হাইলাইটস:
- বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিরুদ্ধে ১-১ ড্র করে বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম পয়েন্ট পেল কানাডা।
- বদলি নেমে মাত্র ১২১ সেকেন্ডের মধ্যে গোল করলেন সাইল লারিন।
- প্রথমার্ধে জোভো লুকিচের গোলে এগিয়ে গিয়েছিল বসনিয়া।
- জোনাথন ডেভিড একাধিক সুযোগ নষ্ট করেন, রিচি লারিয়ার নিশ্চিত গোল বাঁচান সিয়াদ কোলাসিনাচ।
- টরন্টো স্টেডিয়ামে জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সাক্ষী থাকলেন হাজার হাজার সমর্থক ও একাধিক তারকা।
বাংলাস্ফিয়ার: “ইতিহাস তৈরি হতে চলেছে”—কিক-অফের ঠিক আগে স্টেডিয়ামের ঘোষকের কণ্ঠে ছিল উত্তেজনার কম্পন। যদিও কানাডার জন্য শুরুটা আদর্শ হয়নি, তবু বিশ্বকাপের মঞ্চে সাইল লারিনের সমতাসূচক গোল বহুদিন মনে রাখবে দেশটি।
বসনিয়া-হার্জেগোভিনার কাছে পিছিয়ে পড়ার পর বদলি হিসেবে মাঠে নামেন লারিন। আর মাঠে নামার মাত্র ১২১ সেকেন্ড পরেই তিনি গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরান। যেন তাঁর সেই শটে জমা ছিল একরাশ ক্ষোভ—প্রথম একাদশে সুযোগ না পাওয়ার হতাশা, কিংবা আগামী মৌসুমে ইংল্যান্ডের শীর্ষ লিগে খেলার সম্ভাবনা হারানোর আক্ষেপ।
বিশ্বকাপের ‘বি’ গ্রুপের এই ম্যাচে ১-১ ড্র করে কানাডা এমন এক সাফল্য পেল, যা তাদের ফুটবল ইতিহাসে বিশেষ স্থান পাবে। চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে তারা তিনটি ম্যাচই হেরে বিদায় নিয়েছিল। এবার অন্তত প্রথম ম্যাচেই একটি পয়েন্ট অর্জন করল।
জেসি মার্শের দল শুরু থেকেই সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছিল। প্রথমার্ধে জুভেন্টাস তারকা জোনাথন ডেভিড একটি সোনালি সুযোগ হাতছাড়া করেন। দ্বিতীয়ার্ধে রিচি লারিয়ার নিশ্চিত গোলও অবিশ্বাস্য দক্ষতায় রুখে দেন বসনিয়ার সিয়াদ কোলাসিনাচ। তাঁর ব্লক থেকে বল ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে।
তবে বসনিয়াও কম যায়নি। তারা পুরো ম্যাচজুড়েই লড়াই করেছে। প্রথমার্ধে জোভো লুকিচের হেড থেকেই আসে তাদের গোল। দেশের হয়ে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে প্রথমবার শুরু করার সুযোগ পেয়েই গোল করে বসেন তিনি।
লুকিচের গোল যেন কাঁপিয়ে দেয় স্টেডিয়ামের দক্ষিণ প্রান্তকে। দর্শকসংখ্যা বাড়ানোর জন্য সেখানে অস্থায়ীভাবে ৭,০০০ আসন বসানো হয়েছিল। সেই অংশের বড় অংশ জুড়েই ছিলেন বসনিয়ার উচ্ছ্বসিত সমর্থকেরা।
গ্যালারিতে অবশ্য শুধু সাধারণ দর্শকই ছিলেন না। লারিন গোল করার পর উল্লাসে সমর্থকদের সঙ্গে হাত মেলাতে দেখা যায় অভিনেতা ও ফুটবল ক্লাব মালিক রায়ান রেনল্ডসকে। উপস্থিত ছিলেন আইস হকি তারকা কনর ম্যাকডেভিডও।
ম্যাচের পরে সাংবাদিক সম্মেলনে কোচ জেসি মার্শ জানতে পারেন আরেকজন বিখ্যাত অভিনেতাও মাঠে উপস্থিত ছিলেন। “মাইক মায়ার্স এখানে ছিলেন? দারুণ ব্যাপার!”—হাসতে হাসতে বলেন তিনি।
লারিনকে মাঠে নামানোর আগে কী বলেছিলেন, সেটিও জানান মার্শ। “আমি শুধু বলেছিলাম, বক্সের মধ্যে নিজেকে ঠিকমতো রাখো, সুযোগ তৈরি করো এবং গোল করো। আর সে তো মাঠে নেমেই সেটাই করে দেখাল।”
কানাডার কোচ অবশ্য স্বীকার করেছেন, আগামী বৃহস্পতিবার ভ্যাঙ্কুভারে কাতারের বিরুদ্ধে ম্যাচ জিততে হলে আরও উন্নতি করতে হবে। তবে নিজের দলের লড়াইয়ে তিনি গর্বিত।
“লাল জার্সির সেই সমুদ্রটা দেখতে কতটা অসাধারণ ছিল! কঠিন পরিস্থিতিতে আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছি। দর্শকদেরও ধন্যবাদ জানাতে চাই। ওরাই আমাদের খেলায় ফিরিয়ে এনেছে। গোলের পর গোটা স্টেডিয়াম যেন বিস্ফোরিত হয়েছিল।”
গোল হওয়ার পর কানাডার বদলি খেলোয়াড়রা সবাই মাঠে ছুটে আসেন। দেশের ফুটবল ইতিহাসে বহু প্রতীক্ষিত এক মুহূর্তের সাক্ষী হয় পুরো স্টেডিয়াম।
কানাডার মাটিতে প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ—এই ঘটনাই স্থানীয় সমর্থকদের কাছে ছিল উৎসবের উপলক্ষ। কিক-অফের অনেক আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল সেই উদযাপন।
৪৮টি দেশের পতাকাবাহকদের মাঝে গোপনে প্রবেশ করেন জনপ্রিয় গায়ক মাইকেল বুবলে। তিনি মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে গান পরিবেশন করেন। কিছু দর্শকের কাছ থেকে মার্কিন পতাকাকে উদ্দেশ্য করে আবারও দুয়োধ্বনি শোনা যায়।
এরপর মঞ্চে আসেন অ্যালানিস মরিসেট। তিনি কানাডার জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেন। আমেরিকার উইসকনসিনে জন্ম নেওয়া কানাডা কোচ জেসি মার্শকে দেখা যায় পুরো সঙ্গীতের প্রতিটি শব্দ গেয়ে যেতে। এর সঙ্গে ছিল কানাডার বিমানবাহিনীর বিখ্যাত ‘স্নোবার্ডস’ দলের আকাশ প্রদর্শনী, যা ব্রিটেনের ‘রেড অ্যারোজ’-এর কানাডীয় সংস্করণ হিসেবে পরিচিত।
ম্যাচের শুরুতে কানাডা যথেষ্ট আক্রমণাত্মক ফুটবল খেললেও প্রথম বড় সুযোগটি নষ্ট করেন আমার মেমিচ। এডিন জেকো সম্পূর্ণ ফিট না থাকায় তিনি এরমেদিন ডেমিরোভিচের সঙ্গে আক্রমণে শুরু করেছিলেন।
১৭ মিনিটে জোনাথন ডেভিড এমন একটি সুযোগ নষ্ট করেন, যা তাঁর মানের ফুটবলারের কাছে প্রায় অবিশ্বাস্য। সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে হতাশায় হাত মুঠো করতে দেখা যায় জেসি মার্শকে।
কিন্তু সেই হতাশা আরও বাড়িয়ে দেয় বসনিয়া।
কর্নার থেকে সাজানো এক অনুশীলিত আক্রমণ থেকে গোল আসে। ইভান বাসিচের নেওয়া কর্নারে প্রথমে বল ছুঁয়ে দেন কোলাসিনাচ। এরপর লুকিচ হেড করে বল জালে জড়িয়ে দেন। বসনিয়ার সমর্থকদের মধ্যে তখন উন্মাদনা।
বসনিয়ার কোচ সের্গেই বারবারেজও নিজের দলের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট।
“আমরা স্বাগতিক দেশের বিরুদ্ধে খেলছিলাম। প্রথম ম্যাচ, পূর্ণ স্টেডিয়াম, ৮০ শতাংশ দর্শক কানাডার সমর্থক। চাপ ছিল প্রচণ্ড। আমার দল সেই চাপে ভেঙে পড়েনি, এটাই সবচেয়ে বড় প্রশংসার বিষয়।”
দ্বিতীয়ার্ধেও কানাডা আক্রমণ চালিয়ে যায়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে গিয়ে আক্রমণগুলো বারবার থেমে যায়।
বিশেষ করে ৫৩ মিনিটে রিচি লারিয়ার শট যখন জালে ঢুকতে যাচ্ছিল, তখন কোলাসিনাচ অবিশ্বাস্য এক হস্তক্ষেপে বল ক্রসবারে পাঠিয়ে দেন। এরপর বিপদমুক্ত হয় বসনিয়া। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সাইল লারিনের গোলেই রক্ষা পায় কানাডা।
ম্যাচটি জয় দিয়ে শেষ করতে না পারলেও, বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম পয়েন্ট অর্জনের এই রাত কানাডিয়ান ফুটবলের জন্য এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। তাদের সামনে এখনও দুটি গ্রুপ ম্যাচ বাকি। কিন্তু টরন্টোর এই সন্ধ্যা ইতিমধ্যেই ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে।