Table of Contents
হাইলাইটস
- ছয় মাসে দু’বার বা এক বছরে তিনবারের বেশি ইউটিআই হলে তাকে ‘রিকারেন্ট ইউটিআই’ বলা হয়।
- নারীদের শরীরের গঠনের কারণে ইউটিআই হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
- মেনোপজ, ডায়াবেটিস, যৌনজীবন, কিডনির পাথর বা মূত্রথলির সমস্যা পুনঃসংক্রমণের কারণ হতে পারে।
- বারবার ইউটিআইকে অবহেলা করলে কিডনির ক্ষতি, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ও জীবনযাত্রার মানের অবনতি হতে পারে।
- সঠিক চিকিৎসা, জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সংক্রমণ কমাতে সাহায্য করে।
মূত্রনালির সংক্রমণ বা ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (ইউটিআই) নারীদের মধ্যে অত্যন্ত সাধারণ একটি স্বাস্থ্যসমস্যা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে সংক্রমণ সেরে যায়। কিন্তু অনেক নারী বারবার একই সমস্যায় ভোগেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘রিকারেন্ট ইউটিআই’ বা পুনরাবৃত্ত মূত্রনালির সংক্রমণ।
হায়দরাবাদের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব নেফ্রোলজি অ্যান্ড ইউরোলজির ফিমেল ইউরোলজি ও রিকনস্ট্রাকটিভ ইউরোলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. সারিকা পাণ্ড্যের মতে, ছয় মাসে দুই বা তার বেশি বার, অথবা এক বছরে তিন বা তার বেশি বার ইউটিআই হলে তাকে রিকারেন্ট ইউটিআই হিসেবে ধরা হয়। এটি শুধু অস্বস্তিকর নয়, অনেক ক্ষেত্রে শরীরের গভীরে লুকিয়ে থাকা অন্য সমস্যারও ইঙ্গিত হতে পারে।
কেন নারীদের মধ্যে ইউটিআই বেশি?
পুরুষদের তুলনায় নারীদের মূত্রনালি বা ইউরেথ্রা অনেক ছোট। ফলে অন্ত্র বা ত্বকে থাকা ব্যাকটেরিয়া সহজেই মূত্রথলিতে পৌঁছে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। বিশেষ করে ই-কোলাই (E. coli) নামের ব্যাকটেরিয়া অধিকাংশ ইউটিআইয়ের জন্য দায়ী।
নারীদের শরীরের গঠন, হরমোনগত পরিবর্তন এবং কিছু বিশেষ জীবনধারাগত কারণ সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে একবার সংক্রমণ সেরে গেলেও পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।
রিকারেন্ট ইউটিআইয়ের প্রধান কারণ
ডা. পাণ্ড্যের মতে, বারবার ইউটিআই হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।
১. যৌন সম্পর্ক
যৌন মিলনের সময় মলদ্বার বা যোনিপথের আশপাশের ব্যাকটেরিয়া মূত্রনালিতে প্রবেশ করতে পারে। তাই অনেক নারীর ক্ষেত্রে যৌনসম্পর্কের পরপরই ইউটিআই দেখা যায়।
২. মেনোপজ বা ঋতুবন্ধ
মেনোপজের পর শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যায়। এর ফলে যোনিপথের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ক্ষতিকর জীবাণু সহজে বংশবৃদ্ধি করতে পারে। তাই বয়স্ক নারীদের মধ্যে রিকারেন্ট ইউটিআইয়ের প্রবণতা বেশি।
৩. ডায়াবেটিস
রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। একই সঙ্গে প্রস্রাবে অতিরিক্ত গ্লুকোজ ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
৪. মূত্রথলি সম্পূর্ণ খালি না হওয়া
কিছু স্নায়বিক রোগ, পেলভিক অঙ্গের সমস্যা বা মূত্রথলির কার্যকারিতার ত্রুটির কারণে প্রস্রাব পুরোপুরি বেরোয় না। অবশিষ্ট প্রস্রাব জীবাণুর বংশবৃদ্ধির ক্ষেত্র তৈরি করে।
৫. কিডনি বা মূত্রনালিতে পাথর
পাথর থাকলে মূত্রপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং জীবাণু সহজে জমা হতে পারে। ফলে সংক্রমণ বারবার ফিরে আসে।
৬. জন্মগত বা গঠনগত ত্রুটি
কিছু নারীর মূত্রনালির গঠনগত সমস্যার কারণে সংক্রমণ বারবার হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে বিশেষ পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয়।
কোন লক্ষণগুলো অবহেলা করা যাবে না?
রিকারেন্ট ইউটিআইয়ের লক্ষণ সাধারণ ইউটিআইয়ের মতোই হলেও বারবার ফিরে আসে। এর মধ্যে রয়েছে—
- প্রস্রাবের সময় জ্বালা বা ব্যথা
- ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ
- অল্প অল্প প্রস্রাব হওয়া
- প্রস্রাবে দুর্গন্ধ
- প্রস্রাব ঘোলা বা রক্তমিশ্রিত হওয়া
- তলপেটে ব্যথা বা চাপ অনুভব
- জ্বর, কাঁপুনি বা কোমরে ব্যথা (সংক্রমণ কিডনিতে ছড়িয়ে পড়লে)
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব উপসর্গ বারবার দেখা দিলে শুধু ওষুধ খেয়ে সাময়িকভাবে সমস্যা চাপা দেওয়া উচিত নয়। কারণ এর পেছনে বড় কোনও কারণ লুকিয়ে থাকতে পারে।
কেন অবহেলা করা বিপজ্জনক?
অনেক নারী ইউটিআইকে ‘সাধারণ সমস্যা’ ভেবে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু বারবার সংক্রমণ হলে তা কিডনিতে পৌঁছে পাইলোনেফ্রাইটিস নামের গুরুতর সংক্রমণ সৃষ্টি করতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে কিডনির কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। পাশাপাশি বারবার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া তৈরি হতে পারে, যা ভবিষ্যতের চিকিৎসাকে আরও কঠিন করে তোলে।
এ ছাড়া ঘন ঘন জ্বালা, ব্যথা, ঘুমের সমস্যা এবং মানসিক চাপ রোগীর জীবনযাত্রার মানও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।
কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
রিকারেন্ট ইউটিআইয়ের ক্ষেত্রে চিকিৎসক সাধারণত প্রস্রাব পরীক্ষা এবং ইউরিন কালচার করার পরামর্শ দেন। এর মাধ্যমে কোন জীবাণু সংক্রমণ ঘটাচ্ছে এবং কোন অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর হবে তা জানা যায়।
প্রয়োজনে আল্ট্রাসাউন্ড, সিটি স্ক্যান, সিস্টোস্কোপি বা অন্যান্য বিশেষ পরীক্ষা করা হতে পারে, যাতে পাথর, গঠনগত ত্রুটি বা অন্য কোনও জটিলতা আছে কি না তা বোঝা যায়।
প্রতিরোধের উপায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু সহজ অভ্যাস রিকারেন্ট ইউটিআইয়ের ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে।
- পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
- প্রস্রাব চেপে রাখবেন না।
- যৌনসম্পর্কের পরে প্রস্রাব করুন।
- ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন।
- সামনের দিক থেকে পিছনের দিকে পরিষ্কার করার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
- ডায়াবেটিস থাকলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করবেন না।
শেষ কথা
রিকারেন্ট ইউটিআই কোনও সাধারণ অসুবিধা নয়; এটি শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হতে পারে। বারবার সংক্রমণ হলে শুধু তাৎক্ষণিক উপশমের দিকে নজর না দিয়ে মূল কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। সময়মতো চিকিৎসা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা অনুসরণ করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। নারীদের উচিত বারবার ইউটিআইকে অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া, যাতে ভবিষ্যতের জটিলতা এড়ানো যায়।