Home স্বাস্থ্য পুরুষের স্বাস্থ্যের আয়না কেন লিঙ্গ? 

পুরুষের স্বাস্থ্যের আয়না কেন লিঙ্গ? 

নীরব সংকেতকে কেন গুরুত্ব দেওয়া জরুরি

Authored By Diptyajit Roy Chowdhury
2 views 4 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

• যৌনক্ষমতার সমস্যা অনেক সময় হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস বা রক্তনালীর অসুখের প্রাথমিক সতর্কবার্তা হতে পারে।

• লিঙ্গে রক্তপ্রবাহের সমস্যা শরীরের অন্য গুরুতর রোগের আগাম ইঙ্গিত দেয়।

• পুরুষেরা এখনও যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে অনীহ, ফলে রোগ ধরা পড়তে দেরি হয়।

• বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরেকটাইল ডিসফাংশনকে কেবল যৌন সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

• লিঙ্গের স্বাস্থ্য আসলে সামগ্রিক শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিফলন।

লজ্জার বিষয় নয়, স্বাস্থ্যের সতর্কসংকেত

পুরুষদের স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা হলে সাধারণত হৃদ্‌রোগ, ক্যানসার, স্থূলতা বা মানসিক স্বাস্থ্যের কথা উঠে আসে। কিন্তু শরীরের এমন একটি অঙ্গ রয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের প্রথম সতর্কবার্তা বহন করে—লিঙ্গ। বিবিসিতে প্রকাশিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনে চিকিৎসক ও গবেষকেরা দেখিয়েছেন, লিঙ্গকে কেবল যৌনতার অঙ্গ হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি অনেক সময় শরীরের অভ্যন্তরে ঘটে চলা বড় কোনও সমস্যার আগাম বার্তাবাহক।

সমস্যা হল, অধিকাংশ পুরুষ এই সংকেতকে গুরুত্ব দেন না। আবার লজ্জা, সংকোচ বা সামাজিক ট্যাবুর কারণে চিকিৎসকের কাছেও যান না। ফলে যে রোগ শুরুতে ধরা পড়লে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যেত, তা পরে বড় আকার ধারণ করে।

কেন লিঙ্গকে ‘ব্যারোমিটার’ বলা হচ্ছে?

ব্যারোমিটার যেমন বায়ুমণ্ডলের চাপ মেপে আবহাওয়ার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, তেমনই লিঙ্গের কার্যকারিতা শরীরের রক্তনালী, স্নায়ুতন্ত্র, হরমোন এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়।

স্বাভাবিক উত্থান বা ইরেকশনের জন্য সুস্থ রক্তনালী, কার্যকর স্নায়ুতন্ত্র, পর্যাপ্ত হরমোন এবং মানসিক স্থিতি—সব কিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। এই ব্যবস্থার কোনও একটি অংশে সমস্যা দেখা দিলে তার প্রভাব প্রথমে লিঙ্গের কার্যকারিতায় ধরা পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক সময় ইরেকটাইল ডিসফাংশন বা উত্থানজনিত সমস্যা হৃদ্‌রোগের উপসর্গ প্রকাশের তিন থেকে পাঁচ বছর আগেই দেখা দেয়। অর্থাৎ বুকে ব্যথা শুরু হওয়ার বহু আগেই শরীর সতর্কবার্তা পাঠায়।

রক্তনালীর রোগের প্রথম সংকেত

চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি পরিচিত তত্ত্ব হল “আর্টারি সাইজ হাইপোথিসিস”। এর অর্থ, শরীরের ছোট রক্তনালীগুলি বড় রক্তনালীর তুলনায় দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

লিঙ্গে রক্ত সরবরাহকারী ধমনীগুলি হৃদ্‌যন্ত্রের ধমনীর তুলনায় অনেক সরু। ফলে কোলেস্টেরল জমা হওয়া বা রক্তনালীর ক্ষতির প্রভাব সেখানে আগে দেখা যায়।

এই কারণে অনেক পুরুষ প্রথমে যৌনক্ষমতার সমস্যায় ভোগেন, পরে তাঁদের হৃদ্‌রোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা ধমনী সংকোচনের মতো রোগ ধরা পড়ে।

অর্থাৎ লিঙ্গের সমস্যাকে উপেক্ষা করা মানে কখনও কখনও হৃদ্‌রোগের প্রাথমিক সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা করা।

ডায়াবেটিসের সঙ্গেও গভীর সম্পর্ক

ডায়াবেটিস দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে না থাকলে স্নায়ু এবং রক্তনালীর ক্ষতি করে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে যৌনক্ষমতার ওপর।

গবেষণায় দেখা গেছে, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত পুরুষদের মধ্যে ইরেকটাইল ডিসফাংশনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। অনেক ক্ষেত্রেই যৌন সমস্যা থেকেই পরে ডায়াবেটিস ধরা পড়ে।

সুতরাং, লিঙ্গের স্বাস্থ্যের অবনতি কখনও কখনও রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়ারও ইঙ্গিত হতে পারে।

হরমোন ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিফলন

পুরুষদের যৌনস্বাস্থ্যের সঙ্গে টেস্টোস্টেরন হরমোনের সম্পর্ক সুপরিচিত। কিন্তু শুধু হরমোনই নয়, মানসিক স্বাস্থ্যও এখানে বড় ভূমিকা পালন করে।

দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ, বিষণ্নতা, কর্মক্ষেত্রের চাপ, পারিবারিক অশান্তি কিংবা আত্মবিশ্বাসের অভাব যৌনক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, অনেক সময় রোগীরা শারীরিক সমস্যার চিকিৎসা খুঁজতে আসেন, কিন্তু গভীরে গেলে দেখা যায় সমস্যার মূল কারণ মানসিক চাপ বা বিষণ্নতা।

তাই যৌনস্বাস্থ্যকে শরীর ও মনের যৌথ সূচক হিসেবেও দেখা উচিত।

পুরুষেরা কেন চিকিৎসা নিতে চান না?

সমস্যার অন্যতম বড় কারণ সামাজিক মানসিকতা।

অনেক পুরুষ মনে করেন যৌনক্ষমতার সমস্যা স্বীকার করা মানে দুর্বলতা স্বীকার করা। ফলে তাঁরা চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে নীরবে সমস্যার সঙ্গে বসবাস করেন।

কেউ কেউ ইন্টারনেট বা বিজ্ঞাপনের ভরসায় তথাকথিত ‘অলৌকিক’ ওষুধ ব্যবহার করেন। এতে মূল রোগ অচিহ্নিত থেকে যায়।

চিকিৎসকদের মতে, এই নীরবতা ভাঙা জরুরি। কারণ যৌনক্ষমতার সমস্যা কোনও চরিত্রগত ব্যর্থতা নয়; এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্যসমস্যা।

জীবনযাত্রা বদলালেই অনেক ক্ষেত্রে উপকার

সুস্থ জীবনযাত্রা লিঙ্গের স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

নিয়মিত ব্যায়াম, ধূমপান বর্জন, অতিরিক্ত মদ্যপান এড়ানো, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং পর্যাপ্ত ঘুম রক্তনালীর স্বাস্থ্য ভালো রাখে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে যৌনস্বাস্থ্যের ওপরও।

যে সব অভ্যাস হৃদ্‌যন্ত্রকে সুস্থ রাখে, সেগুলিই সাধারণত লিঙ্গের কার্যকারিতাও উন্নত করে। এই কারণেই চিকিৎসকেরা বলেন, “যা হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য ভালো, তা লিঙ্গের জন্যও ভালো।”

স্বাস্থ্যনীতিতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন

বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরুষদের স্বাস্থ্য নিয়ে প্রচলিত আলোচনায় যৌনস্বাস্থ্যের বিষয়টি এখনও যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। অথচ এটি অনেক গুরুতর রোগ শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

যদি কোনও পুরুষ উত্থানজনিত সমস্যার কথা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে আসেন, তবে শুধু যৌনক্ষমতা নয়—তাঁর রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল, ওজন এবং মানসিক স্বাস্থ্যেরও মূল্যায়ন করা উচিত।

এভাবে একটি আপাত ব্যক্তিগত সমস্যা জনস্বাস্থ্যের বৃহত্তর আলোচনার অংশ হয়ে উঠতে পারে।

নীরব বার্তাকে গুরুত্ব দেওয়ার সময়

লিঙ্গের স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা এখনও অনেক সমাজে অস্বস্তিকর। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এই অস্বস্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস, হরমোনজনিত অসুখ বা মানসিক স্বাস্থ্যসংকটের মতো গুরুতর সমস্যা।

তাই যৌনক্ষমতার পরিবর্তনকে কেবল শোবার ঘরের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। পুরুষের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হলে এই নীরব সংকেতকে গুরুত্ব দিতে হবে।

কারণ অনেক সময় শরীর কথা বলতে শুরু করে এমন এক জায়গা থেকে, যেখানে আমরা সবচেয়ে কম শুনতে অভ্যস্ত। আর সেই কারণেই লিঙ্গকে পুরুষের স্বাস্থ্যের একটি নির্ভরযোগ্য ‘ব্যারোমিটার’ বলা হয়।


Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles