গুলিতে সহযোগিতা বজায় রাখা জরুরি।

এক ফরাসি কর্মকর্তা বলেন,

“বিষয়টি সাদা-কালো নয়। আমেরিকার সঙ্গে এখনও অনেক ক্ষেত্রে কাজ করা সম্ভব।”

এই লক্ষ্যেই ফ্রান্স বৈঠকের জন্য পাঁচটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে।

প্রথমত, প্রকৃতি ও মানুষের স্বার্থে অর্থায়ন বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠন।

এই জোটে উন্নয়ন ব্যাঙ্ক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, দাতব্য সংস্থা এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলিকে একত্রিত করে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

এছাড়া আরও কয়েকটি ঘোষণাপত্র গ্রহণের চেষ্টা চলছে—

মরুকরণ ও তার নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি,

সমুদ্র সংরক্ষণ ও সামুদ্রিক সুরক্ষিত অঞ্চল গড়ে তোলা,

অবৈধ মাছ ধরা রোধ,

পিএফএএস বা তথাকথিত ‘ফরএভার কেমিক্যাল’ দূষণ,

মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ,

এবং চরম আবহাওয়ার বিরুদ্ধে আবাসন ও অবকাঠামোর স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি।

মজার বিষয় হল, শেষের বিষয়টি আসলে পরোক্ষভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গেই সম্পর্কিত। কিন্তু ‘জলবায়ু’ শব্দটি উচ্চারণ না করেই তা নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা চলছে।

আপসেরও সীমা আছে

তবুও এই সমঝোতাগুলিও কতটা টিকবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

এক কূটনৈতিক সূত্রের ভাষায়,

“আমরা খুব সরু দড়ির উপর হাঁটছি। অন্য ছয়টি দেশের কাছে আমাদের প্রস্তাব যথেষ্ট উচ্চাভিলাষী নয়। আবার আমেরিকা সেগুলি মেনে নেবে কিনা, সেটাও নিশ্চিত নয়।”

অর্থাৎ, জলবায়ু প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়েও জি-৭ সম্পূর্ণ ঐকমত্যে পৌঁছতে পারবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।

প্যারিসের নীরবতা, কিন্তু উদ্বেগ রয়ে গেছে

সরকারিভাবে জলবায়ু আলোচনার দরজা বন্ধ থাকলেও ফ্রান্স বিষয়টি পুরোপুরি ছাড়ছে না।

জি-৭ বৈঠকের বাইরে ৪ মে মিথেন গ্যাস নির্গমন কমানোর প্রশ্নে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে মন্ত্রী, বিজ্ঞানী এবং শিল্পজগতের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।

মিথেন কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় বহু গুণ বেশি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস।

ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক-এর গাইয়া ফেব্রেভর সতর্ক করে বলেছেন,

“কোম্পানিগুলির স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। বাধ্যতামূলক নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। আমেরিকাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে নিষ্ক্রিয় থাকার সুযোগ নেই।”

মূল প্রশ্ন

প্যারিসের এই বৈঠক আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক গভীর বাস্তবতা সামনে এনে দিয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনকে বিজ্ঞানীরা মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি হুমকি বলে সতর্ক করছেন। কিন্তু বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনৈতিক গোষ্ঠী সেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতেই রাজি নয়—শুধুমাত্র একটি সদস্য দেশের আপত্তির কারণে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে: আজ যদি জলবায়ু নিয়ে কথা বলাই অসম্ভব হয়ে পড়ে, তাহলে আগামী দশকে বিশ্বের জলবায়ু নীতির নেতৃত্ব দেবে কে?

প্যারিসের জি-৭ বৈঠক সেই প্রশ্নের কোনও উত্তর দেয়নি। বরং দেখিয়ে দিয়েছে, ভূরাজনীতি যখন পরিবেশের উপরে স্থান পায়, তখন জলবায়ু সংকটও কূটনৈতিক আপসের বলি হতে পারে

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles