Home খবর শ্বাস নেওয়ার অন্য ঠিকানা: আর্মেনিয়ার ২৫০ মিটার গভীর লবণখনিতে হাঁপানির চিকিৎসাকেন্দ্র

শ্বাস নেওয়ার অন্য ঠিকানা: আর্মেনিয়ার ২৫০ মিটার গভীর লবণখনিতে হাঁপানির চিকিৎসাকেন্দ্র

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
9 views 3 minutes read
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: বেশিরভাগ মানুষের কাছে পৃথিবীর গভীরে, অন্ধকারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো সুস্থ হওয়ার কোনও চিকিৎসা বলে মনে নাও হতে পারে।

কিন্তু আর্মেনিয়ায় প্রতিদিন সকালে কয়েকজন মানুষ ২৫০ মিটার নিচে একটি সক্রিয় লবণখনিতে নেমে যান। সেখানে তাঁরা ছয় ঘণ্টা কাটান বিশাল লবণের গুহাকক্ষে। তাঁদের বিশ্বাস, মাটির নিচের এই বাতাসই শ্বাসকষ্ট কমাতে সাহায্য করে।

হাঁপানির রোগী মিকায়েল তোরোসিয়ান বলেন, “সব ধরনের চিকিৎসাই করেছি। শেষ পর্যন্ত একমাত্র এই চিকিৎসাতেই উপকার পেয়েছি। প্রথমে মনে হয়েছিল পুরো ব্যাপারটাই বাজে কথা। কিন্তু এখন আমি এর ওপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি। এই চিকিৎসাই আমাকে বাঁচিয়েছে।”

১৯৮৭ সালে চালু হওয়া এই কেন্দ্রটি ‘স্পেলিওথেরাপি’ নামে পরিচিত একটি বিকল্প চিকিৎসাপদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এর মূল ধারণা, লবণে পরিপূর্ণ, অ্যালার্জেনমুক্ত ভূগর্ভস্থ বাতাস হাঁপানি-সহ বিভিন্ন শ্বাসযন্ত্রের রোগের উপসর্গ কমাতে পারে।

তবে বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি ভূগর্ভস্থ লবণখনি হাসপাতালের অন্যতম এই কেন্দ্রটির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। আর্মেনিয়া সরকার সরকারি অর্থসাহায্য বন্ধ করে দেওয়ায় এটি বন্ধ হওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে।

মাটির নিচে এক অন্য জগৎ

হাসপাতালে পৌঁছাতে রোগীদের প্রথমে একটি পুরনো শিল্পকারখানার লিফটে চড়ে ২৫০ মিটার নিচে নামতে হয়। রাজধানী ইয়েরেভানের উপকণ্ঠের আবাসিক এলাকার নিচে বিস্তৃত এই লবণখনির ভেতরে রয়েছে অসংখ্য সুড়ঙ্গ।

প্রথম দেখায় জায়গাটি হাসপাতালের চেয়ে বরং শীতল যুদ্ধের সময়কার কোনও ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারের মতো মনে হয়। কোথাও রোগীরা সরু খাটে ঘুমিয়ে আছেন, কেউ বিলিয়ার্ড খেলছেন, কেউ হাঁটছেন, কেউ শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করছেন, আবার কেউ নীরবে বসে সময় কাটাচ্ছেন।

১৯৮৯ সাল থেকে এখানে কর্মরত চিকিৎসক আনুশ ভোস্কানিয়ান বলেন, “জায়গাটা প্রথমে অদ্ভুত মনে হয়। কিন্তু কয়েক দিন পর মানুষ এই নিস্তব্ধতাকে উপভোগ করতে শুরু করেন।”

কীভাবে শুরু হয়েছিল এই চিকিৎসা?

ভোস্কানিয়ানের কথায়, চিকিৎসকেরা লক্ষ্য করেছিলেন যে লবণখনিতে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে শ্বাসযন্ত্রের রোগের হার অস্বাভাবিকভাবে কম। সেই পর্যবেক্ষণ থেকেই গবেষণা শুরু হয়। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের ভূগর্ভস্থ চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে ওঠে।

তাঁর মতে, এই চিকিৎসার কার্যকারিতার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে—

লবণসমৃদ্ধ বাতাস

সারা বছর প্রায় ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস স্থিতিশীল তাপমাত্রা
ধুলাবালি ও অ্যালার্জেনের অনুপস্থিতি
দূষণ, শব্দ ও বিকিরণহীন পরিবেশ
ভোস্কানিয়ান বলেন, “এটি বসবাসের জন্য আদর্শ পরিবেশ। এখানে থাকলে যেন বয়সই বাড়ে না।”

তিন সপ্তাহের চিকিৎসা

রোগীদের সাধারণত টানা তিন সপ্তাহ প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা করে এই খনিতে থাকতে হয়।

চিকিৎসকদের মতে, প্রথম সপ্তাহে শরীর ভূগর্ভস্থ পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। এরপর ধীরে ধীরে এর সুফল মিলতে শুরু করে।

একসময় প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এখানে চিকিৎসা নিতে আসতেন। তাঁদের অনেকেই সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার আওতায় বিনা খরচে চিকিৎসা পেতেন।

ভোস্কানিয়ান বলেন, “আগে একসঙ্গে ৬০ জন রোগী ভর্তি থাকতেন। এখন পুরো খনিতে হয়তো পাঁচজন আছেন।”

কেন বন্ধ হয়ে যেতে বসেছে?

২০১৯ সালে আর্মেনিয়া সরকার এই প্রকল্পে অর্থসাহায্য বন্ধ করে দেয়। সরকারের যুক্তি, স্পেলিওথেরাপির কার্যকারিতা প্রমাণ করার মতো যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই। ফলে সরকারি অর্থে এই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা নেই।

এরপর থেকে রোগীদের প্রতিটি সেশনের জন্য প্রায় ২০ পাউন্ড করে দিতে হচ্ছে।

সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা চালুর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সরকার কোন কোন চিকিৎসা রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে থাকবে, তা নতুন করে নির্ধারণ করতে গিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেয়।

ভোস্কানিয়ান বলেন, “আমরা বন্ধ হওয়ার একেবারে দ্বারপ্রান্তে। এখনও কোনওরকমে চলছে, কিন্তু যে কোনও দিন দরজা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।”

তাঁর দাবি, বিশেষ করে হাঁপানি ও অ্যালার্জিতে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে এই চিকিৎসা অত্যন্ত কার্যকর।

তিনি বলেন, “এমনও হয়েছে, মাত্র একবার চিকিৎসা নেওয়ার পরই কারও হাঁপানির আক্রমণ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।”

বিজ্ঞান কী বলছে?

পূর্ব ইউরোপ ও সাবেক সোভিয়েত অঞ্চলে বহু দশক ধরে স্পেলিওথেরাপি চালু থাকলেও এ নিয়ে বড় আকারের বৈজ্ঞানিক গবেষণা খুব কম হয়েছে। অধিকাংশ ভূগর্ভস্থ চিকিৎসাকেন্দ্রও ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে।

শ্বাসযন্ত্রের রোগ বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন, এটি একটি পরিপূরক চিকিৎসা হিসেবে কিছু উপকার করতে পারে। তবে এটি কখনওই প্রচলিত চিকিৎসার বিকল্প হতে পারে না।

অন্যদিকে সমর্থকদের যুক্তি, গবেষণা সীমিত হলেও কয়েক দশকের রোগীদের অভিজ্ঞতাকে একেবারে অস্বীকার করা যায় না।

রাশিয়া থেকে গত ১০ বছর ধরে নিয়মিত এখানে আসা আলভার্ট আলিহানিয়ান বলেন, “উপকার না হলে আমি বারবার ফিরে আসতাম না।”
এখনও প্রতিদিন সকালে সেই লিফটটি ইয়েরেভানের মাটির নিচে নেমে যায়। চিকিৎসা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এই লবণখনি মানুষকে অন্তত কয়েক ঘণ্টার জন্য এমন এক পরিবেশ দেয়, যা আজকের পৃথিবীতে ক্রমেই বিরল—সম্পূর্ণ নীরবতা, ইন্টারনেটবিহীন সময় এবং বাইরের কোলাহল থেকে সাময়িক মুক্তি।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles