Home স্বাস্থ্য দিনের আলো থেকে রাতের ঘুম: সারাদিনের ছয় অভ্যাসেই লুকিয়ে ভালো নিদ্রার রহস্য

দিনের আলো থেকে রাতের ঘুম: সারাদিনের ছয় অভ্যাসেই লুকিয়ে ভালো নিদ্রার রহস্য

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
10 views 6 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

  • শুধু শোওয়ার আগের অভ্যাস নয়, দিনের কর্মকাণ্ডও ঘুমের গুণমান নির্ধারণ করে।
  • সকালে সূর্যের আলো শরীরের জৈবঘড়িকে সঠিক ছন্দে রাখে।
  • নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়াদাওয়া করলে ঘুমের সমস্যা কমতে পারে।
  • ক্যাফেইনের প্রভাব অনেকের শরীরে ১২ ঘণ্টারও বেশি স্থায়ী হয়।
  • কিছু ওষুধ রাতে খেলে ঘুম ব্যাহত হতে পারে।
  • প্রতিদিন একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠা ও নিয়মিত ব্যায়াম ভালো ঘুমের অন্যতম চাবিকাঠি।

ঘুম ভালো করার পরামর্শ বলতে আমরা সাধারণত বুঝি শোওয়ার ঠিক আগে কী করা উচিত। আলো কমিয়ে দেওয়া, মোবাইল স্ক্রিন থেকে দূরে থাকা, ঘর ঠান্ডা রাখা বা পর্দা টেনে দেওয়া—এইসব নিয়ম প্রায় সকলেরই জানা। ঘুম বিশেষজ্ঞরাও দীর্ঘদিন ধরে এই অভ্যাসগুলির গুরুত্বের কথা বলে আসছেন।

কিন্তু ঘুমের বিজ্ঞান এখন বলছে, বিষয়টি কেবল রাতের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দিনের বেলায় আমরা কী করছি, কখন খাচ্ছি, কখন সূর্যের আলোয় যাচ্ছি, কতটা ক্যাফেইন খাচ্ছি কিংবা কখন ব্যায়াম করছি—এসবের সম্মিলিত প্রভাবই রাতে ঘুমের মান নির্ধারণ করে।

ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশনের গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক বিষয়ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি জোসেফ ডিজারজেউস্কির মতে, অনেকেই ঘুমের সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে কেবল রাতের অভ্যাসের দিকে নজর দেন। অথচ দিনের সিদ্ধান্তগুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈবঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম সারাদিন ধরে নানা সংকেত সংগ্রহ করে। সেই সংকেতের ভিত্তিতেই শরীর ঠিক করে কখন সতেজ থাকতে হবে আর কখন বিশ্রামের প্রস্তুতি নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভালো ঘুমের জন্য দিনের ছয়টি অভ্যাস বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সকালে সূর্যের আলোয় থাকুন

ঘুম থেকে ওঠার এক ঘণ্টার মধ্যে প্রাকৃতিক সূর্যালোকের সংস্পর্শে আসা শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘুম-চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইন্দিরা গুরুভাগাভাতুলার মতে, সকালের আলো শরীরে এমন কিছু হরমোনের নিঃসরণ কমিয়ে দেয় যা ঘুমঘুম ভাব সৃষ্টি করে। একইসঙ্গে এটি শরীরকে ‘জাগ্রত অবস্থায়’ নিয়ে যায় এবং রাতের নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম পাওয়ার প্রস্তুতি তৈরি করে।

মানবদেহের জৈবঘড়ি মূলত আলো-অন্ধকারের চক্রের ওপর নির্ভরশীল। সকালে আলো পেলে মস্তিষ্ক বুঝতে পারে যে দিন শুরু হয়েছে। ফলে দিনের বেলায় সতর্কতা ও কর্মক্ষমতা বাড়ে, আর রাতে ঘুমের হরমোন মেলাটোনিন যথাসময়ে নিঃসৃত হয়।

আদর্শ পরিস্থিতিতে প্রতিদিন সকালে অন্তত এক ঘণ্টা বাইরে কাটানো ভালো। কিন্তু বাস্তবে সবার পক্ষে তা সম্ভব হয় না। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জানালার পর্দা খুলে দেওয়া, বারান্দায় বসে চা বা কফি খাওয়া, কিংবা জানালার কাছে বসে কাজ করাও উপকারী হতে পারে। এমনকি মেঘলা দিনেও কয়েক মিনিটের সূর্যালোক সম্পূর্ণ ঘরের মধ্যে থাকার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর।

যাঁদের পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া কঠিন, তাঁরা বিশেষ আলোকযন্ত্র বা ‘লাইট বক্স’-এর সাহায্য নিতে পারেন। ঘুম থেকে ওঠার পর প্রায় আধঘণ্টা উজ্জ্বল আলোয় বসে থাকলেও কিছুটা উপকার পাওয়া যায়।

খাওয়ার সময় নির্দিষ্ট রাখুন

অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার ও রাতের খাবার খান, তাঁদের ঘুম তুলনামূলকভাবে ভালো হয়।

আমাদের শরীরে একটি ২৪ ঘণ্টার অভ্যন্তরীণ সময়সূচি কাজ করে, যাকে সার্কাডিয়ান রিদম বলা হয়। এটি শুধু ঘুম নয়, ক্ষুধা, হজম, শরীরের তাপমাত্রা এবং হরমোন নিঃসরণও নিয়ন্ত্রণ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্ত্র বা পাচনতন্ত্রও এই জৈবঘড়ির অংশ। কখন খাবার গ্রহণ করা হচ্ছে, সেই তথ্যও শরীরের সময় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে কখনও সকাল আটটায় নাস্তা, কখনও দুপুরে, কখনও আবার একেবারেই না খাওয়া—এ ধরনের অনিয়ম শরীরের স্বাভাবিক ছন্দকে বিঘ্নিত করতে পারে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল রাতের খাবারের পরিমাণ। দিনের প্রথম ভাগে তুলনামূলক ভারী খাবার এবং রাতে হালকা খাবার গ্রহণ অনেকের ক্ষেত্রে ঘুমের জন্য উপকারী হতে পারে। শোওয়ার ঠিক আগে ভারী রাতের খাবার খেলে অম্বল, অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা ঘুম ভেঙে যাওয়ার অন্যতম কারণ।

রাতে যদি খুব ক্ষুধা লাগে, তবে অল্প পরিমাণে সহজপাচ্য খাবার খাওয়াই ভালো। অতিরিক্ত চর্বি বা চিনি সমৃদ্ধ খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।

ক্যাফেইনের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে ভাবুন

ক্যাফেইন ঘুমের অন্যতম বড় শত্রু—এ কথা অনেকেই জানেন। সাধারণ পরামর্শ হল দুপুর দু’টার পর কফি না খাওয়া। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নিয়ম সবার ক্ষেত্রে একরকম কাজ করে না।

ঘুম ও স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ চার্লিন গামালডোর মতে, প্রত্যেক মানুষের শরীর ক্যাফেইন ভাঙে ভিন্ন গতিতে। কারও শরীর দ্রুত ক্যাফেইন নিষ্ক্রিয় করতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে এর প্রভাব অনেক বেশি সময় ধরে থাকে।

ফলে কেউ হয়তো রাতের খাবারের পর এক কাপ এসপ্রেসো খেয়েও নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়তে পারেন, আবার অন্য কেউ সকালে খাওয়া কফির প্রভাবও রাত পর্যন্ত টের পেতে পারেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু মানুষের শরীরে ক্যাফেইন ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় সক্রিয় থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে সকাল আটটার কফিও রাত আটটা বা তার পরে ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে অনিদ্রা বা ঘুমের মান খারাপ হওয়ার সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হল অন্তত দুই সপ্তাহ ক্যাফেইন সম্পূর্ণ বন্ধ রেখে পরীক্ষা করা। শুধু কফি নয়, চা, কোমল পানীয়, চকোলেট, এমনকি কফি-স্বাদযুক্ত আইসক্রিমেও ক্যাফেইন থাকতে পারে।

ঘুমে বাধা দেওয়া ওষুধ দিনের শুরুতে খান

অনেক ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষত যেসব ওষুধ শরীরকে উদ্দীপিত করে, সেগুলি রাতে খেলে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে বা মাঝরাতে বারবার ঘুম ভেঙে যেতে পারে।

এর মধ্যে রয়েছে সর্দি-কাশির কিছু ওষুধ, বিশেষ করে ফেনাইলইফ্রিন বা সিউডোইফেড্রিনজাতীয় ডিকনজেস্ট্যান্ট। এছাড়া মনোযোগঘাটতি বা অতিচঞ্চলতা সংক্রান্ত কিছু ওষুধ, হাঁপানির কিছু ওষুধ, কয়েক ধরনের অবসাদনাশক এবং স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধও ঘুমে প্রভাব ফেলতে পারে।

যদি দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের সমস্যা থেকে থাকে এবং নিয়মিত কোনো ওষুধ সেবন করেন, তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে একই ওষুধ সকালে খেলে সমস্যা কমে যায়। কখনও কখনও মাত্রা পরিবর্তন বা বিকল্প ওষুধও প্রয়োজন হতে পারে।

তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধের সময়সূচি বা মাত্রা পরিবর্তন করা উচিত নয়।

প্রতিদিন একই সময়ে ঘুম থেকে উঠুন

অনেকেই সপ্তাহের কর্মদিবসে ভোরে ওঠেন, কিন্তু ছুটির দিনে অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমান। শুনতে আরামদায়ক মনে হলেও এটি শরীরের জৈবঘড়িকে বিভ্রান্ত করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাসগুলির একটি হল প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠা। এতে শরীর একটি নির্দিষ্ট ছন্দে অভ্যস্ত হয়ে যায়।

একদিন সকাল ছয়টায় ওঠা, পরদিন দশটায়—এ ধরনের বড় পরিবর্তন ঘুমের সময়সূচি এলোমেলো করে দিতে পারে। এর প্রভাব কয়েক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

তবে সময়ের সামান্য হেরফের নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তার প্রয়োজন নেই। নিয়মিত সময়ের থেকে আধঘণ্টা আগে বা পরে ওঠা সাধারণত বড় কোনো সমস্যা তৈরি করে না। মূল কথা হল একটি নির্দিষ্ট ধারা বজায় রাখা।

ব্যায়ামের সময় নিয়েও পরীক্ষা করুন

নিয়মিত ব্যায়াম ভালো ঘুমের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কসরত করলে ঘুমের মান উন্নত হতে পারে বলে বহু গবেষণায় দেখা গেছে।

তবে ব্যায়ামের সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে রাতের দিকে কঠোর ব্যায়াম ঘুমের সমস্যা তৈরি করতে পারে। কারণ ব্যায়ামের ফলে শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং এন্ডোরফিন ও কিছু চাপ-সংশ্লিষ্ট হরমোনের মাত্রা সাময়িকভাবে বেড়ে যায়।

ফলে শরীর উত্তেজিত অবস্থায় থেকে যেতে পারে, যা ঘুমিয়ে পড়াকে কঠিন করে তোলে।

অবশ্য সবার ক্ষেত্রে এমন হয় না। অনেকেই সন্ধ্যায় বা রাতেও ব্যায়াম করে নির্বিঘ্নে ঘুমাতে পারেন। তাই নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া বোঝাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

যদি মনে হয় রাতের ব্যায়ামের পরে ঘুম আসতে দেরি হচ্ছে বা ঘুম বারবার ভেঙে যাচ্ছে, তাহলে সকালের দিকে ব্যায়াম সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে। আর যদি সেই ব্যায়াম খোলা আকাশের নিচে করা যায়, তাহলে একইসঙ্গে সকালের সূর্যালোকের সুবিধাও পাওয়া যাবে।

শেষ কথা

ভালো ঘুম কোনো একক অভ্যাসের ফল নয়। শোওয়ার আগে মোবাইল বন্ধ করা বা আলো কমানো অবশ্যই প্রয়োজনীয়, কিন্তু সেটাই পুরো গল্প নয়। ঘুম আসলে সারাদিনের জীবনযাত্রার একটি প্রতিফলন। সকালে সূর্যের আলো, নিয়মিত খাওয়াদাওয়া, ক্যাফেইন নিয়ন্ত্রণ, ওষুধের সঠিক সময়, নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠা এবং উপযুক্ত সময়ে ব্যায়াম—এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলি মিলেই রাতের শান্ত, গভীর এবং পুনরুদ্ধারকারী ঘুমের ভিত্তি গড়ে তোলে।

অর্থাৎ ভালো ঘুমের প্রস্তুতি শুরু হয় বিছানায় যাওয়ার মুহূর্তে নয়, দিনের প্রথম আলো চোখে পড়ার সঙ্গেই।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles