Home স্বাস্থ্য সুস্থ দাঁত ও মাড়ির জন্য ৭টি দৈনন্দিন অভ্যাস

সুস্থ দাঁত ও মাড়ির জন্য ৭টি দৈনন্দিন অভ্যাস

by বাংলাস্ফিয়ার
0 comments 4 views 6 minutes read
A+A-
Reset

আপনার মুখের স্বাস্থ্য যে শরীরের বাকি অংশের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত, তা জেনে অবাক হতে পারেন। দাঁত ও মাড়িকে কীভাবে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখা যায়, জানুন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০ থেকে ৬৪ বছর বয়সী প্রতি পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্কের একজনের অন্তত একটি চিকিৎসাবিহীন দাঁতের ক্ষয় বা ক্যাভিটি রয়েছে। এমনটাই জানিয়েছে মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC)। রিপোর্ট করেছে দ‍্য ওয়াশিংটন পোস্ট।

এর পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। তবে একটি বড় কারণ হল দাঁতের চিকিৎসা মোটেই সস্তা নয়। আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের হেলথ পলিসি ইনস্টিটিউটের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, খরচের কারণে ১৩ শতাংশ মানুষ নিয়মিত দাঁতের চিকিৎসা করাতে যান না। অন্য স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ।

আরও একটি কারণ হতে পারে—অনেকেই দাঁতের ডাক্তারের কাছে যেতে ভয় পান। জার্নাল অব দ্য আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন-এ প্রকাশিত একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, ৭০ শতাংশেরও বেশি মানুষ কোনো না কোনো মাত্রায় ডেন্টাল ফোবিয়ায় ভোগেন। তাঁদের মধ্যে এক-চতুর্থাংশেরও বেশি মানুষের ভয় অত্যন্ত তীব্র। আর এই ভয়ের কারণেই প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এড়িয়ে যান।

কিন্তু মুখের স্বাস্থ্যকে অবহেলা করা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ এর সঙ্গে শরীরের আরও নানা রোগের সম্পর্ক রয়েছে। আর ভালো খবর হল, মুখের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে সব সময় দাঁতের ডাক্তারের কাছে ছুটতে হয় না। অনেক সময় শুধু বেশি জল পান করা বা কয়েকটি ছোট দৈনন্দিন অভ্যাস গড়ে তোলাই যথেষ্ট।

মুখের স্বাস্থ্য ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের যোগসূত্র
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দাঁত ও মাড়ির নানা সমস্যার সঙ্গে বিষণ্নতা, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, হাঁপানি, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং ডিমেনশিয়ার মতো রোগের সম্পর্ক রয়েছে। ৫,০০০-এরও বেশি প্রবীণ মানুষকে নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, যাঁদের মুখের স্বাস্থ্য খারাপ, তাঁদের পরবর্তী ১৫ বছরে যে কোনো কারণে মৃত্যুর ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে বেশি।

তবে এই সম্পর্কগুলির সঠিক কারণ এখনও বিজ্ঞানীরা নিশ্চিতভাবে জানেন না। নিউ ইয়র্ক শহরের দন্তচিকিৎসক এবং আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র ডা. অ্যাডা কুপারের মতে, বর্তমানে শুধু কয়েকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা রয়েছে, কারণ-ফলাফলের নির্দিষ্ট প্রমাণ নয়।

প্রথম ব্যাখ্যা হল, মাড়ির রোগ ও দাঁতের ক্ষয়—দুটিই মুখের ভেতরে প্রদাহ সৃষ্টি করে। এই প্রদাহ রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে শরীরের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে যেতে পারে।

দ্বিতীয় ব্যাখ্যা, মুখে থাকা কিছু ব্যাকটেরিয়া রক্তে প্রবেশ করে শরীরের অন্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে প্রভাবিত করতে পারে এবং বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

কিছু রোগের ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক আরও আকর্ষণীয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে সম্পর্কটি দুই দিক থেকেই কাজ করে।

উদাহরণস্বরূপ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস মুখে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে মাড়ির রোগ রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

আবার কিছু রোগের পেছনে অভিন্ন কারণ থাকতে পারে। গবেষণা বলছে, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস এবং মাড়ির রোগ—উভয়ের ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট কিছু মুখগহ্বরের ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়ার মধ্যে মিল থাকতে পারে।

তবে আরও গবেষণা না হওয়া পর্যন্ত এই সম্পর্কগুলির প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।

ডা. কুপার বলেন, “মুখের রোগ এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যার মধ্যে সম্পর্ক দেখা গেলেও, এর পেছনে অন্য কোনো সাধারণ কারণও কাজ করতে পারে।”

ধরা যাক ধূমপানের কথা। যারা ধূমপান করেন, তাঁদের দাঁতের রোগ এবং হৃদরোগ—দুইয়ের ঝুঁকিই বেশি। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে দাঁতের রোগ হৃদরোগ সৃষ্টি করছে। উভয়ের সাধারণ কারণ হতে পারে ধূমপান।

বিষণ্নতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, বিষণ্নতায় ভোগা মানুষ সাধারণত দাঁতের ডাক্তারের কাছে কম যান। ফলে তাঁদের দাঁতের ক্ষয় বা মাড়ির রোগের ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে তাঁদের মধ্যে ধূমপান বা অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার প্রবণতাও বেশি দেখা যায়, যা মুখের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

কানাডার অন্টারিওর লন্ডন শহরের পেরিওডনটিস্ট ডা. অমর সভারওয়ালের মতে, বিষণ্নতার চিকিৎসায় ব্যবহৃত অনেক ওষুধ মুখে লালার পরিমাণ কমিয়ে দেয়। এর ফলে দাঁতের ক্ষয়ের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

আবার দাঁতের ব্যথা বা দাঁত হারানোর মতো সমস্যা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা আত্মমর্যাদাবোধ ও আত্মপ্রতিকৃতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং বিষণ্নতার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

কীভাবে দাঁতের স্বাস্থ্য ভালো রাখবেন
প্রতিদিন নিজের যত্ন নেওয়ার জন্য আমাদের করণীয় কাজের তালিকা এত দীর্ঘ যে অনেক সময় দাঁতের স্বাস্থ্য সবচেয়ে নিচে চলে যায়।

ডা. কুপার জোর দিয়ে বলেন, মুখে কোনো সমস্যা না থাকলেও নিয়মিত দাঁতের ডাক্তারের কাছে যাওয়া জরুরি।

তাঁর কথায়, “নিয়মিত পরীক্ষা করলে দাঁতের সমস্যা খুব প্রাথমিক পর্যায়েই ধরা পড়ে। তখন চিকিৎসা অনেক সহজ এবং অনেক কম ব্যয়বহুল হয়। ব্যথা না থাকলেও দাঁতের সমস্যা থাকতে পারে, যা একজন দন্তচিকিৎসক দ্রুত শনাক্ত করতে পারেন।”

কত ঘনঘন দাঁতের ডাক্তারের কাছে যেতে হবে, তা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন।

কেউ বছরে এক বা দু’বার গেলেই সুস্থ থাকেন, আবার কারও ক্ষেত্রে আরও ঘনঘন পরীক্ষা প্রয়োজন হয়।

ডা. কুপার বলেন, “আপনার সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও দাঁতের অবস্থার ভিত্তিতে আপনার দন্তচিকিৎসকই নির্ধারণ করবেন কত সময় অন্তর পরীক্ষা বা স্কেলিং প্রয়োজন।”

যাঁদের কাছে চিকিৎসার খরচ একটি বড় সমস্যা, তাঁদের জন্য কিছু তুলনামূলক সাশ্রয়ী বিকল্প রয়েছে—

ডেন্টাল কলেজ বা দন্তচিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে কম খরচে চিকিৎসা পাওয়া যেতে পারে।
অলাভজনক সংস্থার বিশেষ ক্যাম্প, যেখানে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
আয়ের ভিত্তিতে ফি নির্ধারণকারী কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র।
কিছু দন্তচিকিৎসকের সদস্যপদভিত্তিক পরিকল্পনা, যেখানে বছরে নির্দিষ্ট অর্থ দিয়ে বিভিন্ন পরিষেবা পাওয়া যায়।
যাঁদের মুখে ক্রাউন, ব্রিজ বা ডেন্টাল ইমপ্ল্যান্ট রয়েছে, তাঁদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সেগুলি পরিষ্কার করতে হবে। এতে ঘরে বসে মুখের পরিচর্যার কার্যকারিতা অনেক বৃদ্ধি পায়।

আর যদি ব্যথা শুরু হয়, সেটিকে কখনও উপেক্ষা করবেন না।

ডা. কুপার বলেন, “ব্যথা হলে অবিলম্বে দাঁতের ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত। দাঁতে ব্যথা হওয়ার কথা নয়। মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার কথা নয়। মাড়ি ফুলে যাওয়ার কথাও নয়। এগুলি সবই কোনো সমস্যার লক্ষণ।”

দাঁত বা মাড়ির ব্যথা দাঁতের ভেতরের টিস্যু কিংবা মাড়িতে সংক্রমণের ইঙ্গিত হতে পারে।

ডা. সভারওয়াল সতর্ক করে বলেন, “দাঁতের ব্যথা উপেক্ষা করলে সংক্রমণ এমন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে, যেখানে দাঁত আর রক্ষা করা সম্ভব হয় না এবং তা তুলতে বাধ্য হতে হয়।”

তিনি আরও বলেন, “সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল দাঁত মাথা ও ঘাড়ের গভীর অংশগুলির সঙ্গে সংযুক্ত। দাঁত থেকে সংক্রমণ সেই গভীর অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লে শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে যাওয়া বা মস্তিষ্কে সংক্রমণ পৌঁছে যাওয়ার মতো ভয়াবহ জটিলতাও দেখা দিতে পারে।”

দাঁত ও মাড়িকে সুস্থ রাখার ৭টি দৈনন্দিন অভ্যাস
১. দিনে দু’বার দাঁত ব্রাশ করুন
প্রতিবার অন্তত দুই মিনিট ধরে ফ্লুরাইডযুক্ত টুথপেস্ট এবং নরম ব্রিসলের টুথব্রাশ ব্যবহার করুন। এতে মাড়ি সরে যাওয়ার ঝুঁকি কমে।

২. প্রতিদিন অন্তত একবার দাঁতের ফাঁক পরিষ্কার করুন
ডেন্টাল ফ্লস বা অন্য কোনো ইন্টারডেন্টাল ক্লিনার ব্যবহার করে দাঁতের মাঝখানের অংশ পরিষ্কার করুন।

৩. পর্যাপ্ত জল পান করুন
বেশি জল পান মুখকে আর্দ্র রাখে এবং দাঁতের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।

৪. চিনি ছাড়া চুইংগাম চিবোতে পারেন
খাবারের পর প্রায় ২০ মিনিট চিনি-মুক্ত চুইংগাম চিবোলে লালারস উৎপাদন বাড়ে। তবে যাঁদের ক্রাউন রয়েছে—যা চুইংগামে খুলে যেতে পারে—অথবা ব্রেস পরা আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এটি উপযুক্ত নাও হতে পারে।

৫. অতিরিক্ত চিনি কমান
সফট ড্রিংক, সিরিয়াল, ক্যান্ডি, মিষ্টি এবং বেকারি-পণ্য—এসবের অতিরিক্ত চিনি দাঁতের জন্য ক্ষতিকর।

৬. বারবার টুকটাক খাওয়ার অভ্যাস কমান
খাবারের মাঝখানে বারবার কিছু না কিছু খেলে পর্যাপ্ত লালারস তৈরি হয় না। ফলে খাবারের কণা মুখে বেশি সময় আটকে থাকে এবং ক্যাভিটির ঝুঁকি বাড়ে।

৭. টক বা অম্লীয় খাবার খাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে ব্রাশ করবেন না
লেবুজাতীয় ফল, ওয়াইন, ভিনিগার বা কার্বনেটেড পানীয় খাওয়ার পর ৩০ থেকে ৬০ মিনিট অপেক্ষা করুন। তার আগে ব্রাশ না করে মুখ জল দিয়ে কুলি করুন। কারণ ওই সময় দাঁত ব্রাশ করলে এনামেলের আরও ক্ষতি হতে পারে।

সারকথা: দাঁতের যত্ন শুধু সুন্দর হাসির জন্য নয়; এটি সামগ্রিক স্বাস্থ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিয়মিত পরীক্ষা, সঠিক পরিচর্যা এবং কয়েকটি সহজ দৈনন্দিন অভ্যাস আপনাকে শুধু ক্যাভিটি বা মাড়ির রোগ থেকেই রক্ষা করবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ জীবনযাপনের সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দিতে পারে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles